দেশের সবচেয়ে সম্মানের পদটিতে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই ‘প্রাণ খুলে’ কথা না বলার আক্ষেপ আবারো প্রকাশ করলেন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। স্বভাবসুলভ সহজ ভাষায় ভাটির দেশের উচ্চারণে কথা বলার জন্য আবদুল হামিদ সবারই প্রিয় পাত্র। সোমবার ১৫ জুন ঢাকায় ‘বাংলাদেশ আইসিটি এক্সপো-২০১৫’র উদ্বোধন অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখার শুরুতেই তিনি আবারও নিজের আক্ষেপের কথা জানালেন। এর আগেও কয়েকটি অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি একইভাবে ‘নিজের কথা’ না বলার আক্ষেপ প্রকাশ করেছিলেন।
সোমবার অনুষ্ঠানে বক্তব্যের শুরুতে আবদুল হামিদ বলেন, “আমার একটি লিখিত বক্তব্য আছে। জাতীয় সংসদের স্পিকার থাকার সময় স্বাধীন-ফ্রিস্টাইলে বক্তব্য দিতাম। এখন অনেকটা বন্দি জীবনের মতোই। কথা-বার্তা হিসাব করে বলতে হয়। সাংঘাতিক…ফাউল না হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হয়।” রাষ্ট্রপতির এই কথা শুনে অনুষ্ঠানে উপস্থিত সবাই জোরে হাততালি দিয়ে হেসে ওঠে।
এর আগে গত ২৬ এপ্রিল নর্দার্ন ইউনিভার্সিটির সমাবর্তনে রাষ্ট্রপতি লিখিত বক্তব্যের বাইরে কথা বলেন। ওই অনুষ্ঠানে ভিডিও ইউটিউবসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক সাড়া পড়ে।
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন পেরিয়ে আসা আবদুল হামিদ আবদুল হামিদ ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন। এর আগে জাতীয় সংসদে ডেপুটি স্পিকার ও স্পিকার ছিলেন তিনি। ১৯৯৬ সালে ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হওয়ার পর স্বভাবজাত হাস্যরস দিয়ে সংসদ মাতিয়ে তুলে বেশ জনপ্রিয়তা পান।
১৯৪৪ সালের ১ জানুয়ারি কিশোরগঞ্জের মিঠামইন উপজেলার কামালপুর গ্রামে জন্ম নেয়া আবদুল হামিদ কৈশোরেই রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। তৃণমূল থেকেই আওয়ামী লীগের রাজনীতি করা আব্দুল হামিদ এখন রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্বে।
রাষ্ট্রপতি হয়ে বঙ্গভবনের বাসিন্দা হওয়ার পর নিয়ন্ত্রিত জীবন-যাপন নিয়ে এর আগেও বিভিন্ন অনুষ্ঠানে খেদ প্রকাশ করেন আবদুল হামিদ। রাষ্ট্রপতির মেয়াদের এক বছর পূর্তিতে বঙ্গভবনে তিনি সাংবাদিকদের বলেছিলেন, “ইচ্ছা করলেই অনেক কিছুই করতে পারি না। আর ইচ্ছা করতেও তো অনেক সমস্যা। আসলে বেশি পলিটিক্যাল মানুষের জন্য, মানে গ্রাসরুটে রাজনীতি করা মানুষের জন্য এ জায়গাটা সব সময় আরামদায়ক হবে বলে মনে হয় না।”
বঙ্গভবনের নিয়ন্ত্রিত জীবন ‘সব সময় আরামদায়ক’ নয় বলে সেই সময় মন্তব্য করেন তিনি। আবদুল হামিদ বলেছিলেন, “খাঁচার পাখিরে যতই ভালো খাবার দেয়া হোক, সে তো আর বনের পাখি না। আমি একটা দায়িত্ব হিসেবে এখানে এসেছি। সংসদে মনের খোরাক পেতাম, বঙ্গভবনে পাই না। মনটা অনেক কিছু চায়।”
তিনি আরো বলেছিলেন, “ইচ্ছা করলেই অনেক কিছুই করতে পারি না। আর ইচ্ছা করতেও তো অনেক সমস্যা। আসলে বেশি পলিটিক্যাল মানুষের জন্য, মানে গ্রাসরুটে রাজনীতি করা মানুষের জন্য এ জায়গাটা সব সময় আরামদায়ক হবে বলে মনে হয় না। যারা ফ্রিলি মানুষের সঙ্গে মেশে না, তাদের কথা আলাদা। এখানে বেশিরভাগই ছিলেন বিচারপতি-শিক্ষক। উনারা তো বেশি মানুষের সঙ্গে মেশেন না।”
আবদুল হামিদ আরো বলেছিলেন, আসলে এখনো ভালো লাগে না। খাঁচার পাখিরে যত ভালো খাবারই দেয়া হোক না কেন, সে তো আর বনের পাখি না। আমি একটা দায়িত্ব হিসেবে এখানে এসেছি। সংসদে মনের খোরাক পেতাম, বঙ্গভবনে পাই না। ইচ্ছা করলেই অনেক কিছুই করতে পারি না। আর ইচ্ছা করতেওতো অনেক সমস্যা।
ধরেন, মনে হলো কারো বাসায় যাবো। হাফ এন আওয়ারের মধ্যে গাড়ি রেডি হবে। কিন্তু রাস্তা বন্ধ হবে। যে বাসায় যাবো সেখানকার রান্নাঘর থেকে শুরু করে সব কিছু চেক হবে। ইচ্ছা হইলেও ইচ্ছা করা যায় না। নিতান্তই বিশেষ প্রয়োজন বা সরকারি কোন অনুষ্ঠান ছাড়া বের হই না। বাইরে যদিও যাই ১০টা মানুষের সঙ্গে কথা বলতে পারি না। ওখানেও নিরাপত্তা কর্মী থাকে। আই এম নট ফ্রি।
তিনি বলেছিলেন, যখন কোর্টে প্র্যাকটিস করতাম চেম্বারে মানুষ আসতো। কথা বলতাম। যদি কখনো না আসতো, তবে যেখানে আড্ডা হতো, সেখানে চলে যেতাম। সংসদেও আড্ডা দিতাম। এমপিরা আসতো, সাংবাদিকরা আসতো। এখানে সে সুযোগ নেই। মনটা অনেক কিছু চায়।”
রাষ্ট্রপতি আরো বলেছিলেন, আসলে এখানে পারসোনাল, প্রাইভেট লাইফ নেই। বিদেশে গেলেও শান্তি পাই না। রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর প্রথম যে বার গেলাম, ভাবলাম কিছুটা হলেও ফ্রি। কিন্তু সেখানেও একা থাকতে দেবেনা। নিরাপত্তাকর্মীরা সঙ্গে থাকে। আই এম নট অ্যাট অল ফ্রি ম্যান।
তিনি বলেছিলেন, আসলে রাষ্ট্রপতি হিসেবে তেমন কোনো কাজ নেই। যেটা করি রুটিন কাজ। সংসদে থাকার সময়ে অনেক কিছু পরিকল্পনা করেছি। এটা-ওটা বাদ দিয়েছি। এখানে দেখার কিছু নেই।
রাষ্ট্রপতি হিসেবে নিয়ন্ত্রিত জীবন সম্পর্কে তিনি মূল্যায়ণ করে বলেছিলেন, “একটা গল্প আছে। একটা লোককে বলা হলো কিল কয়টা খাবি? বললো-একটাও না। যদি বাইন্ধা মারি তবে? তখন যত খুশি। বুঝছেন…।”
নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা
নিউজওয়ার্ল্ডবিডি ডট কম।



Leave a Reply