বুধবার ৪ নভেম্বর ২০২৬

বাংলা অনলাইন কমিউনিটিতে সংঘাত বাড়ছেই: সতর্কতার প্রয়োজন

images (4)ব্লগার ও উগ্রপন্থীদের মাঝে মতাদর্শগত সংঘাত ক্রমেই বাড়ছে। নিষিদ্ধ সংগঠন আনসারুল্লাহ বাংলা টিম (এবিটি) নানা নামে শিক্ষকসহ প্রগতিশীল ও মুক্তমনা লোকদের হত্যার হুমকি দিয়ে যাচ্ছে। ধর্মীয় মূল্যবোধকে পুঁজি করে একটি সুবিধাভোগী গোষ্ঠী উগ্রপন্থীদের মদদ দিচ্ছে। এসবের পরিণতিতে আরও খুনখারাবি ঘটার আশংকা করছেন গোয়েন্দা কর্মকর্তা ও অপরাধ বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, চার ব্লগার খুন, সাত-আট ব্লগারকে হত্যা চেষ্টা এবং অব্যাহত হুমকি এক ধরনের সতর্ক বার্তা। পুলিশ কর্মকর্তাদের মতে, এ ধরনের অপরাধ দমনে শুধু আইনশৃংখলা বাহিনীর তৎপরতা যথেষ্ট নয়। সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে সবাইকে এগিয়ে আসা প্রয়োজন।

ঢাকা মহানগর পুলিশের মুখপাত্র যুগ্ম কমিশনার (ডিবি) মনিরুল ইসলাম বলেন, মতাদর্শগত সংঘাত বাড়ার পেছনে রয়েছে জামায়াত-শিবিরের ইন্ধন। উগ্রপন্থীদের উসকে দিচ্ছে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি। একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। এ ধরনের হত্যাকাণ্ড আরও হওয়ার আশংকাও করা হয়েছে এসব প্রতিবেদনে। আরও পর্যবেক্ষণ ও অনুসন্ধান চলছে। মনিরুল ইসলাম আরও বলেন, একের পর এক উগ্রপন্থী গ্রেফতার হচ্ছে। এরপরও তারা নানা নামে ও কৌশলে অপরাধে জড়াচ্ছে। তাদের হাত থেকে মানুষের জানমাল রক্ষা করাই পুলিশের দায়িত্ব। পুলিশ ও গোয়েন্দারা এ বিষয়ে পেশাদারিত্বের সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ জানায়, মে মাসে বিশিষ্ট ১০ নাগরিককে হত্যার হুমকি দেয়া হয়। মঙ্গলবার ১৬ জুন ফের মন্ত্রী-এমপি-বুদ্ধিজীবীসহ বিভিন্ন পেশা-শ্রেণীর ২৫ জনকে হত্যার হুমকি দেয়া হয়েছে। ৬ মাসে ডিবি পুলিশ এবিটি, আইএস, হিজবুত তাহরিরসহ কয়েকটি সংগঠনের ৩০ জনের বেশি জঙ্গিকে গ্রেফতার করে।

মওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোহাম্মদ আশরাফুল আলম যুগান্তরকে বলেন, অপরাধ বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় মতাদর্শগত সংঘাত। এটি বিশ্বব্যাপী সংঘটিত হচ্ছে। তবে আমাদের দেশে সম্প্রতি এর হার বেড়ে যাওয়া অত্যন্ত আতংকের।
তিনি আরও বলেন, সমাজের একটি গ্রুপ যখন মনে করে তারা শক্তি কিংবা আদর্শগতভাবে নিষ্পেষিত হচ্ছে তখন নিজেদের অবস্থান জানান দিতে এমন অপরাধ ঘটিয়ে থাকে। এর আরেকটি কারণ হচ্ছে গোঁড়া ধার্মিকতা। ধর্মের অপব্যাখ্যায় উদ্বুদ্ধ হয়ে অপরাধে জড়িয়ে পড়া। এ জাতীয় অপরাধ নিয়ন্ত্রণে রাষ্ট্র ও আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীকেই সবচেয়ে জোরালো ভূমিকা রাখতে হবে।

অধ্যাপক আশরাফুল আলম বলেন, আমাদের আইনশৃংখলা বাহিনী সাধারণত ঘটনা সংঘটিত হওয়ার পর এ নিয়ে গবেষণা করে। এ ক্ষেত্রে তারা যদি আগেই সতর্ক থাকে, মনিটরিং করতে থাকে তবে অনেক অপরাধ সংঘটিত হওয়ার আগেই অপরাধীদের আটক করা সম্ভব হবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিক্ষা ব্যবস্থায় স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার পাঠ্যক্রমে মানুষের আচার-আচরণ, মূল্যবোধ ও অপরাধের বিষয়গুলো সংযোজন অত্যাবশ্যকীয় হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে পরিবার হচ্ছে সমাজের একেবারে মৌলিক ভিত্তি। পরিবার থেকেই সন্তানদের মূল্যবোধ শেখানো শুরু করতে হবে।

মওলানা ভাসানী বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ আজিজুর রহমান বলেন, এ ধরনের অপরাধ শুধু কোনো ব্যক্তিকে লক্ষ্য করেই হয়ে থাকে, এখানে সম্পদ কিংবা মূল্যবান কোনো কিছু মুখ্য নয়। ড. হুমায়ুন আজাদ থেকে শুরু করে অনন্ত বিজয় দাস পর্যন্ত একই আলামত ও কৌশল বহন করে। মূলত যারা মুক্তচিন্তার বিকাশ করতে গিয়ে ধর্মকে আঘাত করে ব্লগে লিখে যাচ্ছে তারাই এর শিকার হচ্ছে। ব্লগাররা তাদের লেখাকে হাতিয়ার হিসেবে ইন্টারনেটে ব্যবহার করছে আর গোঁড়া শ্রেণীর ধর্মান্ধরা নিজেদের অবস্থান জানান দিচ্ছে হত্যার মাধ্যমে। জঙ্গিবাদ ও মৌলবাদ এখন আমাদের দেশের নাম করা বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই উৎপত্তি হচ্ছে যা অত্যন্ত আতংকের।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক শেখ হাফিজুর রহমান কার্জন বলেন, মুক্তমনা ও ব্লগার হত্যার ঘটনাগুলো ধারাবাহিকভাবে ঘটে চলেছে। তার অর্থ, আমাদের সমাজে মুক্তচিন্তার বিকাশ ঘটছে না, স্বাধীন চিন্তার ক্ষেত্রটাও ছোট হয়ে আসছে। আমরা একটা ব্যর্থ সমাজের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। ব্লগার মানেই মনে করা হচ্ছে নাস্তিক।

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা
নিউজওয়ার্ল্ডবিডি ডট কম।

আরও পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *