শেখ হাসিনা সরকারের অধীনে নির্বাচনে বিএনপিকে আর ক্ষমতায় আসতে দেওয়া হবে না- এমন বিশ্বাস বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে রয়েছে। তাই আগামীতে তত্ত্বাবধায়ক ছাড়া কোনো নির্বাচনেই খালেদা জিয়া অংশ নিতে রাজি হবেন না। তাই বিএনপির ভেতরেই একটি পক্ষ রয়েছেন যারা এই সরকারের অধীনেই নির্বাচনে যেতে চায়। আর এই সরকারের অধীনে তারা ২০১৯ সাল পর্যন্ত অপেক্ষা করেই একাদশ নির্বাচনে অংশ নিতে চায়। আগামী নির্বাচনে অংশ নেওয়ার জন্য তারা সমঝোতাও করতে চায় সরকারের সঙ্গে। প্রয়োজন হলে নির্বাচনকালীন সরকারের ভেতরেও তারা তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে চায়। তারা মনে করছেন নির্বাচন সুষ্ঠুু ও অবাধ হলেই বিএনপি জোট ক্ষমতায় আসবে। বিএনপি নির্বাচনে গেলে সরকার যত চেষ্টাই করুক না কোনো সাফল্য পাবেন না। বরং জনগণ বিএনপি জোটকে ভোট দেবে। এই কারণে তারা চায় বিএনপির নেতৃত্বে আর খালেদা জিয়া বা তারেক রহমানকে রাখা চলবে না।
বিএনপির একটি সূত্র জানায়, বিএনপিতে খালেদা-তারকে কে মাইনাস করতে চায় এমন গ্রুপটিতে সরকার কাছে টানার চেষ্টা করছেন। তাদের কোনো কোনো নেতার সঙ্গে সরকারের, মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের নেতাদেরও যোগাযোগ রয়েছে। তারা সরকারের সঙ্গেও সমঝোতা করে আগামী দিনে একাদশ সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে চান। তারা চেষ্টা করছেন আগামী নির্বাচনে যথা সময়ে এই সরকারের অধীনে হলেও যাওয়ার জন্য। কিন্তু ২০১৩-১৫ পুরো সময়েও তারা সেটা রাজি করাতে পারেননি দলের চেয়ারপারসনকে। এই কারণে ওইসব নেতাদের অনেকেই এখন দলের ভেতরেই কোণঠাসা। প্রয়োজন হলে বেগম খালেদা জিয়া ও তারেক রহমান তাদের পরামর্শ না শুনলে তারা বিএনপির এক অংশ নিয়ে সরকারের সঙ্গে সমঝোতা করতে পারেন। সেই হিসেবে তারা খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানকেও দল থেকেও সরিয়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্র সফল করার জন্য সহায়তা করতেও দ্বিধাবোধ করবেন না।
সরকারি দলের একটি সূত্র জানায়, সরকারের পরিকল্পনায় রয়েছে আগামী নির্বাচনে খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানকে নির্বাচনের বাইরে রাখা। আর সেটা করতে হলে দুই পথ আছে। একটি পথ হচ্ছে তাদের দুজনকে আদালতে রায়ে শাস্তি দিয়ে নির্বাচনে অযোগ্য ও কারাগারে পাঠানো। সেটা করতে সরকারের আইনজীবীরা কাজ করছেন। ইতোমধ্যে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে ১০টি মামলা আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। তারেক রহমানের বিরুদ্ধে মামলা ৫ ডজনেরও বেশি। এই দুজন ছাড়াও বিএনপির আরো বেশ কয়েকজন নেতাকেও আগামী নির্বাচনের বাইরে রাখার ষড়যন্ত্র চলছে।
সূত্র জানায়, সরকার দুনেতা ও তাদের মতের সঙ্গে একমত নেতাদের মামলায় সাজা দিয়ে বাইরে রাখার চেষ্টা সফল হলে বিএনপি ভাঙার প্রয়োজন হবে না। আর সেটা না হলে ওই পথ ছাড়াও আর একটি পথ হচ্ছে বিএনপির ভেতরে যে অসন্তোষ রয়েছে সেটা কাজে লাগানো। বিশেষ করে তারেক রহমান দলের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আসার কারণে ওই সব নেতারা অনেকটা কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন। তাদের কোনো কথার গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। ২০১৩ সালের পর থেকে এটা আরো বেড়েছে। দুই বছরে ওইসব নেতারা অনেকে বেশি বঞ্চিত হয়েছেন। এছাড়াও তারা আন্দোলন নিয়ে যেসব কথা বলেছেন সেগুলো কানে তুলেননি খালেদা ও তারেক। এর পেছনেও রয়েছে নানা কারণ। কারণ তাদের কর্মকাণ্ডেও তারেক ও খালেদার মধ্যে অবিশ্বাস তৈরি হয়েছে। কিন্তু ওইসব নেতারাও ক্ষুব্ধ। তারাও দল থেকে বাইরে চলে যেতে পারেন। ভাঙনও দেখা দিতে পারে বিএনপির ভেতরে। বিএনপির একাংশ নির্বাচনে যাওয়ার জন্য বিএনপির নতুন নামকরণ করে সরকারের সঙ্গে সমঝোতা করতে পারে।
সূত্র জানায়, সম্প্রতি বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বিএনপির ভেতরে জিয়ার আদর্শ অনুসরণ করে সংস্কার করার কথা বলেছেন। জামায়াত ছাড়ার কথাও বলেছেন। সবশেষ বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আব্দুল মঈন খানের কথোপকথনের টেপ প্রকাশিত হয়েছে সেখানে তিনিও বলেছেন, বেগম খালেদা জিয়া এখন যে অবস্থায় পড়েছে সেখান থেকে ওঠা সম্ভব হবে না। তিনিও খালেদা জিয়া আন্দোলন করে সফল হবেন দল গোছাতে পারবেন এই ব্যাপারে তার ওপর পুরোপুরি আস্থা রাখতে পারেননি।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির একজননেতা বলেন, বিএনপির ভেতরে অনেক অসন্তোষ রয়েছে। সিনিয়র নেতাদের কয়েকজন ছাড়া অন্য কোনো নেতার কোনো গুরুত্ব নেই। কোনো কিছু আগে জানানো হয় না। কোনো বিষয়ে পরামর্শও করা হয় না। দুজনের কথায় দল চলছে। আর একের পর এক ভুল সিদ্ধান্ত আসছে। এভাবে এত বড় দল চলে না। দলের এসব ব্যাপারে সমাধান প্রয়োজন। তিনি বলেন, বিএনপি ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে গেলেও লাভ ছিল। অন্তত বিরোধী দলে হলেও থাকত। কিন্তু জেদ করে সেটা না করে এরপর এখন কেবল ক্ষমতার বাইরে নয় সংসদেরও বাইরে চলে গেছে। এতে কি লাভ হলো? তিনি বলেন, আন্দোলন করা হলো তিন মাস। আন্দোলনের সাফল্য এলো না। দলের বিরুদ্ধে সহিংসতার অভিযোগ উঠল। দলের চেয়ারপারসন একাধিক মামলায় মানুষ হত্যার আসামি হলেন, লাভ কি হলো। আসলে এগুলো করে লাভ হবে না। বরং দল গুছিয়ে আগামী ২০১৯ এর নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নিয়ে সরকারের সঙ্গে সমঝোতা করে নির্বাচনকালীন সরকারে প্রতিনিধি দিয়ে এ সরকারের অধীনে হলেও নির্বাচনে যাওয়ার পরিকল্পনা ঠিক করতে হবে। কিন্তু সেটা করবেন না দলের নীতি নির্ধারকরা। আর সরকারও বিএনপির দাবি মেনে নেবে না।
সূত্র জানায়, দলের ভেতরে এই গ্রুপের সদস্য বাড়ছে। দিন যত যাবে তা আরো বাড়বে। বিএনপির ও বিএনপি জোটের ভেতরে নেতাদের সঙ্গেও অনেক দূরত্ব তৈরি হয়েছে। সেই দূরত্ব কমানোর জন্যও কোনো চেষ্টা নেই তারেক ও খালেদার। বরং জোটের নেতারা এখন অনেকেই আস্থাহীনতায় ভুগছেন। তারা ঠিক বুঝতে পারছেন নাকি করবেন। তাদের ভবিষ্যৎ হবে। বিএনপি বার বার চেষ্টা করেছে কাউন্সিল করার জন্য কিন্তু সেটা আজও পর্যন্ত করতে পারেনি। বিএনপি নেতারাও এটা উপলব্ধি করছেন যে দলের জন্য কাউন্সিল করা জরুরি। ২০০৯ সালের পর আজ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় কাউন্সিল করা হয়নি। আর কাউন্সিল না হওয়ার কারণে নেতাদের মধ্যে যে ধরনের উৎসাহ উদ্দীপনা থাকার কথা তা এখন নেই। তাই অনেক নেতাই চান, একটি গণতান্ত্রিক দল হিসেবে বিএনপিতে পরিবারতন্ত্রের বাইরে নেতৃত্বের চর্চ্চা হোক। সেক্ষেত্রে খালেদা জিয়া বা তারেক রহমান নন, অন্য কোনো নেতা হবেন বিএনপির প্রধান। খালেদা বা তারেক থাকবেন অভিভাবকের মতো।
বিশেষ প্রতিনিধি, ঢাকা
নিউজওয়ার্ল্ডবিডি ডট কম।


