বুধবার ৪ নভেম্বর ২০২৬

সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশ থেকে টাকা পাচারের নতুন রেকর্ড

Swiss_bank

ফারুক খান, প্যারিস থেকে॥

বাংলাদেশের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের অবৈধভাবে আয় করা টাকা জমানোর সবচেয়ে প্রধান স্থান হচ্ছে সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলো। এতোদিন সেখানে বাংলাদেশিদের টাকা জমানোর কথা জানা গেলেও গত বছর এই হার বেড়েছে আগের বছরের তুলনায় ৪০ শতাংশ। যা সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশের মানুষের টাকা রাখার সর্বোচ্চ। ১৮ জুন সুইস ব্যাংকগুলো দেশওয়ারী যে হিসাব প্রকাশ করেছে তাতে এই টাকার হিসাব পাওয়া গেছে। যদিও কার কত টাকা তা তারা কখনোই প্রকাশ করে না। আর যে কারণেই সুইস ব্যাংকগুলো বাংলাদেশসহ বিশ্বের অবৈধ টাকা জমানোর একটি বড় স্থানে পরিণত হয়েছে।

সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রকাশিত হিসেবে দেখা যাচ্ছে, সুইস ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশি নাগরিকদের জমা রাখা অর্থের পরিমাণ এক বছরের ব্যবধানেই প্রায় ৪০ শতাংশ বেড়েছে।

সুইস ন্যাশনাল ব্যাংক এসএনবির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৪ সালে বাংলাদেশি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের জমা রাখা অর্থের পরিমাণ ৫০৬ মিলিয়ন সুইস ফ্রাঁ, টাকার অঙ্কে প্রায় চার হাজার তিনশত কোটি টাকা। আগের বছর এই অর্থের পরিমাণ ছিল ৩৭২ মিলিয়ন সুইস ফ্রাঁ, টাকার অঙ্কে যার পরিমাণ প্রায় তিন হাজার একশত পঞ্চাশ কোটি টাকা। এর আগে সুইস ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশিদের ব্যাংক এ্যাকাউন্টের বিস্তারিত জানতে চেয়ে চিঠি দিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। কিন্তু এখনও পর্যন্ত সেখান থেকে কোনো উত্তর পায়নি বাংলাদেশ ব্যাংক।

আগের বছরের তুলনায় ২০১৪ সালে সুইস ব্যাংকগুলোতে বিদেশি গ্রাহকের গচ্ছিত অর্থের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় দেড় হাজার কোটি সু্ইস ফ্রাঁ। আর এই হিসাবে বাদ পড়েছে স্বর্ণসহ অন্যান্য মূল্যবান ধাতব বস্তু। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকেই অর্থ, মূল্যবান শিল্পকর্ম, স্বর্ণ বা দুর্লভ সামগ্রী গচ্ছিত রাখার ক্ষেত্রে সুইস ব্যাংকগুলো জনপ্রিয়।

বাংলাদেশের বিত্তশালীরা যে তাদের অর্থ গচ্ছিত রাখার জন্য আরও বেশি হারে সুইস ব্যাংককে বেছে নিচ্ছেন, এর জন্য অর্থনীতিবিদরা বাংলাদেশে নিরাপত্তার অভাব এবং প্রতিকুল বিনিয়োগ পরিবেশকে দায়ী করেছেন। বিশ্লেষকেরা মনে করেন, বাংলাদেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠানে অর্থ রাখার ক্ষেত্রে নিরাপত্তাহীনতা এবং বিনিয়োগের যথাযথ পরিবেশ না থাকায় দেশের বাইরে, বিশেষ করে সুইস ব্যাংকগুলোতে গত এক বছরে বাংলাদেশ থেকে রাখা অর্থের পরিমাণ বেড়েছে।

বিশ্বব্যাংকের অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন এই প্রসঙ্গে বলেছেন, “বিনিয়োগের পরিবেশ, নিরাপত্তাহীনতা আর টাকাটা কি পথে আয় করা হলো, তার ওপর নির্ভর করে কেন বাংলাদেশীদের জামানত সুইস ব্যাংকগুলোতে বাড়ছে। যেভাবেই টাকা আয় করা হোক, অনেক সময় বিনিয়োগের সুযোগ থাকলেও হয়ত এখানকার ব্যাংকে অর্থ রাখতে একজন নিরাপদ বোধ করছে না, সেক্ষেত্রে অর্থ দেশেরে বাইরে যাবার প্রবণতা তৈরি হয়।” তিনি বলেন, রাজনৈতিক অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণেও সুইস ব্যাংকগুলোতে যাওয়া অর্থের পরিমাণ বেড়েছে। কেবল বাংলাদেশীদের রাখা অর্থের পরিমাণই নয়, সুইটজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলোতে সারাবিশ্ব থেকে অর্থ জমা রাখার পরিমাণ বেড়েছে। বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ এমকে মুজেরী বলেছেন, সুইজারল্যান্ডের রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা, স্থিতিশীলতা এবং গ্রাহকের গোপনীয়তা বজায় রাখার সুনামের কারণেই এমনটি হয়ে থাকে।

বাংলাদেশীদের আমানত : গত ১২ বছরের মধ্যে ২০১৪ সালেই বাংলাদেশীরা সবচেয়ে বেশি আমানত রেখেছে সুইস ব্যাংকে। আলোচ্য সময়ে সুইস ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশীদের আমানতের পরিমাণ বেড়ে ৫০ কোটি ৬০ লাখ ফ্র্যাংক হয়েছে। স্থানীয় মুদ্রায় এর পরিমাণ ৪ হাজার ৫৫৪ কোটি টাকা। ২০১৩ সালে ছিল ৩৭ কোটি ২০ লাখ ফ্র্যাংক। স্থানীয় মুদ্রায় যার পরিমাণ ৩ হাজার ২৩৬ কোটি টাকা। ২০১২ সালে ছিল ২২ কোটি ৯০ লাখ ফ্র্যাংক। ২০১১ সালে ছিল ১৫ কোটি ২০ ফ্র্যাংক। এগুলো শুধু নগদ অর্থের হিসাব। ব্যাংকের ভল্টে স্বর্ণালংকার, শিল্পকর্ম বা অন্যান্য মূল্যবান জিনিসপত্র জমা রাখলে তার আর্থিক মূল্য আমানতের এই হিসাবের সঙ্গে যোগ হয়নি। সেগুলোর হিসাব রয়েছে আলাদা।

সুইস ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশীদের আমানত ২০০২ সালে ছিল ৩ কোটি ১০ লাখ ফ্র্যাংক, ২০০৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪ কোটি ১০ লাখ ফ্র্যাংকে। ২০০৫ সালে এর পরিমাণ দ্বিগুণের বেশিও বেড়ে দাঁড়ায় ৯ কোটি ৭০ লাখ ফ্র্যাংকে। ২০০৬ সালে এর পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ১২ কোটি ৪০ লাখ ফ্র্যাংক। ২০০৭ সালে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে এর পরিমাণ আগের বছরের চেয়ে দ্বিগুণ বেড়ে দাঁড়ায় ২৪ কোটি ৩০ লাখ ফ্র্যাংকে। ওই সময়ে সরকার বিদেশে পাচার করা টাকা ফেরত আনার প্রক্রিয়া শুরু করলে ২০০৮ সালে এর পরিমাণ নাটকীয়ভাবে কমে দাঁড়ায় ১০ কোটি ৭০ লাখ ফ্র্যাংক। ২০০৯ সালে মহাজোট সরকার ক্ষমতায় এলে সুইস ব্যাংককে বাংলাদেশীদের জমার পরিমাণ আবার বেড়ে ১৪ কোটি ৯০ লাখ এবং ২০১০ সালে তা আরও বেড়ে ২৩ কোটি ৬০ লাখ ফ্র্যাংকে দাঁড়ায়।

ইউরোপ ব্যুরো, প্যারিস
নিউজওয়ার্ল্ডবিডি ডট কম।

আরও পড়ুন