বুধবার ৪ নভেম্বর ২০২৬

বুলবুল ললিতকলা একাডেমি: হারিয়ে যেতে দেবেন না

BAFAবুড়িগঙ্গার পাড়ঘেঁষে ওয়াইজ ঘাট। ভোরের আলো ফোটার আগেই ঘাট জেগে ওঠে কুলি-মজুর ও ব্যবসায়ীদের কলরবে। আশপাশের দোকানগুলোরও ঘুম ভাঙতে শুরু করে ধীরলয়ে। এর এক ধারে শীর্ণ জবুথবু হয়ে দাঁড়িয়ে আছে বুলবুল ললিতকলা একাডেমি। পোশাকি নাম ‘বুলবুল একাডেমি অব ফাইন আর্টস’ সংক্ষেপে বাফা। ১৭ মে প্রতিষ্ঠানটি পা দিয়েছে ৬০ বছরে—

কিছুদিন আগেই বুলবুল ললিত কলা একাডেমিতে হয়ে গেছে বর্ষপূর্তি অনুষ্ঠান। মূল ফটক পেরোতেই অভিবাদন জানাল সবুজ গাছের সারি। বাঁ দিকের দোতলা দালানের একটি অলিন্দে ঢুকতেই অফিসকক্ষ। পাশের হলরুমে চলছে গুরুদেবের ‘চণ্ডালিকা’ নৃত্যনাট্যের রিহার্সেল। মিলনায়তনে ঢুকে চোখ পড়ে বুলবুল চৌধুরীর ফ্রেমে বাঁধানো ছবিটার দিকে। খুবই সাধারণ একটি দৃশ্যপট। কিন্তু ষাটের দশকের প্রেক্ষাপটে এ দৃশ্য কল্পনাটাও ছিল দুষ্কর। কারণ সে সময়ের মুসলিম বাঙালি রক্ষণশীল সমাজে নাচ-গানের কদর ছিল না। তাই বুলবুল ললিতকলা একাডেমিকে বন্ধুর পথ পাড়ি দিতে হয় প্রথম থেকেই।

এ একাডেমি শুধু একটি প্রতিষ্ঠান নয়, অমর নৃত্যশিল্পী বুলবুল চৌধুরীর একটি স্বপ্ন। ক্ষণজন্মা এ শিল্পীর অনেক দিনের স্বপ্ন ছিল একটি একাডেমি গড়ার। স্বপ্ন পূরণ হলেও তা দেখে যেতে পারেননি তিনি। পরবর্তীতে তার স্বপ্ন বাস্তবায়নে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন বন্ধুবর রাজনীতিবিদ ও সংস্কৃতিকর্মী মাহমুদ নূরুল হুদা।

বলা হয়, প্রতিটি বিপ্লবে প্রধান ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে প্রতিবারই একজন মহান ব্যক্তিত্বের আগমন হয় ধরণীতে। বাংলাদেশে নৃত্যে বিপ্লবের সূচনা হয় বুলবুল চৌধুরীর হাত ধরে। তাকে দেশের আধুনিক নৃত্যের প্রবর্তক বললে মোটেই বাড়িয়ে বলা হবে না। বিশ শতকে এক রক্ষণশীল সমাজে নাচকে জনপ্রিয় করে তুলতে তার প্রচেষ্টার কমতি ছিল না। সাফল্যের ফল হিসেবে বুলবুল ললিতকলা একাডেমির জন্ম।

১৯১৯ সালের ১ জানুয়ারি চট্টগ্রামের সাতকানিয়া থানার চুনতি গ্রামে এক শিক্ষিত পরিবারে তার জন্ম। প্রকৃত নাম রশীদ আহমেদ চৌধুরী, ডাকনাম টুনু। বাবা মোহাম্মদ আজমউল্লাহ ছিলেন বেঙ্গল পুলিশ সার্ভিসের ইন্সপেক্টর। মাতামহ মুন্সী ফজর আলী দেওয়ান পেশায় আইনজীবী, প্র্যাকটিস করতেন চট্টগ্রামেই। ছেলেবেলায় চৌধুরীর পড়াশোনায় হাতেখড়ি হয় গৃহশিক্ষকের কাছে আরবি ও পার্সি ভাষা শিখে। পরে হাওড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা শুরু হলেও তত্কালীন ম্যাট্রিকুলেশনের গণ্ডি পার হন মানিকগঞ্জ হাইস্কুল থেকে ১৯৩৪ সালে। সে সময় নাচের সঙ্গে প্রত্যক্ষ যোগাযোগ গড়ে ওঠেনি তার।

ছেলেবেলায় গান গাওয়া, ছবি আঁকায় পটু ছিলেন। বহু গুণের আধার এ শিল্পীর নাচে তাই হয়তো ছবির মতোই ফুটে ওঠে সহজাত অভিব্যক্তি। নিজস্ব কল্পনা ও চিত্ত প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন নৃত্যকলা।

সে যা-ই হোক, ম্যাট্রিকুলেশন পাস করে তত্কালীন প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক ও স্কটিশ চার্চ কলেজ থেকে স্নাতক হন তিনি। এ সময়টাকেই তাই জীবনের মাইলফলক বলা যায়। কলকাতার বেকার হোস্টেলেই বিকাশ ঘটে তার শিল্পচর্চার। এখানেই আয়োজিত এক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে নৃত্য পরিবেশন করেন তিনি। চোখে পড়েন ফজলুল হক, শরত্ বোসের মতো গুণী ব্যক্তিদের। পাশাপাশি নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়, নরেন্দ্রনাথ মিত্রের মতো বেশ কয়েকজন বন্ধুর অনুপ্রেরণায় পড়াশোনার সঙ্গে চলতে থাকে নৃত্যচর্চা। সে সময়ই রশীদ আহমেদ চৌধুরী সিদ্ধান্ত নেন শিল্পজগতে নিজেকে ‘বুলবুল চৌধুরী’ নামে পরিচিত করার। ওই সময় মুসলিম রক্ষণশীল সমাজকে এড়ানোর জন্যই এ ছদ্মনাম গ্রহণ করেন তিনি।

কলকাতায় বসবাসকালে সংসর্গে আসেন বিখ্যাত সরোদবাদক সন্তোষ চন্দ্র, গীতিকার তিমির বরণ ভট্টাচার্য ও নৃত্যবিশারদ উদয় শঙ্কর ও সাধনা বোসের। এদের সাহচর্যে নাচের প্রতি বুলবুলের অনুরাগ আরো দৃঢ় হয়। বিশেষ করে উদয় শঙ্কর বেশি প্রভাব ফেলে তার মনে। তিনিই ভারতীয় নৃত্যকলায় পশ্চিমা নাচ ব্যালের মিশ্রণ ঘটিয়েছিলেন। এছাড়া নতুন ধরনের নাচের উদ্ভাবনও করেন। সে যা-ই হোক, কথায় বলে ‘ইচ্ছে থাকলে উপায় হয়’। ১৯৩৬ সালে মঞ্চে অভিষেকের সুযোগও এসে গেল। রবীন্দ্র নৃত্যনাট্য ‘কচ ও দেবযানী’ ঘিরে মঞ্চে পারফর্ম করলেন সাধনা বোসের সঙ্গে। ১৯৩৭ সালে ‘ওরিয়েন্টাল ফাইন আর্টস অ্যাসোসিয়েশন’ গড়ে তুলতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল তার।

১৯৪০ সালের জানুয়ারি, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছে। ওই সময় তিনি দল নিয়ে ঢাকায় এসেছিলেন অনুষ্ঠান করতে। এর পর কলকাতায় ফিরে গেলেও আবারো মাটির টানে চলে এলেন চট্টগ্রামে। ১৯৪৩-১৯৪৭— চাকরি করেন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে। ১৯৫০-৫২, পারফর্ম করেন তত্কালীন পাকিস্তানের বিভিন্ন জায়গায়। পরের বছর ব্রিটেন, আয়ারল্যান্ড, হল্যান্ড, বেলজিয়াম ও ফ্রান্সসহ বিভিন্ন দেশে গেছেন নাচের দলকে সঙ্গী করে। ওই সময় বেশ অর্থকষ্টের মধ্য দিয়ে সময় অতিক্রম করতে হয়েছে তাদের। পাকিস্তান তাকে নৃত্যশিল্পীর সম্মান দিয়েছে। ১৯৪৯ সালে তাকে জাতীয় নৃত্যশিল্পীর মর্যাদা দেয়া হয়। দেশ-বিদেশেও তার সুনাম ছড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়ও তাকে নিয়ে ছাপা হয় প্রবন্ধ। বলা হয়, বুলবুল চৌধুরীর নৃত্যকে ঠিক ব্যালে বলা যায় না। নৃত্যনাট্যে তুলে ধরেন দেশজ সংস্কৃতি ও ইতিহাসের এক অনন্য রূপ।

অনেক দিন থেকেই পেটব্যথায় কাতর ছিলেন তিনি। পেট চেপে ধরেই নাচ করতেন। লন্ডনে গিয়ে ধরা পড়ল, তার শরীরে বাসা বেঁধেছে কর্কট রোগ। শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে ভর্তি হন কলকাতার চিত্তরঞ্জন ক্যান্সার হাসপাতালে। সেখানেই ১৯৫৪ সালের ১৭ মে ভোরে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এ শিল্পী। তখন বয়স ছিল মাত্র ৩৫ বছর!

অসুস্থ থাকাকালেও ভাবতেন, ‘নাচতে পারব তো?’ বন্ধু নুরুল হুদাকে বলতেন, ‘একাডেমি হবে তো?’ চিকিত্সার জন্য কলকাতা যাওয়ার সময়ও একই প্রশ্ন তার। নুরুল হুদা কান্না চেপে ভেজা কণ্ঠে বলেছিলেন, ‘একাডেমি হবে। তোর নামেই হবে।’ পরবর্তীতে বন্ধুর স্বপ্ন পূরণে কোমর বেঁধে নামেন তিনি। ১৯৫৪ সালের ২৮ মে বিশিষ্ট সাংবাদিক ও রাজনীতিবিদ আবুল মনসুর আহমেদের সভাপতিত্বে বুলবুল চৌধুরীর স্মরণে শোকসভা অনুষ্ঠিত হয় কার্জন হলে। এ সভায় প্রতিভাবান শিল্পীর স্মৃতিকে বাঁচিয়ে রাখতে একটি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে মাহমুদ নুরুল হুদাকে আহ্বায়ক করে ৪০ সদস্যবিশিষ্ট একটি কমিটি গঠন করা হয়। প্রথম দিকে বুলবুল ললিতকলা একাডেমি একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ শুরু করে। ১৯৫৫ সালের ১৭ মে— বুলবুল চৌধুরীর প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে একাডেমি উদ্বোধন করেন বিচারপতি এম ইব্রাহীম। একাডেমির প্রথম নির্বাহী পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন বেগম রানা লিয়াকত আলী খান। তিনি পশ্চিম পাকিস্তানে থাকতেন বলে এ পদের দায়িত্ব অনেক সময় পালন করতেন এম ইব্রাহীম। এছাড়া প্রথম কাউন্সিল চেয়ারম্যান শেরেবাংলা একে ফজলুল হক, বেগম আনোয়ারা বাহার চৌধুরী, শিল্পী কামরুল হাসান, ড. এমএন নন্দী, সৈয়দ আজিজুল হক, বিচারপতি সৈয়দ আহমদ, অজিত স্যানাল, আসাদুজ্জামান বাচ্চু, সেলিনা বাহার চৌধুরী, মো. মোদাব্বের, ওস্তাদ খাদেম হোসেন খান, ড. কাজী মোতাহার হোসেন, অজিত কুমার গুহ, ইকবাল বাহার চৌধুরীর মতো ব্যক্তিত্বরাও ছিলেন। এখন অধ্যক্ষের দায়িত্বে রয়েছেন খন্দকার খায়রুজ্জামান কাইয়ূম, সভাপতি হাসানুর রহমান বাচ্চু ও সম্পাদক নূরুল রহমান পলাশ। বুলবুল ললিতকলা একাডেমি স্থাপনের সঙ্গে জড়িতদের মধ্যে এখন জীবিত আছেন দুজন। অজিত স্যানাল ও ড. আনিসুজ্জামান।

প্রথম পর্যায়ে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত, রবীন্দ্রসঙ্গীত, নজরুলসঙ্গীত, নৃত্য, সেতার, হাওয়াইয়ান গিটার ও বেহালা— সাতটি বিভাগের ক্লাস শুরু হয় ১৯৫৫ সালের ১ জুলাই। সপ্তাহে ক্লাস হতো দুদিন। সকালে মেয়েরা ও বিকালে ছেলেরা। এভাবেই হাঁটি হাঁটি পা পা করতে করতে পার হয় একটি বছর। ১৯৫৬ সালে সংশ্লিষ্টরা আয়োজন করেন বুলবুল স্মৃতি সম্মেলনের। এ সম্মেলনে এসেছিলেন দেবব্রত বিশ্বাস, সুচিত্রা মিত্রের মতো বরেণ্য শিল্পীরা। তাদের সুরের ঝরনাধারায় বেশকিছু সময় মন ভিজিয়েছিলেন বাংলাদেশের সঙ্গীত অনুরাগীরা। এছাড়া শান্তিদেব ঘোষের নেতৃত্বে একটি নৃত্য দল আসে শান্তিনিকেতন থেকে। এভাবেই এগিয়ে চলেছে বাফা, হয়ে উঠেছে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের পথপ্রদর্শক।

দেখতে দেখতে পেরিয়ে গেল ৬০টা বছর। আরো এগিয়ে যাবে সময়, সেসঙ্গে শিল্প ও এ-সংক্রান্ত ধ্যান-ধারণা। প্রতিষ্ঠান পুরনো হয়ে গেলেও আধুনিকতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে ধরে রাখবে ঐতিহ্য। বুড়ো হলেও ক্লান্তি এসে ভর করেনি এতে! তবে এখন এ প্রতিষ্ঠান হুমকির সম্মুখীন। দুই বছর অন্তর জমি ইজারা দেয় সরকার। এছাড়া প্রতিবেশীদের কুনজরও এড়াতে পারছে না প্রতিষ্ঠানটি। জায়গা দখলের লক্ষ্যে প্রাচীর ভাঙা হতে পারে যেকোনো সময়। এ অবস্থায় কত দিন এ চিরসবুজ প্রতিষ্ঠান নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে সক্ষম হবে, তা নিয়েও সংশয় রয়েছে বিশিষ্টজনদের মনে।

দালানটিরও জীর্ণ অবস্থা। সংস্করণের অভাবে ভবনটি ভগ্নপ্রায়, খানিকটা ঝুঁকিপূর্ণও বটে! একাডেমি সুরক্ষিত রাখতে সরকারেরও দৃষ্টি দেয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন তারা।

(বণিক বার্তায় টুসি বোসের লেখা)
নিউজওয়ার্ল্ডবিডি ডট কম।

আরও পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *