বুধবার ৪ নভেম্বর ২০২৬

কবি সাহিত্যিকদের পুরস্কার প্রসঙ্গ ও মৌসুমী রোগ

Kafi-Kamalকাফি কামাল॥

বাংলাদেশের কবি-সাহিত্যিকরা কিছুদিন ধরে পুরস্কার প্রসঙ্গে মেতে উঠেছেন। পুরস্কারদাতা, পুরস্কৃত, পুরস্কারপ্রত্যাখ্যানকারী এবং পুরস্কারপ্রত্যাখ্যান প্রত্যাহারকারীদের নিয়ে তাদের মাতামাতিটা মৌসুমী রোগের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। আর এ রোগে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হতে দেখা যাচ্ছে অপুরস্কৃত কবি-সাহিত্যিকদের। পুরস্কারকেন্দ্রিক নানা ঘটনাপরম্পরায় পুরস্কার আর পুরস্কার নেই। পুরস্কার পরিণত হয়েছে দিল্লির লাড্ডুতে। পাইলেও পস্তাইবেন, না পাইলেও পস্তাইবেন। দিলেও কম পস্তাইবেন না। পুরস্কার এখন কলঙ্ক চিহ্ন। পুরস্কারপ্রাপ্তরা এখন হাসির এবং পুরস্কারদাতারা সন্দেহের পাত্র। পুরস্কার ক্ষেত্রবিশেষে তিরস্কারের আরেক নাম।

এককালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার ছিল কবি-সাহিত্যিকদের পরম সম্মান। কিন্তু দলদাস, বিদেশ প্রবাসী ও আমলার তালিকা দীর্ঘ হতে হতে সে সম্মানবোধ আর নেই। একুশে পদক, স্বাধীনতা পদক ইত্যাদিও এখন গৌরবের পালক নয়। এককালে পাকিস্তানভক্তরা নাকি আদমজী টাইপের কিছু পুরস্কার পেতেন। স্বাধীন বাংলাদেশেও সে ধারা অব্যাহত। বাংলাদেশে সাম্প্রতিক দশকে যেসব পুরস্কার প্রদান এবং গ্রহণ করা হচ্ছে তা পুরস্কারপ্রথা বা রীতিকে দিনদিন হাস্যকর করে তুলছে। যারা পুরস্কার দিচ্ছেন তাদের ব্যাপারে ধারনা গড়ে উঠছে পেছনে নিশ্চয়ই কিছু দুইনাম্বারী আছে। পুরস্কারে যদি কিছু পরিস্কার হয়। যারা পাচ্ছেন তাদের হাতদুটো যে, ‘হস্তরেখাহীন’ ছিল, হয়ে ওঠেছে বা উঠবে এটা প্রতিষ্ঠিত বিষয়। একজন সাহিত্যিক বললেন, সবাই জাতে উঠতে চায়। যে প্রশ্নের মুখে লালন পড়েছিলেন, ‘সব লোকে কয় লালন কি জাত সংসারে’ বর্তমানের কবি-সাহিত্যিকরা এ প্রশ্নের উর্ধ্বে উঠে যেতে চান।

কয়েকটি দৈনিক বর্ষসেরা বই নির্বাচন শুরু করেছিল। দেখা যেত, কয়েকজন লেখক প্রতিবছরই বর্ষসেরা বই লিখছেন। একজনের মা-ভাই-বুয়া পর্যন্ত বর্ষসেরা বই লিখেছেন। প্রশ্ন দাঁড়ায়, প্রতিবছর হাজার হাজার বই প্রকাশ পায়, তার মধ্যে কয়টি বই পড়েন ওইসব দৈনিকের বর্ষসেরা নির্বাচকরা? সে গুমর আগেই ফাঁস হয়েছে। সম্প্রতি একটি দৈনিক তরুণতর এক কবির নামে পুরস্কার ঘোষণা করে। জানা যায়, ওই নামে একটি পুরস্কার আগে থেকেই প্রচলিত এবং বেশ কয়েকজন খ্যাতনামা কবি-সাহিত্যিক সে পুরস্কার পেয়েছেন। যাকগে। পুরস্কার ঘোষণার পর দেখা গেলো, ওই তরুণ কবির বিরুদ্ধে শুরু হলো আক্রমণ উৎসব। তার কবিতা এতই অশ্লীল যে, বাংলাদেশের প্রগতিশীল সাহিত্যিক সমাজও তা হজম করতে পারেনি! সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যুদ্ধ চলল নানামাত্রায়। দৈনিকটি কৌশলে গ্রন্থমেলায় পুরস্কারপ্রাপ্ত পাণ্ডুলিপিটি বই হিসেবে প্রকাশ করল না।

সম্প্রতি দেখা গেল, একটি আবাল যুক্তি দেখিয়ে পুরস্কার প্রত্যাহার করা হয়েছে। পুরস্কার প্রত্যাহারে যে আবাল যুক্তিটি দেয়া হয়েছে তার ব্যাখ্যা এমন দাঁড়ায় যে, পুরস্কারের জন্য এমন পাণ্ডুলিপি চাই যার কোনও কবিতা ইতিমধ্যে পাঠকের চোখে পড়েনি! কিন্তু তারা আসল বিতর্কের আসল ঘটনাটি এড়িয়ে গেছে। তারা এড়ালেও জনগণতো খেয়াল রাখে। একজনের কাছে শুনলাম, আসলে ওই দৈনিকের সম্পাদক পাণ্ডুলিপি বিচারকদের বাঁচিয়ে দিয়েছেন। এখন কেউ যদি প্রশ্ন করে, ওই অশ্লীল কবিতা কি বিচারকরা অন্ধকারের মধ্যে পড়ে রায় দিয়েছিলেন? নাকি শুড়শুড়ি দিতেই এ উদ্যোগ? আসলে সত্য এটাই যে, কচিপাঠা জবাই হবে, বৃদ্ধমেষ মাংসভোজীদের অরুচির কারণ হয়ে টিকে থাকবে। যাহোক, একই রকম আরও কয়েকটি পুরস্কার রয়েছে যা ব্যাংক ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানের অর্থে কয়েকটি দৈনিক প্রদান করেন। প্রতিটিই ভেতর-বাহির একই রকম। কেবল, পাত্র-পাত্রী ভিন্ন। ঢাকা শহরে পুরস্কারকেন্দ্রিক এ ধরনের কিছু চক্রশক্তি সক্রিয়। সবাই জানে, তারা তারাই। তারপরো কিছু লোক যে এসব নিয়ে চর্চা করে এটাই আশ্চর্যের!

একটি সাহিত্যপত্রিকার সম্পাদক তার বন্ধু-বান্ধব ও কাছের-পাশের জনদের পুরস্কার দেন। তার পুরস্কার নিয়েও আলোচনার তৈরি করে দিয়েছে একটি পার্টি। যেখানে একটি হাতাহাতির বা চড়াচড়ির ঘটনাকে কেন্দ্র করে সে পুরস্কার প্রত্যাখ্যান-প্রত্যাখ্যানপ্রত্যাহারের ঘটনা ঘটেছে। এ পুরস্কার বরং আমাদের কবি-সাহিত্যিকদের ঘরের বিষয়কে পরের টেবিলে তুলে এনেছে। মজার ব্যাপার হল, যার জন্য পুরস্কার প্রত্যাখ্যার এবং পুরস্কার প্রত্যাখ্যানকারী দুইজনের মধ্যেই শুরু হয়ে গেছে বিতণ্ডা। নীরব পর্যবেক্ষকরা মুচকি হাসতেই পারেন। জয়তু পুরস্কারদাতা-গ্রহিতা সম্প্রদায়।

২০শে জুন ২০১৫
কাফি কামাল: কবি, সাংবাদিক

নিউজওয়ার্ল্ডবিডি ডট কম।

আরও পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *