নায়করাজ রাজ্জাক আমার খুব প্রিয়, খুবই প্রিয়। আমাদের যৌবনের নায়ক বলেই কিনা জানি না, আমার কাছে রাজ্জাককেই সবচেয়ে ভালো লাগে। এমনকি উত্তম কুমার, দিলীপ কুমার, অমিতাভ, আমির খানের কথা মাথায় রেখেও, জানি আপনারা হাসাহাসি করছেন, লজ্জার মাথা খেয়ে আমি স্বীকার করছি রাজ্জাকই আমার সবচেয়ে প্রিয়। নায়ক রাজের বয়স হয়েছে, কয়েক দিন আগেও হাসপাতালে ছিলেন। তাই সব সময় উৎকণ্ঠায় থাকি। ১৭ জুন সকালে এটিএন নিউজের স্ক্রলে হঠাৎ চোখে পড়ল …নায়েক রাজ্জাক…। চমকে উঠলাম। প্রথমেই মনে হলো, আমার সহকর্মীরা স্ক্রলে বানান ভুল করে ‘নায়ক’কে ‘নায়েক’ লিখেছেন। আর নিশ্চয়ই নায়ক রাজের আবার কিছু হয়েছে। মিনিটখানেকের মধ্যে এত কিছু ভেবে, পুরোটা দেখে নিশ্চিন্ত হলাম, যাক নায়ক রাজ্জাক সুস্থই আছেন। এটা নায়ক রাজ্জাক নয়, নায়েক রাজ্জাকই। তবে স্ক্রলে যা দেখলাম, তাও কম দুশ্চিন্তার নয়। মিয়ানমারের সীমান্ত রক্ষীবাহিনী বর্ডার গার্ড পুলিশ-বিজিপি আমাদের সমুদ্রসীমায় ঢুকে বিজিবি সদস্য নায়েক রাজ্জাককে অপহরণ করে নিয়ে গেছে। তাদের গুলিতে আহত হয়েছেন সিপাহি বিপ্লব কুমার নামে আরও এক বিজিবি সদস্য।
ঘটনার চার দিন পরও এই লেখা তৈরি করা পর্যন্ত মিয়ানমার ফেরত দেয়নি নায়েক রাজ্জাককে। এমনকি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি মেলেনি এমন অজুহাতে পতাকা বৈঠকেও সম্মত হয়নি। তবে সবচেয়ে যেটা লজ্জা এবং গ্লানির, তা হলো, মিয়ানমারের বর্ডার গার্ড পুলিশ-বিজিপি তাদের ফেসবুক পেজে নায়েক রাজ্জাকের কয়েকটি ছবি পোস্ট করেছে। স্থানীয় পত্রিকায়ও নায়েক রাজ্জাকের ছবি ছাপা হয়েছে। নায়েক রাজ্জাকের যে ছবি বিজিপি প্রকাশ করেছে, তা আপত্তিকর, অবমাননাকর। প্রথম কথা হলো, তাকে হাতকড়া পরিয়ে রাখা হয়েছে। নায়েক রাজ্জাকের শরীরের উপরের অংশে বিজিবির পোশাক, তাতে নেমপ্লেটও আছে, নিচে লুঙ্গি পরা। সঙ্গে থাকা অস্ত্র, গুলি, মোবাইল ইত্যাদি একটি টেবিলে রেখে নায়েক রাজ্জাককে পাশে দাঁড় করিয়ে ছবি তোলা হয়েছে; ঠিক যেভাবে বাংলাদেশের র্যাব কোনো সন্ত্রাসীকে আটকের পর করে।
নায়েক রাজ্জাক কোনো সন্ত্রাসী নয়, অবৈধ অনুপ্রবেশকারী নয়। বরং মিয়ানমারের সীমান্ত রক্ষীরা সমুদ্রসীমা লঙ্ঘন করে আমাদের সীমায় প্রবেশ করে রাজ্জাককে ছিনিয়ে নিয়ে একদফা এবং বন্দীর সঙ্গে ভদ্রোচিত আচরণ না করে আরেক দফা অপরাধ করেছে। নায়েক রাজ্জাকের এই অপমান কোনো ব্যক্তির নয়, গোটা বাংলাদেশের, ১৬ কোটি মানুষের।মিয়ানমারের সীমান্ত রক্ষীদের বেদনাটা আমরা বুঝি। বাংলাদেশের সঙ্গে মিয়ানমারের সীমানা অল্প হলেও বাংলাদেশ মিয়ানমারের বড় বাজার। বিশেষ করে বাংলাদেশের যুব সমাজকে ধ্বংস করে দেওয়া ইয়াবার একমাত্র উৎস মিয়ানমার। আর এই ইয়াবা আসে সীমান্ত দিয়ে। অনানুষ্ঠানিকভাবে যতদূর জানি, ইয়াবার ব্যবসা হাজার কোটি টাকার। নিশ্চয়ই মিয়ানমার সীমান্ত রক্ষীরাও ভাগ পান এই টাকার।
কিন্তু সম্প্রতি মানব পাচার নিয়ে আলোচনার পর বাংলাদেশ সীমান্ত রক্ষীরা সীমান্তে নজরদারি কঠোর করেছে। তাতেই হয়তো পেটে লাথি পড়েছে মিয়ানমারের সীমান্ত রক্ষীদের। তা ছাড়া মানব পাচারেও নিশ্চয়ই বখরা পায় মিয়ানমার সীমান্ত রক্ষীরা। সেখানেও নিশ্চয়ই টান পড়েছে। এ ছাড়া মিয়ানমার কখনোই রোহিঙ্গাদের সে দেশের নাগরিক মনে করে না। তাদের দাবি, রোহিঙ্গারা বাংলাদেশের। তাই সুযোগ পেলেই তারা রোহিঙ্গাদের নির্যাতন করে, দেশছাড়া করতে চায়। রোহিঙ্গাদের অনেকেই তাই অবৈধভাবে বাংলাদেশে ঢুকে পড়ে বা সাগরপথে মালয়েশিয়ায় পাড়ি জমায়।
সীমান্তে কঠোর নাজরদারির কারণেই হয়তো রোহিঙ্গাদের পাচার করতে পারছিল না মিয়ানমারের সীমান্ত রক্ষীরা। তাই তারা ক্ষেপে থাকবে। তা ছাড়া আন্তর্জাতিক আদালতে জিতে মিয়ানমারের দখলে থাকা বিশাল সমুদ্রসীমার অধিকার পেয়েছে বাংলাদেশ। সেই দুঃখও হয়তো তারা ভুলতে পারেনি।যাই ঘটুক, এখানে আমাদের কোনো দায় নেই। জিনিসটা পরিষ্কার, মিয়ানমার সীমান্ত রক্ষীরা আমাদের সীমানায় ঢুকে জোর করে আমাদের নায়েককে অপহরণ করে নিয়ে গেছে, একজনকে গুলি করে আহত করেছে।
তারপর তারা আমাদের নায়েকের সঙ্গে অভব্য আচরণ করেছে। আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করেছে। আমাদের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী একে ‘ভুল বোঝাবুঝি’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। কিন্তু ঘটনার চার দিন পরও যখন আমাদের সীমান্ত রক্ষীকে ফেরত দেওয়া হয় না, বরং তার অবমাননাকর ছবি প্রকাশ করা হয়, তখন আর এটা ভুল বোঝাবুঝি থাকে না। ইতিমধ্যেই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূতকে ডেকে প্রতিবাদ জানিয়েছে। কিন্তু আমরা চাই আরও কঠোর প্রতিবাদ, চাই অন্যায়ের প্রতিকার। প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক আদালতে যেতে হবে।
এখন আর শুধু রাজ্জাককে ফেরত দিলেই হবে না, তার সঙ্গে আচরণের জন্য ক্ষমা চাইতে হবে।আমরা বলছি না, মিয়ানমারের সঙ্গে যুদ্ধ লাগিয়ে দিতে হবে। কিন্তু আমরা যে একটা স্বাধীন, আত্মমর্যাদাশীল জাতি সেটা মিয়ানমারকে বুঝিয়ে দিতে হবে। যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের আচরণের পুনরাবৃত্তি না হয়। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি হলো, সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে শত্রুতা নয়। আমিও এর সঙ্গে একমত। তবে যে আমার সঙ্গে বন্ধু, আমিও তার সঙ্গে বন্ধু। যে আমার সঙ্গে খারাপ, আমিও তার সঙ্গে আরও খারাপ। চোখে চোখ রেখে কথা বললে ঠিক আছে, চোখ রাঙাতে এলে চেষ্টা করব চোখ তুলে ফেলতে।বিজিপি প্রকাশিত ছবিতে নায়েক রাজ্জাককে ক্লান্ত বিধ্বস্ত মনে হলেও নত মনে হয়নি। আমাদের সৈনিকদের শির চির উন্নত। এই রাজ্জাকরাই নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অতন্দ্র প্রহরীর মতো আমাদের দেশ পাহারা দেয়। এই নায়েক রাজ্জাকরাই আমাদের আসল নায়ক। এদের এতটুকু অবমাননা আমরা সইব না, প্রতিবাদ করব, প্রতিকার চাইব।
(লেখাটি বাংলাদেশ প্রতিদিনের সৌজন্যে)
প্রভাষ আমিন: এটিএন নিউজের নিউজ অ্যান্ড কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স এডিটর।
নিউজওয়ার্ল্ডবিডি ডট কম।




Leave a Reply