বুধবার ৪ নভেম্বর ২০২৬

জাত যায় না ধুলে: বাংলাদেশকে কেন হেয় করতে চায় আনন্দবাজার

Anandabazarবাংলাদেশ-ভারত ক্রিকেট সিরিজের সংবাদ সংগ্রহ করতে ঢাকা আসা কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকার ক্রীড়া সাংবাদিক রাজর্ষি গঙ্গোপাধ্যায় ঢাকা থেকে চলে যাওয়ার সময়ও একটা ঠিক শ্লেষের লেখা লিখেই বিদায় হলেন। যিনি লিখেছিলেন, ”মাশরাফি নাকি ধোনির রুমে গিয়ে মুস্তাফিজকে আইপিএলে খেলানোর তদবির করেছেন এবং মুস্তাফিজুরকে প্রেরণা দেওয়ার জন্য ধোনির একটি ক্রিকেট ব্যাট চেয়েছেন”। ডাহা এই মিথ্যা কথা মাশরাফি নিজেই উড়িয়ে দিয়েছেন। এছাড়াও রাজর্ষির প্রতিটি লেখাতেই বাংলাদেশকে খোঁচা দেওয়া হতো। বাংলাদেশকে সবসময় ‘ওপার বাংলা’ লেখা এই রাজর্ষি এবার পদ্মার তীর হিসেবেই বরাবর উল্লেখ করেছেন। সর্বশেষ শনিবার ২৭ জুন আনন্দবাজারে প্রকাশিত লেখাটিতেও তিনি বাংলাদেশের অনিচ্ছাকৃত কিছু প্রশংসা করতে গিয়ে আদপে অনেক বিষয়ে শ্লেষাত্মক মন্তব্য করেছেন।

নিউজওয়ার্ল্ডবিডি ডট কমের পাঠকদের জন্য ওর লেখাটি প্রকাশ করা হলো:

পদ্মাপাড়ে আবেগ নাকি ক্রিকেট চালায়! ওটাই ও পারের আসল ক্রিকেটীয় সিস্টেম।

চমকে উঠছেন? উঠুন। বাংলাদেশ জনতাকে জিজ্ঞেস করুন, বলে দেবে।

সাংবাদিককুলকে জিজ্ঞেস করুন, উত্তরে এটা আসবে। এ দেশে (ভারতে) ক্রিকেট বলতে কী বোঝায়? প্রথমে তোমাকে স্থানীয় লিগ খেলতে হবে, তার পর রাজ্যের হয়ে রঞ্জি খেলতে হবে, সেখানে দুর্দান্ত কিছু করলে দেশের জার্সি। মানে প্রত্যেক পদে প্রতিভাকে বসতে হবে পরীক্ষায়, ছাঁকনিতে ঝুটোদের ছেঁটে ফেলে খাঁটিদের ছেড়ে দেওয়া হবে দেশের সেরা এগারোর দৌড়ে।

কেউ কেউ বলতে পারেন, পদ্মাপারে কি নেই? আছে। ওখানেও একটা বিকেএসপি আছে। যেখানে ক্রিকেটের সঙ্গে ক্রিকেটারদের পড়াশোনাটাও সমান গুরুত্বে চালানো হয়। ঘরোয়া ক্রিকেটও আছে। কিন্তু ওটাই ও পারের ক্রিকেটার তোলার প্রথম ও শেষ সিস্টেম নয়। মুস্তাফিজুর রহমানকে আর কোন বিকেএসপি তুলে এনেছিল?

বাংলাদেশ সাংবাদিককুলের অধিকাংশ তো তাঁকে ভারত সিরিজের আগে চিনতও না ভাল ভাবে। কারণ ঘরোয়া ক্রিকেটে যতটুকু যা খেলেছিলেন মুস্তাফিজুর, মনে রাখার মতো কিছু ছিল না। লোকে জানত, ছেলেটা কাটার মারতে পারে। কিন্তু সেটা যে রোহিত শর্মাদের মতো বাঘা ব্যাটসম্যানদের নিয়মিত ঘোল খাইয়ে ছেড়ে দিতে পারে, কেউ তো টেরই পায়নি। তা হলে?

তা হলে ওই যে, আবেগ। বাংলাদেশের এক প্রখ্যাত সাংবাদিক বলছিলেন যে, বাংলাদেশ জার্সির জন্য ক্রিকেটার এখন যত না তুলে আনে ক্রিকেটীয় সিস্টেম, তার চেয়ে বেশি তোলে আবেগ। মুস্তাফিজুরকে যা তুলে এনেছে। বাংলাদেশে ঘরোয়া ক্রিকেটের গুরুত্ব নাকি এখন আগের মতো নেই। কোনও কাগজ সে ভাবে কভারও করে না। ক্রিকেটাররাও আগ্রহ হারাচ্ছে। বরং বর্তমানে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ নাকি ওপেন ট্রায়াল কনসেপ্ট। বলা হল, আগে ক্রিকেট আড়াইশো জন দেখতে আসত। ফুটবলের রমরমা তখন।

এখন ওদেশে শুধুই ক্রিকেট। লোকে ক্রিকেট দিয়ে লাঞ্চ করছে, পাশবালিশ করে ঘুমোচ্ছে। ক্রিকেটারদের অবচেতনেও নাকি ধীরে ধীরে এই ধারণাটা ঢুকে যাচ্ছে যে, দেশের হয়ে ক্রিকেট ম্যাচে নামলেই তুমি হিরো। যে কোনও ফিল্মতারকার চেয়েও তখন তোমাকে লোকে চিনবে বেশি। এবং সেই প্রচারের ঝাড়বাতির তলায় দাঁড়াতে তোমার কোনও প্রচলিত সিস্টেমের সাহায্য পড়বে, তার কোনও মানে নেই। তার চেয়ে ওপেন ট্রায়াল আছে, সেখানে যাও। পারফর্ম করো। জাতীয় দলের দরজা হাট করে খুলে দাও। টেকনিকের কচকচির চেয়ে বেশি করে কাজে লাগাও তোমার ভেতরে প্যাশনকে। দিনের শেষে টেকনিক কেউ দেখবে না। দেখবে, তুমি কী মনোভাব নিয়ে মাঠে পারফর্ম করে গেলে।

ভিডিও বিশ্লেষণ, সুপার-টেকনোলজির যুগে অবিশ্বাস্য শোনাতে পারে। আবেগ, স্রেফ আবেগ দিয়ে এত কিছু সত্যি হয়? আবার যদি পারিপার্শ্বিকের মনোভাব দেখেন, মনে হবে না হয়ে উপায় নেই।

ফুটপাতের ফল বিক্রেতা থেকে সিএনজি চালক (ও পারের অটো)—প্রত্যেকে তুখোড় ক্রিকেট-বিশেষজ্ঞ। সাকিব-আল-হাসান কোথায় ভুল করলেন, বা বিরাট কোহলি কেন ফ্রি হিট পেয়েও মারতে ভুলে গেলেন, নিমেষে হাতে-গরম ব্যাখ্যা চলে আসবে। সঙ্গে যোগ করুন জঙ্গি মনোভাব। তুমি যত বড় ক্রিকেটারই হও, বাংলাদেশের মাঠে বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ জার্সিতে তুমি থাকা মানে গেলে।

বিরাট কোহলিকে কম সম্মান করে না বাংলাদেশ। এটাও বলা হয়, তেন্ডুলকর-পরবর্তী যদি কোনও ভারতীয় ক্রিকেটব্যক্তিত্ব বাংলাদেশ জনতার মন কেড়ে থাকে, তা হলে তিনি কোহলি। কিন্তু মাঠে দেখুন। কোহলি ব্যাট করছেন, গ্যালারি থেকে ‘ভুয়া, ভুয়া’। কোহলি গাল চুলকোচ্ছেন, গ্যালারি থেকে ‘ভুয়া, ভুয়া’। মোদ্দা কথা, তুমি সম্মানীয় ক্রিকেটার। কিন্তু ততক্ষণই করব যতক্ষণ তুমি বাংলাদেশ ছাড়া অন্য প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে খেলবে। ব্যস।

এমনিতেই বিশ্বকাপের পরে বলে এ বারের ভারত-বাংলাদেশ নিয়ে একটা চোরা উত্তেজনা ছিল প্রথম থেকে। তার উপর প্রথম ওয়ান ডে বাংলাদেশ জিতে যাওয়ায়, চোরা-টোরা উধাও হয়ে সেটা খুলে-আম হয়ে গেল। ভাবা যায়, টানা তিনটে ম্যাচে ‘মওকা..মওকা’ বলে একই ডেসিবলে চেঁচিয়ে গেল শের-ই-বাংলা? ধোনিকে খোঁচা দিল। তাসা বাজাল আনন্দে। কেউ কেউ বলছিলেন, ভারত যেন কিছু মনে না করে। পদ্মাপারের স্বভাবই এ রকম। ভাল কিছু হলে সেটাকে নিয়ে চরম উত্তেজিত, খারাপ কিছু হলে তেড়ে গালাগাল। আবেগকে মাঝামাঝি গণ্ডিতে বন্দি করে রাখা এখানে সম্ভব নয়। বাংলাদেশ ক্রিকেট মানেও নাকি তাই। টগবগে প্রতিভা+ঈষৎ সিস্টেম+অধিকাংশে আবেগ। তার উপরে জাতীয় দল ওয়ান ডে ক্রিকেটে এখন যা করছে, তার পর এ সব থামানো নাকি অসম্ভব। নিউজিল্যান্ডকে হারাচ্ছে। ওয়েস্ট ইন্ডিজকে ওড়াচ্ছে। পাকিস্তানকে হারাচ্ছে। ভারতকে ওড়াচ্ছে।

বহু দিন ধরে ক্রিকেট-বিশ্বের ‘বামন’ উপাধিতে আটকে থাকা বাঙালি মননকে আর এখন থামাবে কে? দরকারও কী? চলুক। প্রচলিত প্রথা শেষ কথা হলে জীবনকে তো একঘেয়ে মনে হত। মৃত্যু ঘটত রোম্যান্সের। কোনও এক মুস্তাফিজুর রহমানকেও তখন অগোছালো চুল উড়িয়ে ছুটে আসতে দেখা যেত না!

মিডিয়া ডেস্ক
নিউজওয়ার্ল্ডবিডি ডট কম।

মাশরাফি ও মুস্তাফিজকে নিয়ে রাজর্ষির লেখার প্রতিক্রিয়া: কেন ভুল-ভাল এসব গপ্প লেখে আনন্দবাজার

আরও পড়ুন