ঢাকার কলাবাগান থানার মাত্র একেবারে পাশেই দুর্বৃত্তদের গুলিতে শুক্রবার মধ্যরাতে খুন হয়েছেন ওবায়দুল হাসান (৩৬) নামের এক যুবক। তিনি চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহসভাপতি, সাবেক সংসদ সদস্য ও বিশিষ্ট শিল্পপতি নুরুল ইসলাম বিএসসির আপন ভাগ্নে। ৫ মাস আগে ওবায়দুল বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। সেই স্ত্রীও হয়ে গেলেন বিধবা, যার হাতের মেহেদীল রঙ এখনো রয়েছে।
ওবায়দুল পান্থপথের বসুন্ধরা সিটি শপিংমলে সানোয়ারা গ্রুপের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান সাব-জিরো (কোয়ালিটি) আইসক্রিম পার্লারের জেনারেল ম্যানেজার ছিলেন। শুক্রবার রাতে ৫৭, সার্কুলার রোড (ভূতের গলি), কলাবাগানের বাসা থেকে মায়ের জন্য ওষুধ আনতে বের হন তিনি। ওষুধ কিনে বাসায় ফেরার পথে দুর্বৃত্তরা তার মাথায় গুলি করে। শনিবার সকালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ময়নাতদন্ত শেষে তার লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
কলাবাগান থানার ওসি ইকবাল হোসেন জানান, ‘রাত সাড়ে ১২টার দিকে জাহাঙ্গীর নামে এক রিকশাচালক ওবায়দুলকে থানায় নিয়ে আসেন। তখনও পরিচয় জানা ছিল না। তিনি (ওসি) নিজেই দ্রুত ওই যুবককে হাসপাতালে নিয়ে যান। রাত পৌনে ২টার দিকে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, ছিনতাইকালে তাকে গুলি করা হয়েছে। নিহত যুবকের সঙ্গে কারও শত্রুতার কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে ব্যাগ ও মোবাইল ফোন দিয়ে দেয়ার পরও কেন তাকে গুলি করা হল- এ নিয়ে রহস্যের সৃষ্টি হয়েছে। প্রকৃত ঘটনা জানার জন্য আশপাশের লোকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
নিহতের মামা নুরুল ইসলাম বিএসসি বলেন, ‘ঘটনাটি নিরেট ছিনতাই হলে, তাদের ব্যাগ ও মোবাইল দিয়ে দেয়ার পরও কেন তারা গুলি করবে? আবার তার (ওবায়দুল) সঙ্গে কারও কোনো শত্রুতাও নেই যে খুন করবে’। তিনি আরও বলেন, ‘ওবায়দুল মাত্র ৭ মাস আগে বিয়ে করেছে। তার শ্বশুরবাড়ি লোহাগাড়ায়। স্ত্রী অ্যাডভোকেট। প্রায় ৫ মাস ধরে ওবায়দুল স্ত্রী ও মাকে নিয়ে ভূতেরগলিতে আমাদের (নূরুল ইসলাম বিএসসির) পুরান বাড়িতে থাকত।’ এর আগে ওবায়দুল তার নিউ ইস্কাটনের বাসাতেই ছিলেন। নুরুল ইসলাম আরও বলেন, ‘ঘটনার পর থেকে ওবায়দুলের স্ত্রী কয়েকবার জ্ঞান হারিয়েছে। তাকে সান্ত্বনা দেয়াও দুরূহ হয়ে পড়েছে।’
ওবায়দুলের মামি সানোয়ারা বেগম বলেন, ‘সম্পর্কে মামি হলেও আমি আসলে ছিলাম ওর মা। ২০০৩ সাল থেকে টানা ১৩ বছর সে আমার বাসায় ছিল। কোনোদিন কারও সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেনি। বসুন্ধরা সিটিতে আমাদের ব্যবসা দেখাশোনা করত। সে কারও আটআনা পয়সাও কখনও আত্মসাৎ করেনি। কখনও একটি সিগারেটও খায়নি। নিয়মিত নামাজ পড়ত, রোজা রাখত। এ সোনার ছেলেকে কারা গুলি করবে ভাবতেই পারছি না।’ তিনি আরও বলেন, ‘গুলি লাগার পর ওবায়েদ একটি কথাও বলতে পারেনি। তার মুখ থেকে একটি কথা শুনতে পারলেও হত্যাকারীদের ধরা সহজ হতো।’
ওবায়দুলের সহকর্মী কোয়ালিটি আইসক্রিমের চিফ অ্যাকাউনট্যান্ট অরূপ রতন রায় জানান, ওবায়েদসহ তিনি একই বিল্ডিংয়ে থাকেন। রাতে ওবায়দুলের স্ত্রীর কাছে খবর পেয়ে তিনি হাসপাতালে যান। সেখানে গিয়ে ওবায়দুলকে মৃত অবস্থায় পান। সে কোনো কথা বলতে পারেনি। ওবায়েদের সঙ্গে পেশাগত বা পারিবারিকভাবে কারও কোনো শত্রুতা থাকার কথা কখনও শোনেননি। ওবায়দুল বাসা আর অফিসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতেন।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী রিকশাচালক আবদুল করিম জানান, ওষুধ কিনে ফেরার পথে ১০৩, সার্কুলার রোড (ভূতেরগলি) পৌঁছালে একটি মোটরসাইকেলে তিন যুবক আসে। তারা অস্ত্র ধরে ওবায়দুলের কাছ থেকে সবকিছু নিয়ে নেয়। ভয় পেয়ে তিনি সব দিয়ে দেন। এরপরও আগন্তুকদের একজন বলে, ‘ওই গুলি কইরা দে’। তখন এক যুবক ওবায়দুলের মাথায় গুলি করে। দুর্বৃত্তরা চলে যাওয়ার পর জাহাঙ্গীর দ্রুত ওবায়দুলকে উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যান।
সুরতহাল প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কপাল থেকে এক ইঞ্চি পরিমাণ উপরিভাগে আগ্নেয়াস্ত্র ঠেকিয়ে গুলি করা হয়। গুলি মাথার পেছনের অংশ ভেদ করেনি। শরীরের অন্য কোনো অংশে জখম বা গুলির চিহ্ন ছিল না।
ওবায়দুলের ময়নাতদন্ত করেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক ডা. সোহেল মাহমুদ। তিনি বলেন, মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেছেন ওবায়দুল। গুলিটি কপাল দিয়ে প্রবেশ করে মাথার পেছন অংশ দিয়ে বের হয়ে গেছে। তাই গুলিটি খুঁজে পাওয়া যায়নি।
ওবায়দুলরা ৪ ভাই ও ৫ বোন। তার বাবা নেই। ওবায়দুল ছিলেন সবার ছোট। তাদের গ্রামের বাড়ি চট্টগ্রামের বাকলিয়া থানার চাঁন্দগাঁও এলাকার পূর্ব ষোলো শহরের খাজা রোডে। লাশ গ্রামের বাড়িতে নেয়ার পর সেখানেই দাফন করা হবে।
হত্যার ঘটনায় খালাতো ভাই ইয়াসির মো. আদনান বাদী হয়ে কলাবাগান থানায় মামলা করেছেন। নম্বর ১৩। পুলিশ মামলাটি ফৌজদারি দণ্ডবিধির ৩৯২/৩০২ ধারায় রেকর্ড করেছে। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই আনসার আলী জানান, ছিনতাইয়ের উদ্দেশ্যে মোটরসাইকেলে আসা তিন যুবক ওবায়দুলের কাছ থেকে ব্যাগ ছিনিয়ে নেয়ার চেষ্টা করে। এ সময় তারা ওবায়দুলের মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে গুলি করে পালিয়ে যায়।
রমনা বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার আবদুল বাতেন জানান, প্রাথমিক তদন্তে মনে হচ্ছে ছিনতাইকালে গুলিতেই এ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। তবে ব্যাগ দিয়ে দেয়ার পরও ছিনতাইকারীরা কেন গুলি করেছে বা এটা পরিকল্পিত কিনা বিষয়টি নিয়ে পুলিশ কাজ করছে। আমরা ঘটনাস্থলের কাছে একটি সিসি টিভির ভিডিও ফুটেজ পেয়েছি। সেখান থেকে আসামিদের শনাক্ত ও হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটি শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে। এ ছাড়া প্রযুক্তিগত তদন্তের মাধ্যমে খুনিদের শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে।
নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা
নিউজওয়ার্ল্ডবিডি ডট কম।


