বুধবার ৪ নভেম্বর ২০২৬

মুক্তিযোদ্ধা সনদ জমা দিতে গড়িমসি ঢাবি অধ্যাপকের

indexসনদ ছাড়াই ভূয়া মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সবধরনের সুযোগ সুবিধা ভোগ করার অভিযোগ উঠেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান ড. মো. আজিজুর রহমানের বিরুদ্ধে। নানান সময়ে তাকে সনদ জমা দিতে বলা হলেও তিনি গড়িমসি করে জমা দেননি। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধা দাবি করে ইতোমধ্যেই নিজের চাকুরীর মেয়াদ বৃদ্ধিসহ সবধরণের সুযোগ সুবিধাই নিয়েছেন তিনি। আর এতে করে সরকারের ক্ষতি হচ্ছে প্রায় ৪০ লক্ষ টাকা। এক্ষেত্রে তাকে সহায়তা করার অভিযোগ উঠেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বিরুদ্ধেও।

শনিবার উপাচার্য বরাবর পাঠানো এক অভিযোগপত্রে এসব তথ্য জানান ওই বিভাগের পাঁচজন শিক্ষক আ ফ ম ইউসুফ হায়দার, মকবুলুর রহমান, হোসনে জাহান বেগম, ওবায়দুল ইসলাম ও আমেনা বেগম।

অভিযোগপত্রে তারা উল্লেখ করেন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ৭.১১.২০১০ তারিখের ০৩.০৭৭.০১.০৪৬.০০.০৪.২০১০-৩৫৬ পরিপত্র অনুযায়ী যে সকল মানদন্ডের আলোকে সরকারি কর্মকর্তা/কর্মচারীকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে বিবেচনা করা হবে তার কোনও শর্তই পূরণ করেননি আজিজুর রহমান। সে হিসেবে তিনি কোনধরণের সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার কথা নয়। অথচ, ২০১৪ সালের ৩০ জুন তার এলপিআরে যাওয়ার কথা থাকলেও তিনি মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে চাকুরী বৃদ্ধির জন্যে আবেদন করেন। তার পরিপ্রেক্ষিতে সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মুক্তিযোদ্ধার সনদ জমা দেওয়ার শর্তে তার চাকরীর মেয়াদ ২ বছর বৃদ্ধি করা হয়। পরবর্তীতে মেয়াদ কমিয়ে ১ বছরে আনা হয়।

জানা যায়, গত ২৭ এপ্রিল আজিজুর রহমানকে রেজিষ্ট্রার প্রশাসন থেকে পাঠানো এক চিঠিতে (চিঠি নং রেজি: প্রশা-১/৫৭২৭৯) বলা হয়, মুক্তিযোদ্ধার সনদ জমা না দেয়ায় গত ৩০.০৬.২০১৪ থেকে তার চাকরী এলপিআর হিসেবে গণ্য করা হবে। ঐ সময়ের মধ্যে তাকে বিভাগের চেয়ারম্যান ও শহীদুল্লাহ হলের প্রাধ্যক্ষ পদে বহাল রাখা হয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি অনুযায়ী, এলপিআরে থাকাবস্থায় কেউ চেয়ারম্যান পদে বহাল থাকতে পারেন না। বিধি অনুযায়ী গত ৬ই মে রেজিস্ট্রার স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে (চিঠি নং রেজি: প্রশা-১/৩০৫৯৭) আগের চিঠির কার্যকারিতা বাতিল করা হয় এবং ৩০ জুন থেকে তাকে সরাসরি অবসরে যাওয়ার কথা বলা হয়। এরপর গত ১২ মে আবারো রেজিস্ট্রার স্বাক্ষরিত একটি চিঠি পাঠিয়ে ৬ তারিখের চিঠিটির কার্যকারিতা বাতিল করে মুক্তিযোদ্ধা সনদ ছাড়াই আজিজুর রহমানকে ১ বছরের চাকুরী সুবিধা প্রদান করা হয় এবং ৩০ জুন থেকে অবসরে যাওয়ার পরিবর্তে তাকে এলপিআর সুবিধা প্রদান করা হয়।

জানা গেছে, এভাবে মুক্তিযোদ্ধা সনদ ছাড়াই সরকারি সব সুযোগ প্রদানের মাধ্যমে তিনি নতুন বেতন স্কেলের আওতাভুক্ত হলেন। এর ফলে সরকারের প্রায় ৪০ লক্ষ টাকার আর্থিক ক্ষতি হবে বলে জানা গেছে।

এছাড়াও গত বছরের ১০ আগষ্ট সরকারের জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সিদ্ধান্ত নেয়, যেসব কর্মকর্তা-কর্মচারী সরকারি চাকরিতে যোগদানের সময় নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে ঘোষণা দেননি কিংবা পরবর্তীতে নিজেদেরকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে প্রমাণ করেননি, তারা কোন সুবিধা নিয়ে থাকলে তা বাতিল হয়ে যাবে। আর যারা ভুল তথ্য দিয়ে চাকরীর শেষ সময়ে এসে মেয়াদ বাড়িয়ে নিয়েছেন তাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি ব্যবস্থা নেয়া হবে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, অধ্যাপক আজিজুর রহমান ১৯৭৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেন। নিয়মানুযায়ী ২০১৪ সালের জুন মাসে তার অবসরে (এলপিআর) যাওয়ার কথা। সে হিসেবে গত ৩ জুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বিভাগের আরেক সিনিয়র অধ্যাপক ড. নাসিমা ফেরদৌসকে চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগের একটি চিঠিও দেয়। একই সাথে বিভাগের সব হিসাব-নিকাশ অধ্যাপক আজিজ থেকে বুঝে নিতেও নির্দেশ দেওয়া হয়। কিন্তু ঐ সময়ে নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা দাবি করে চাকরীর মেয়াদ বাড়ানোর আবেদন করেন আজিজুর রহমান।

মুক্তিযোদ্ধা সনদ ছাড়াই নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করেই তার আবেদনের প্রেক্ষিতে ঐ বছরের ২২ জুন সনদ দাখিল করার শর্তে চাকরীর মেয়াদ বাড়িয়ে দেয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। অথচ প্রভাষক হিসেবে যোগদানকালে নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে কোন নথিপত্রে উল্লেখ করেননি অভিযুক্ত ঐ শিক্ষক। অথচ ২০১০ সালের ৭নভেম্বর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে জারিকৃত একটি প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, যারা চাকরিতে প্রবেশের সময় নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে ঘোষণা দিয়েছিলেন, মুক্তিবার্তা পত্রিকা ও গেজেটে যাদের নাম প্রকাশিত হয়েছে এবং যারা প্রধানমন্ত্রীর স্বাক্ষরযুক্ত সনদ গ্রহণ করেছেন তারাই কেবল মুক্তিযোদ্ধা গণকর্মচারী হিসেবে বিবেচিত হবেন। সে হিসেবে মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় পড়েন না অভিযুক্ত ওই শিক্ষক।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক জানান, অভিযোগটি আমার হাতে এসে এখনো পৌঁছায়নি।

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা
নিউজওয়ার্ল্ডবিডি ডট কম।

আরও পড়ুন