একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির যোগ্য শিক্ষার্থীদের বাছাইয়ে জটিলতার পেছনে ডিজিটাল নামধারী এন আই খানকেই দায়ী করা হচ্ছে। শিক্ষামন্ত্রী দেশে না থাকায় তিনি মাতব্বরি করার সুযোগ পেয়ে যান। মন্ত্রীর নির্দেশনা অমান্য করে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির ক্ষেত্রে সব কলেজকে ডিজিটাল পদ্ধতি অনুসরণে বাধ্য করে শিক্ষা সচিব মূলত ভর্তি প্রক্রিয়ায় জটিলতা বাড়িয়েছেন। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র এ তথ্য জানায়। তবে যোগাযোগ করেও মন্ত্রীর নির্দেশনা উপেক্ষা বিষয়ে শিক্ষা সচিব কোনো বক্তব্য দিতে অস্বীকার করেন। এর আগে ভর্তির ফল প্রকাশে জটিলতার সব দায় তার নিজের বলে জানিয়েছিলেন সচিব নজরুল। বলেছিলেন, যাই হোক শিগগির ফলাফল জানানো হবে। এদিকে বৃহস্পতিবার মধ্যরাতের পর ফলাফল দেওয়ার কথা থাকলেও তা রবিবার রাত দশটায় এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত দেওয়া হয়নি।
এবার মোট ১১ লাখ ৫৬ হাজার শিক্ষার্থী একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির আবেদন করেছে। তবে একাধিক আবেদন করার সুযোগ থাকায় আবেদন জমা পড়েছে মোট ৩৩ লাখ।
ভর্তির ফল প্রকাশে তিন দিন দেরি হওয়ার পর বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধানকালে জানা গেছে, মন্ত্রীর লিখিত নির্দেশনা অমান্য করে তার অনুপস্থিতিতে শিক্ষা সচিব নজরুল ইসলাম খান ভর্তি নীতিমালা জারি করেন। অনলাইনে সব কলেজে ভর্তির নির্দেশনা জারি করা হলেও সংশ্লিষ্ট সফটওয়্যার শিক্ষার্থী সংখ্যার ভারে অকার্যকর হয়ে পড়ে।
মন্ত্রীর নির্দেশনা মেনে চললে সব শিক্ষার্থী ডিজিটাল পদ্ধতির আওতায় আসত না। মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, তাতে তৈরি করা সফটওয়্যারটিতে সমস্যা হত না। কারণ, গতবছর মন্ত্রীনির্দেশিত পদ্ধতিতে ফল মিলেছিল।
গত ২৫ জুন একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির মেধা তালিকা প্রকাশের কথা থাকলেও কারিগরি জটিলতায় রোববারও তা প্রকাশ করতে পারেনি আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় সাব-কমিটি; কবে-কখন এই তালিকা প্রকাশ করা হবে, তাও বলতে পারছেন না কেউ।
বুয়েটের আইআইসিটি-কে একাদশ শ্রেণিতে শিক্ষার্থী ভর্তির আবেদনপত্র সমন্বয় করে মেধা তালিকা প্রণয়নসহ সার্বিক দায়িত্ব দেওয়া হয়।
গত ১৬ মে বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোতে (ব্যানবেইজ) শিক্ষা সচিবের সভাপতিত্বে ভর্তি নীতিমালা নিয়ে সভা হয়।
মন্ত্রণালয়ের ও শিক্ষা বোর্ডের কর্মর্তারা জানান, শিক্ষা সচিব ওই সভার কার্যপত্র ২৫ মে অনুমোদন দিয়ে ভর্তি নীতিমালা চূড়ান্ত করতে শিক্ষামন্ত্রীর কাছে নথি উপস্থাপন করে চূড়ান্ত অনুমোদন চান। ভর্তি নীতিমালায় চূড়ান্ত অনুমোদন না দিয়ে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ নিজের হাতে লিখেন, “যে সকল প্রতিষ্ঠান দুর্বল, পশ্চাদপদ এবং শিক্ষার্থী পায়নি তাদের বিষয়টি বিবেচনায় রেখে আগামীতে পুরো পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে। গত বছর ৫০০ আসন বিশিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এই আওতায় (অনলাইন ও এসএমএসের মাধ্যমে ভর্তি) ছিল। এবার ৩০০ আসন বিশিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে অনলাইন বা এসএমএসের মাধ্যমে আবেদন প্রযোজ্য করা যায়।”
শিক্ষামন্ত্রীর এই নির্দেশনা আমলে নিয়ে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা গত ৩১ মে সচিবের কাছে নোট উপস্থাপন করেন, “অনুচ্ছেদের ৫৯ এর আলোকে খসড়া অনুচ্ছেদ ৪ এর সংধোশন করা হয়েছে। সচিব মহোদয়ের সদয় স্বাক্ষরের জন্য উপস্থাপন করা হলো।”
শিক্ষা সচিবের স্বাক্ষরে ১ জুন ভর্তি নীতিমালা জারি করা হয়। ওই নীতিমালার ৪ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়, “যেসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ন্যূনতম ৩০০ জন শিক্ষার্থী আছে সেসব প্রতিষ্ঠানে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তিতে অনলাইন বা টেলিটক মোবাইল এসএসএমের মাধ্যমে আবেদন করতে হবে। তবে যেসব প্রতিষ্ঠানে ৩০০ জনের কম শিক্ষার্থী আছে সেসব শিক্ষার প্রতিষ্ঠানও অনলাইনে ভর্তির কার্যক্রম গ্রহণ করতে পারবে।”
কাউকে কিছু না জানিয়ে গত ২ জুন শিক্ষা সচিব পুনরায় ভর্তি নীতিমালা জারি করেন। নতুন করে জারিকৃত নীতিমালার ৪ অনুচ্ছেদে বলা হয়, “শিক্ষাবোর্ড কর্তৃক অনুমোদিত সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির জন্য অনলাইনে অথবা টেলিটকে মোবাইল এসএমএম এর মাধ্যমে আবেদন করতে হবে।”
অনলাইনে আবেদনের জন্য নতুন করে ওয়েবসাইটের ঠিকানাও নতুন ভর্তি নীতিমালায় তুলে দেওয়া হয়।
নতুন করে ভর্তি নীতিমালা জারি করার সব শিক্ষার্থীকে বাধ্যতামূলকভাবে অনলাইন বা এসএমএসে আবেদন করতে হয়েছে। ১২ লাখ শিক্ষার্থীর আবেদন সমন্বয় করতে গিয়েই তৈরি হয়েছে জটিলতা।
ঢাকা বোর্ডের একজন কর্মকর্তা জানান, আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় সাব-কমিটির প্রস্তাব ছিল যেসব কলেজে ৫০০ আসন রয়েছে তাদের বাধ্যতামূলকভাবে অনলাইনে শিক্ষার্থী ভর্তি করানো। এছাড়া ৩০০ আসনের কলেজগুলোকে অনলাইনে ভর্তি করাতে তাদের ইচ্ছের উপর ছেড়ে দেওয়া। শিক্ষা বোর্ড ও মন্ত্রণালয়ের অন্য কর্মকর্তাদের পাশ কাটিয়ে শিক্ষা সচিব নিজেই ভর্তি সংক্রান্ত সব কার্যক্রম দেখভাল শুরু করেন। কারিগরি জটিলতা সারাতে অধ্যাপক কায়কোবাদের সঙ্গে এটুআইয়ের কর্মকর্তাদের বুয়েটে পাঠান তিনি।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে দীর্ঘদিন এটুআই নামের ডিজিটাল এক কর্মসূচির প্রকল্প পরিচালক হিসেবে এন আই খান (নজরুল ইসলাম খান) সারাদেশে পরিচিতি পান।
নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা
নিউজওয়ার্ল্ডবিডি ডট কম।


