বুধবার ৪ নভেম্বর ২০২৬

সরকারের সঙ্গে ঝামেলা মেটাতে চায় ইসলামী ব্যাংক

Islami Bank2জামায়াত নিয়ন্ত্রিত ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেডের পরিচালনা পর্যদের বেশিরভাগ সদস্য বর্তমান সরকারের সঙ্গে অলিখিত ঝামেলা মিটিয়ে ফেলতে উদ্যোগী হয়েছেন। ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সদস্যরাই পরিবর্তনের এ উদ্যোগ নিয়েছেন। ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের বৈঠকে একাধিকবার এ বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। পরিচালনা পর্ষদের পাশাপাশি নির্বাহীদের একটি অংশও এ পরিবর্তনের পক্ষে। ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের একাধিক সদস্যের সঙ্গে কথা বলে এ তথ্য জানা গেছে।

ইসলামী ব্যাংক পর্ষদের একজন সদস্য জানান, ব্যাংকের বেশিরভাগ মালিকই চাচ্ছেন সরকারের সঙ্গে মতভেদ মিটিয়ে ফেলতে। বিদেশী পরিচালকরাও এ বার্তাটিই দিয়েছেন। যে কারণে এখন নিজ থেকেই পর্ষদ পরিবর্তন আনা হচ্ছে। ব্যাংকটিকে আর বিশেষ কারও পক্ষে ব্যবহার করা হবে না।

অপর একটি সূত্র জানায়, সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকেও ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের শীর্ষ পর্যায়ে পরিবর্তনের পক্ষে একটি বার্তা দেয়া হয়েছে। পর্ষদ সদস্যরা বার্তাটি বুঝতে পেরে এর পক্ষে ব্যবস্থা নিচ্ছেন।

বাংলাদেশে শরিয়াহ ভিত্তিতে পরিচালিত ব্যাংকগুলোর মধ্যে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড সবচেয়ে বড়। এর মোট শেয়ারের প্রায় ৬৭ দশমিক ২৪ শতাংশই বিদেশী এবং বাকি ৩২ দশমিক ৭৬ শতাংশ দেশী। প্রতিষ্ঠার পর থেকে ব্যাংকটির পর্ষদে জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাই ছিলেন। এদের মধ্য থেকেই চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যানসহ অন্যান্য নীতিনির্ধারক পদে নিয়োগ হতো। নির্বাহী ও নিচের পর্যায়েও ওই ঘরানার জনশক্তিই বেশি। ফলে ব্যাংকটি পরিচালিত হতো ভিন্ন একটি আদর্শ নিয়ে। এ নিয়ে বর্তমান সরকারের সঙ্গে একটি শীতল সম্পর্ক বরাবরই রয়েছে।

অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতসহ সরকারের একাধিক মন্ত্রী ও নীতিনির্ধারক ইসলামী ব্যাংক নিয়ে কয়েক দফা বিরূপ মন্তব্য করেছেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদন্তে ইসলামী ব্যাংকের শরিয়াহবহির্ভূত আয়ের ব্যবহার নিয়ে নানা ধরনের অনিয়মের তথ্য বেরিয়ে এসেছে। শরিয়াহবহির্ভূত আয়গুলো তারা ইসলামী ব্যাংক ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে ব্যয় করত। এ ক্ষেত্রে ব্যাপক অনিয়ম হওয়ায় শরিয়াহবহির্ভূত আয় এখন আর ইসলামী ব্যাংক ফাউন্ডেশনে স্থানান্তর করা যাচ্ছে না। সেগুলো এখন ইসলামী ব্যাংকের শরিয়াহ বোর্ডের মাধ্যমে ব্যয় করা হচ্ছে। ব্যাংকের সিএসআর খাতের ব্যয় নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পাশাপাশি সরকারের একটি গোয়েন্দা সংস্থাও এর তদন্ত করছে। বিশেষ একটি রাজনীতিক দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অর্থায়ন করার নজির পাওয়া গেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদন্তে। এ কারণে এ ব্যাংকের ওপর বিশেষ নজর রাখা হচ্ছে।

সূত্র জানায়, গত ১২ ও ১৩ জুন ব্যাংকের পর্ষদের সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে ব্যাংকের বর্তমান চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মোস্তফা আনোয়ারসহ বিদেশী তিন পরিচালকের বক্তেব্যে আমূল পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। বৈঠকে তারা বলেছেন, ইসলামী ব্যাংক একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। মানবতার কল্যাণ সাধন করা এর অন্যতম লক্ষ্য। সে লক্ষ্য বাস্তবায়ন করতে গিয়ে ব্যাংক কারও সঙ্গে বিবাদে জড়াবে না। এমন কোনো কর্মসূচি বা আদর্শ লালন করবে না যার সঙ্গে সরকারের বিরোধ দেখা দিতে পারে। তারা বলেন, বিভিন্ন সময়ে ইসলামী ব্যাংকের সঙ্গে সরকারের এক ধরনের বিবাদ দেখা যাচ্ছে। এ ব্যাংক নিয়ে অর্থমন্ত্রী থেকে শুরু করে সরকারের একাধিক মন্ত্রী ও নীতিনির্ধারক বিভিন্ন ধরনের নেতিবাচক বক্তব্য দিচ্ছেন। যে কারণে জনগণের মধ্যে এক ধরনের বিভ্রান্তি দেখা দিয়েছে। পর্ষদ মনে করে, সরকারের সঙ্গে ব্যাংকের কোনো বিবাদ থাকা উচিত নয়। এ বিবাদ মিটিয়ে ফেলতে হবে। দু’দিনের এ সভায় পর্ষদের অন্য সদস্যরাও এ ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন। পর্ষদের কোনো সদস্য এর সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে বক্তব্য দেননি।

পর্ষদের বৈঠকের পর ব্যাংকের শীর্ষ পর্যায়ের কয়েকজন নির্বাহীও এ বক্তব্যকে সমর্থন করেন। বিষয়টি নিয়ে এখন ব্যাংক পাড়ায় ব্যাপক আলোচনা হচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র ম. মাহফুজুর রহমান বলেছেন , এ বিষয়টিকে আমরা ইতিবাচকভাবে দেখছি। কারণ দেশের বা রাষ্ট্রের কল্যাণে যে কোনো পরিবর্তনকে আমরা স্বাগত জানাই। এটি ভালো একটি উদ্যোগ বলেই বিবেচিত হবে। তিনি আরও বলেন, ব্যাংকের এ ধরনের পরিবর্তনের ফলে সার্বিক কাজে গতি আসবে।

সূত্র জানায়, ১৯৮৩ সালের ১৩ মার্চ বাংলাদেশের প্রথম ইসলামী ব্যাংক হিসেবে এর যাত্রা শুরু হয়। ওই সময়ে এটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াতেও ছিল প্রথম ইসলামী ব্যাংক। বর্তমানে এর শেয়ারহোল্ডার রয়েছেন ৩৩ হাজার ৬৮৬ জন। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের সর্বশেষ তথ্য অনুসারে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মধ্যে এ ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধন সবচেয়ে বেশি। বর্তমানে ব্যাংকটির পরিশোধিত মূলধন ১ হাজার ৬১০ কোটি টাকা। এর মধ্যে মূল উদ্যোক্তাদের ৫৮ দশমিক ৩৭ শতাংশ, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ৬ দশমিক ১৯ শতাংশ, বিদেশীদের ১৪ দশমিক ৭৬ শতাংশ এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ২০ দশমিক ৬৮ শতাংশ শেয়ার রয়েছে।

সূত্র জানায়, ব্যাংকটির সাবেক চেয়ারম্যান আবু নাসের মোহাম্মদ আবদুজ জাহের এখন পলাতক। অপর সাবেক চেয়ারম্যান মীর কাসেম আলী যুদ্ধাপরাধের মামলায় এখন কারাগারে। আরও কয়েকজন পরিচালক পদে পরিবর্তন হয়েছে। সরকারের খুব কাছের লোক হিসেবে পরিচিত ইঞ্জিনিয়ার মোস্তফা আনোয়ার বর্তমানে পর্ষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন। ইউসূফ আবদুল্লাহ আল রাজি, প্রফেসর এনআরএম বোরহান উদ্দিন এ দু’জনই ভাইস চেয়ারম্যান। অন্যান্য পরিচালক হিসেবে আছেন ইঞ্জিনিয়ার ইস্কান্দার আলী, ড. আবদুল হামিদ ফুয়াদ আল খতিব, মো. আবুল হোসাইন, নাসের আহমদ আল খোন্দকার, এএইচজি মহিউদ্দিন, ড. আরিফ সোলেমান। আমানতকারীদের পক্ষ থেকে পরিচালক হিসেবে আবদুস সালাম, হুমায়ূন বখতিয়ার। স্বতন্ত্র পরিচালক হিসেবে রয়েছেন প্রফেসর একেএম সদরুল ইসলাম। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পর্যবেক্ষক হিসেবে রয়েছেন বৈদেশিক মুদ্রা পরিদর্শন বিভাগের ইস্কান্দার মিয়া।

বতর্মানে প্রতিষ্ঠানটির বিদেশী উদ্যোক্তা হিসেবে আছে, ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (আইডিবি), কুয়েত ফিন্যান্স হাউস, জর্ডান ইসলামিক ব্যাংক, বাহরাইন ইসলামিক ব্যাংক, ইসলামি ব্যাংকিং সিস্টেম ইন্টারন্যাশনাল হোল্ডিং, আল রাজি কোম্পানি, জেদ্দার শেখ আহমেদ সালেহ জামনুন, ফুয়াদ আবদুল হামিদ আল খতিব, দুবাই ইসলামি ব্যাংক, পাবলিক ইন্সটিটিউশন ফর সোশ্যাল সিকিউরিটি, কুয়েতের মিনিস্ট্রি অব আওকাফ এবং মিনিস্ট্রি অব জাস্টিজ ডিপার্টমেন্ট অব মাইনর অ্যাফেয়ার্স। এদের পক্ষে বিদেশী পরিচালকরাও রয়েছেন পর্ষদে।

গত বছরের শেষ দিকে দু’দফায় ৭০ লাখ শেয়ার বিক্রি করেছে বিদেশী উদ্যোক্তা দুবাই ইসলামিক ব্যাংক। একই বছর ৪ লাখ ৬৫ হাজার শেয়ার বিক্রি করেছে বাহরাইন ইসলামিক ব্যাংক। তবে তারা ব্যাংকের মালিকানা থেকে সরছে না। বোনাস শেয়ারগুলো বিক্রি করে মুনাফার একটি অংশ নিয়ে যাচ্ছে। গত বছর মুনাফা কমে যাওয়ায় ব্যাংকটির বিদেশী শেয়ারহোল্ডাররা পর্ষদ সভায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বলেও জানা গেছে।

গত বছর পর্যন্ত ব্যাংকের মোট আমানত ছিল ৫৬ হাজার ৬৯৬ কোটি টাকা। শেয়ারবাজার বাদে তাদের বিনিয়োগ ৪৬ হাজার ৩৪৭ কোটি টাকা। আমানত ও বিনিয়োগের অনুপাত হচ্ছে ৭৯ দশমিক ৮৮ শতাংশ। এ সময়ে ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ২৮১ কোটি টাকা। ২০১৪ সালে ব্যাংকের নিট আয় হয়েছে ৩৯৯ কোটি টাকা।

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা
নিউজওয়ার্ল্ডবিডি ডট কম।

আরও পড়ুন