বুধবার ৪ নভেম্বর ২০২৬

বিতর্কিত গম দ্রুত বণ্টন চলছে: সারাদেশে আতঙ্ক

Wheat_Brazilসরকারি পর্যায়ে ব্রাজিল থেকে আমদানিকৃত ২ লাখ টন গমের মধ্যে ১ লাখ ৪০ হাজার টন গম তড়িঘড়ি করে বিতরণ করা হয়েছে। খাদ্য মন্ত্রণালয় এ গম দ্রুত শেষ করছে। টিআর ও কাবিখা কর্মসূচিতে এসব গম দেদারসে দেয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র এ তথ্য জানায়।

এর বাইরে খোলা বাজারে নিম্নমানের আটা দেয়া হচ্ছে। তবে সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ, বিজিবি, পুলিশ, আনসার, কোস্টগার্ড, ফায়ার সার্ভিসসহ অন্যান্য সংস্থার সদস্যদের গম গছিয়ে দেয়ার চেষ্টা করা হলেও ১৫ দিন পর খারাপ প্রতিক্রিয়া পেয়েছে খাদ্য অধিদপ্তর। ওই পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে তাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে।

এদিকে পচা ও নিম্নমানের গম নিয়ে সারা দেশে ভোক্তাদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। ব্রাজিল থেকে আমদানিকৃত নিম্নমানের গম হাতবদল হয়ে দেশের বিভিন্ন বাজারে চলে যাওয়ার পর এ আতঙ্ক দানা বাঁধছে। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আটা-ময়দার মিল মালিকরা জানান, ব্রাজিল থেকে যে মানের গম এসেছে, তা সংশ্লিষ্ট দেশে গো-খাদ্য হিসেবেও ব্যবহার করা হয় না। মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে এসব নিম্নমানের গম খালাসের অনুমোদন দেয়া হয়েছে। একশ্রেণীর মিল মালিক এসব নিম্নমানের গম কিনে আটা তৈরি করে তা বাজারজাত করছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ব্রাজিল থেকে আমদানিকৃত গম ভাঙার পরিমাণ ছিল অনেক বেশি। এছাড়া এতে আর্দ্রতার পরিমাণও তুলনামূলক অনেক কম। ২৮ জুন বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদের (বিসিএসআইআর) অধীন খাদ্যবিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের প্রতিবেদনে বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে দেখা গেছে, গমে ভাঙা অংশের গ্রহণযোগ্য মাত্রা রয়েছে ৫ থেকে সর্বোচ্চ ৮ শতাংশ। কিন্তু ব্রাজিল থেকে আমদানিকৃত গমে ভাঙা অংশ পাওয়া গেছে ৯ দশমিক ৯৩ থেকে সর্বোচ্চ ২১ দশমিক ১১ শতাংশ। এছাড়া গমে আর্দ্রতা থাকার মাত্রা ১৩ দশমিক ৫ শতাংশ। কিন্তু অধিকাংশ নমুনায় আর্দ্রতা পাওয়া গেছে ৯ দশমিক ৬১ থেকে ১১ দশমিক ৮৪ শতাংশ। ফলে গম থেকে আটাও হচ্ছে কম। প্রতি ১০০ কেজি গম থেকে ৭৫ কেজি আটা হওয়ার কথা থাকলেও কোনো কোনো ক্ষেত্রে ৭০ কেজির নিচে আটা পাওয়া যাচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে জানা গেছে, ব্রাজিল থেকে আমদানিকৃত গম গন্ধযুক্ত বলে ওএমএস ডিলাররা ওই গম থেকে উৎপাদিত আটা নিচ্ছেন না। ফলে মহানগরীর বিভিন্ন এলাকায় ১৫ দিন ধরে ওএমএসের মাধ্যমে আটা বিক্রি বন্ধ রয়েছে।

খাদ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, গত মার্চ ও এপ্রিলে পুলিশসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে তাদের রেশনের জন্য নিম্নমানের গম দেয়া হয়। গন্ধযুক্ত এ গমের অভিযোগ পাওয়ার পরই বিষয়টি সম্পর্কে খাদ্য মন্ত্রণালয়কে জানায় এসব বাহিনী। কিন্তু এ চিঠির বিষয়ে কোন সাড়া দেয়নি খাদ্য মন্ত্রণালয় ও খাদ্য বিভাগ। এরপর পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীগুলো বিষয়টি সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়কে জানায়।

এরপরই গম কেলেঙ্কারির থলের বিড়াল বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীগুলো চিঠি দিয়ে জানায়, ব্রাজিল থেকে আমদানিকৃত দুই লাখ টন পচা গমের আকার সরু। ওই দেশে এ গমটি জিরা নামে পরিচিত। এই গম ব্রাজিলে সাধারণত পশুখাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টিবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট এবং বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদের পরীক্ষায় ব্রাজিল থেকে আমদানিকৃত গম অত্যন্ত নিম্নমানের প্রমাণিত হলেও খাদ্য মন্ত্রণালয় সেই গমকে ভাল বলছে।

খাদ্য মন্ত্রণালয় তাদের নিজস্ব পরীক্ষার বরাত দিয়ে মন্ত্রণালয় বলছে, এই গম খাওয়ার উপযোগী। তবে আমদানি করা গম নিয়ে প্রশ্ন উঠার পর তিনটি পরীক্ষাগারে গমগুলো পরীক্ষা করা হলেও গম খাওয়ার যোগ্য কি-না বা এর মধ্যে কোন বিষাক্ত পদার্থ আছে কি-না দেশে সেই ধরনের পরীক্ষা করা হয়নি। সবচেয়ে জরুরি পরীক্ষা না করেই খাদ্য মন্ত্রণালয় বলছে, এ গম সম্পূর্ণ খাবার উপযোগী। বিষয়টি নিয়ে সুষ্ঠু তদন্ত, পূর্ণাঙ্গ পরীক্ষা এবং আমদানি করা গম বাজারে না ছাড়ার পরামর্শ বিশেষজ্ঞ মহলের।

 

এদিকে ব্রাজিল থেকে আমদানি করা গম মানুষের খাওয়ার উপযোগী কি-না তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট। খাদ্য সচিব ও খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে এ রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে। বিচারপতি কাজী রেজা-উল হক এবং বিচারপতি আবু তাহের মো. সাইফুর রহমানের হাইকোর্ট বেঞ্চ মঙ্গলবার এ আদেশ দেন। একটি রিট আবেদনের প্রাথমিক শুনানি গ্রহণ করে আদালত এ আদেশ দেন। বিষয়টি আগামী ৫ই জুলাই আবার আদালতের কার্যতালিকায় আসবে।
পচা গম আমদানি-সংক্রান্ত সংবাদপত্রে প্রকাশিত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে পাভেল মিয়া নামের এক আইনজীবী রোববার এ রিট আবেদন করেন। আদালতে আবেদনের পক্ষে শুনানি করেন ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন।

অন্যদিকে, রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল তাপস কুমার বিশ্বাস।

আদালতে সংবাদপত্রে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্রাজিল থেকে আমদানি করা ৪০০ কোটি টাকার দুই লাখ টন নষ্ট ও পচা গম নিয়ে খাদ্য মন্ত্রণালয় ও খাদ্য অধিদপ্তর লুকোচুরি করছে। পচা গম আমদানির অভিযোগ ওঠার পর খাদ্যমন্ত্রীর পদত্যাগেরও দাবি ওঠে। যদিও আমদানি গম খাওয়ার অনুপযোগী নয় বলে এর আগে দাবি করেছিলেন খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম। এ গম আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, কাজের বিনিময়ে খাদ্যসহ সরকারের বিভিন্ন কর্মসূচিতে বিতরণ করা হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর পক্ষ থেকেও এরই মধ্যে এ গমের মান নিয়ে আপত্তি জানানো হয়েছে।

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা
নিউজওয়ার্ল্ডবিডি ডট কম।

আরও পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *