ঘরের মাঠে বড় দলগুলোর বিপক্ষে একের পর জয় পাচ্ছে বাংলাদেশ দল। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে মাশরাফি বাহিনীর সাফল্যের হার যেমন বাড়ছে, তেমনি এর সঙ্গে মিলিয়ে গা ঢিল দিচ্ছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড। বিশেষত কিছু অনাকাঙ্খিত ঘটনার ঘটছে, যা আসলে বিসিবিরই অব্যবস্থাপনার চিত্র প্রকট হয়ে ওঠে। ফতুল্লায় খেলার মাঠে দর্শকদের সঙ্গে মারামারি যদি বাইরের ঘটনা হিসেবে বাদও দেওয়া হয়, তবে শনিবার ৩ জুলাই মিরপুরে শের ই বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামের ঘটনাপ্রবাহগুলোকে তো বাদ দেওয়া যায়না। এদিন ক্রিকেটারদের বিজ্ঞাপনী শ্যুটিংয়ের নামে যা হলো তা তো কোনোভাবেই খেলোয়াড়সুলভ পরিবেশ বজায় থাকেনি, এর ওপর এই ধরনের একটি আন্তর্জাতিক স্টেডিয়ামে সাংবাদিককে মাটিতে ফেলে লাঞ্ছিত করার ঘটনাও নজিরবিহীন।
এর আগেও পাকিস্তান ও ভারত ম্যাচের পর নিরাপত্তার সব বেষ্টনি ভেঙে মাঠে এবং ড্রেসিং-রুমেও ঢুকে পড়ে লোকজন। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের প্রটোকল মানা হচ্ছে না কোনোভাবেই। গত কয়েক সিরিজ ধরে এসব ঘটনার হার বেড়েই চলেছে। এসব ঘটনা এড়িয়ে যায়নি জাতীয় দলের অধিনায়ক মাশরাফি বিন মর্তুজাকেও। এছাড়া শনিবার বিসিবির নিরাপত্তা কর্মীদের হাতে সাংবাদিক লাঞ্ছিত হওয়ার ঘটনাকে দুর্ভাগ্যজনক বলে মন্তব্য করেছেন মাশরাফি।
রোববার মিরপুরে শুরু হবে প্রথম টি-২০ ম্যাচ। তার আগেরদিন সংবাদ সম্মেলনে এসব অনাকাঙ্খিত ঘটনা সম্পর্কে মাশরাফি বলেন, ‘অবশ্যই সবকিছুর একটা প্রটোকল আছে। আর আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের কথা যদি বলেন, সবার একটা কার্ড আছে; এমনকি আমরা খেলোয়াড়ও কিন্তু ড্রেসিংরুমে ঢোকার সময় নিশ্চিত হই, কার্ড সঙ্গে আছে কিনা। আমাদেরও কার্ড নিয়েই ঢুকতে হয়। একটা প্রটোকলের ভেতর দিয়েই এই স্টেডিয়ামের সবকিছু চলে। কাউকে যদি শারীরিকভাবে নির্যাতন করা হয় সেটা অবশ্যই দুর্ভাগ্যজনক। এটা অবশ্য কারোর জন্যই কাম্য নয়।’
আন্তর্জাতিক সিরিজের আগে এমনটা হবে সেটাই কারোর কাম্য নয়। তাই দক্ষিণ আফ্রিকার সিরিজের আগেন এসবের একটা সুষ্ঠু সমাধানও চেয়ে মাশরাফি বলেন, ‘শেষ কয়েকটা ম্যাচে দেখেছি, মাঠে অনেক দর্শকরা ঢুকে গিয়েছে, হয়েতা বাইরে থেকে চলে এসেছে। এই জিনিসগুলো আন্তর্জাতিক ম্যাচে হলে বাইরের খেলোয়াড়রা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে পারে। তাদের কাছে মনে হতে পারে, এটা আবার কেমন? এগুলো আগে কখনো হয়নি, শেষ সিরিজেই আমি দেখেছি।’
এরপর তিনি বলেন, ‘অবশ্যই নিরাপত্তার দায়িত্বে যারা আছেন, তারা খেয়াল করবেন। অবশ্যই সিরিউরিটি যারা আছেন, তাদের কিছু কাজ থাকে যেন সব কিছু সুশৃঙ্খলভাবে চলে, আমাদেরও দায়িত্ব সব কিছু সুশৃঙ্খলভাবে চালানোর। এর ভেতরে কোনো কিছু হলে সেটা বোঝাপড়ার মাধ্যমে ঠিক হোক, সিরিজের আগে আমিও সেটাই চাই।’
প্রশ্ন হলো মাশরাফি কেন এসব বললেন? কি ঘটেছে?
সেদিন বিজ্ঞাপনের শ্যুটিংয়ের প্রয়োজনে প্রভাবশালী বিজ্ঞাপনী সংস্থা বিটপি’র শ্যুটিং ইউনিট কাজের জন্য ড্রেসিংরুমের কাছে গেলেও বিসিবি’র নিরাপত্তা বিভাগের গাফিলতিতে ইউনিটের বাইরের লোকজনও ঢুঁকে পড়ে ড্রেসিংরুমে। সাধারণ জনতা এমনকি সাংবাদিকদের জন্যও নিষিদ্ধ এই ড্রেসিংরুম। তবে প্রবেশের সুযোগ পেয়ে আক্ষরিক অর্থেই ড্রেসিংরুম লণ্ডভণ্ড করে ফেলেন লোকজন। ড্রেসিংরুমে গাদাগাদি করে দাঁড়িয়ে-বসে-শুয়ে পড়ে কিছু লোক। কেউবা টাইগার ক্রিকেটারদের ব্যাট-প্যাড ধরে টানাটানি শুরু করে। কেউ আবার সোফার উপর পা তুলে নোংরা করেছে মাশরাফি-মুশফিকদের প্রিয় এই জায়গাটি। খেলার আগে শ্যুটিংয়ের জন্য অনুমোদন দেওয়া নিয়েও উঠেছে প্রশ্ন। অবশ্য, বিটপি’র মালিক যে রেজা আলী; আওয়ামী লীগের সাংসদ!
মিরপুরে এমন চিত্র দেখে হতাশ হয়েছেন মাঠে আসা ক্রীড়া সাংবাদিকরা। এক সিনিয়র ক্রীড়া সাংবাদিক মন্তব্য করেন, ‘বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ম্যাচ শেষেও দর্শকরা মাঠে ঢুকে পড়েন। এটা নিয়ন্ত্রণে রাখা বিসিবি’র দায়িত্ব। কিন্তু তাদের সিকিউরিটি বিভাগ সেটা করতে পারছে না। এসব গাফিলতির ধারাবাহিকতায় আজকের অপ্রীতিকর ঘটনাটি ঘটেছে। যা কারোরই কাম্য নয়।’ পরবর্তীতে এ অবস্থার চিত্র ধারণ ও ছবি তুলতে গেলে বচসা হয় বিভিন্ন ইলেকট্রনিক্স ও প্রিন্ট মিডিয়ার ক্যামেরাম্যান ও ফটো সাংবাদিকদের সঙ্গে। এদিকে ততক্ষণে মাঠের অনুশীলনে নেমে পড়ে দক্ষিণ আফ্রিকা। দুপক্ষের উত্তেজনায় ভড়কে যান প্রোটিয়া ক্রিকেটাররা। পরে বিসিবির মিডিয়া ম্যানেজার রাবিদ ইমাম এসে পরিস্থিতি শান্ত করেন।
গত বৃহস্পতিবার একটি মোবাইল ফোন কোম্পানির বিজ্ঞাপনের শ্যুটিংয়ের জন্য পুরো স্টেডিয়ামের মাঠ ও খেলোয়াড়দের ড্রেসিং রুম হয়ে যায় গ্রামের মাঠের মতো। কে কোথায় কোন দিক দিয়ে যাচ্ছে, আসছে, কোনো খোঁজ ছিলনা। এছাড়া শনিবার নিরাপত্তাকর্মীরা একজন পরিচিত সাংবাদিককে যেভাবে লাঞ্ছিত করে তা একটি আন্তর্জাতিক ভেন্যু হিসেবে শের ই বাংলা’র জন্য একেবারেই লজ্জাকর।
ধিক্ বিসিবি, শত ধিক্।
ক্রীড়া প্রতিবেদক, ঢাকা
নিউজওয়ার্ল্ডবিডি ডট কম।



