বাংলাদেশে ধর্মীয় উন্মাদনার মুখে অব্যাহত হুমকির মুখে মুক্তচিন্তার ব্লগাররা যারা সুযোগ পাচ্ছেন তারা কেউ দেশ ছাড়ছেন, কেউ ঘরে স্বেচ্ছাবন্দিত্ব বেছে নিচ্ছেন। নিরাপত্তার জন্য পুলিশের কোনও সহযোগিতা পাচ্ছেন না বলেও অভিযোগ রয়েছে তাদের। হত্যার হুমকির মুখে প্রথাবিরোধী প্রয়াত লেখক হুমায়ুন আজাদের ছেলে ব্লগার অনন্য আজাদ প্রাণভয়ে দেশ ছেড়ে গত সপ্তাহে পাড়ি জমিয়েছেন জার্মানিতে। সেখানে তিনি আশ্রয় চাওয়ার আবেদন করবেন।
অন্যন্য আজাদ ব্লগারদের হিটলিস্টের পরবর্তী টার্গেট ছিলেন। তাঁকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছিল। তিনি তাঁর ফেসবুক স্ট্যাটাসে জার্মানিতে একটি স্কলারশিপ পাওয়ার কথা জানিয়েছেন। আর জার্মানি যাওয়ার পর সেখানে তোলা ছবি ফেসবুকে আপ করেছেন।
জার্মানি থেকে মঙ্গলবার রাতে অনন্য আজাদ জানান, ‘আমি হুমকির মুখে জীবন বাঁচাতেই জার্মানি চলে এসেছি। কবে ফিরবো জানি না। দেশে আমি নিরাপত্তা পাইনি।’
তাঁর ঘনিষ্ঠরা জানিয়েছেন, জীবন বাঁচাতেই অনন্য আজাদ জার্মানিতে স্কলারশিপ নিয়ে চলে গেছেন। যাওয়ার পর দেশে তাঁর বন্ধুদের ফোনে এ কথা জানিয়েছেন। এ ব্যাপারে ঢাকায় অনন্য আজাদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও কাউকে পাওয়া যায়নি।
গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র এবং ব্লগার ডা. ইমরান এইচ সরকার বলেন,‘এরকম আরও অনেক ব্লগার হুমকির মুখে আছেন। তাদের নিরাপত্তার কোনও ব্যবস্থা পুলিশ করেছে বলে আমার জানা নেই।’ তিনি বলেন,‘ব্লগারদের নিরাপত্তার চেয়ে বড় কথা হল- হুমকিদাতাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা। পুলিশ এ ব্যাপারে তেমন কোনও তৎপরতা দেখাচ্ছে না। সরকার যেহেতু নিস্পৃহ পুলিশেরও তাই গা ছাড়া ভাব।’
ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) যুগ্ম কমিশনার মনিরুল ইসলাম জানান,‘ব্লগাররা নিরাপত্তা চাইলে আমরা আমাদের মতো করে নিরাপত্তার ব্যবস্থা নেই। সবার বাসার সামনে পুলিশ বসিয়ে রাখা কোনও যৌক্তিক কাজ না। আমরা তাদের ব্যাপারে সতর্ক থাকি। নজর রাখি।’
অনন্য আজাদ সম্পর্কে তিনি বলেন,‘সে আমাদের কাছে নিরাপত্তা চয়নি বা কোনও থানায় নিরাপত্তা চেয়ে কোনও জিডিও করেনি।’
হুমকির মুখে চাকরি ছেড়ে জিডি করে স্বেচ্ছাবন্দিত্ব গ্রহণ করা ব্লগার মাহমুদুল হক মুন্সি বাধন বলেন, ‘ব্লগারদের এখন আর পুলিশের ওপর আস্থা নেই। তাই তারা আর পুলিশের কাছে যান না বা অভিযোগ করেন না। ৫ জুলাই আমার সঙ্গে জার্মানিতে অনন্য আজাদের টেলিফোনে কথা হয়েছে। সে জানিয়েছে, পুলিশের ওপর তারও কোন ভরসা ছিল না।’ তিনি বলেন,‘আমার মতো আরও অনেক ব্লগার হয় ঘরে স্বেচ্ছাবন্দি হয়ে আছেন, নয়তো জীবন বাঁচাতে দেশ ছাড়ার চেষ্টা করছেন।
হত্যার হুমকি পেয়ে আরেক ব্লগার ও গণজাগরণ মঞ্চের কর্মী মাহমুদুল হক মুন্সি বাধন গত কয়েকমাস ধরে চাকরি ছেড়ে স্বেচ্ছায় গৃহবন্দি জীবন বেছে নিয়েছেন। উগ্রবাদীদের হুমকির পরও নিরাপত্তা পাননি বলে দাবি তাঁর।
ব্লগার বাধন জানান, তাঁকে গত বছরের আগস্টে পাঁচ দফা হত্যার হুমকি দেওয়া হয় ফেসবুক ও টেলিফোনে। এরপর তিনি পল্লবী থানায় জিডি করেন (নম্বর-১৭৭৫)। কয়েকদিন তার বাসার সামনে পুলিশ ঘোরাঘুরি করেছে। তারপর আর খোঁজ নেয়নি। তাঁকে ফেসবুকে হুমকি দেওয়ার স্ক্রিন শটও তিনি জিডির সঙ্গে দিয়েছিলেন পুলিশকে। কিন্তু সেই জিডির তদন্ত বা হুমকিদাতাদের চিহ্নিত করার কোনও উদ্যোগ নেয়নি পুলিশ। বাধন জানান, ‘এখন আমি ঘরেই থাকি। একটি আইটি ফার্মে চাকরি করতাম তাও ছেড়ে দিয়েছি। আর বাইরে বের হই না। খুব প্রয়োজন হলে কাউকে সঙ্গে নিয়ে যাই।’
বাধনের জিডির তদন্ত কর্মকর্তা এসআই তৌহিদুল আবেদিন একদিন আগে পল্লবী থানা থেকে বদলি হয়ে মিরপুর থানায় যোগ দিয়েছেন। তিনি বলেন,’জিডি হওয়ার পর আমি বাধনের বাসায় গিয়ে খোঁজ নিয়েছি। তাঁর নিরাপত্তা দেওয়া হয়েছিল তখন। এখনও তিনি নিরাপদ আছেন। তবে জিডির তদন্ত করে উঠতে পারিনি।’
তিনি বলেন, ‘এ ধরনের জিডির তদন্ত করা কঠিন। কারণ কল লিস্ট বা ফেসবুক ধরে তদন্তের প্রযুক্তি থানায় নেই। ডিবির আছে। তবে ডিবির সহায়তা আমি নেইনি।’
নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা
নিউজওয়ার্ল্ডবিডি ডট কম।


