বুধবার ৪ নভেম্বর ২০২৬

কুয়েতে বিদেশি নারী গৃহকর্মী বাড়ছেই

nepali-maids_in_kuwaitরাবেয়া আশরাফী পিংকী॥
মধ্যপ্রাচ্যের ছোট দেশ কুয়েতে বিদেশি নারী গৃহকর্মীদের বিষয়ক বাণিজ্য বাড়ছেই। দেশটির ৯০ শতাংশ বাসাবাড়িতে নিযুক্ত পরিচারিকার একজন ভিনদেশী। গৃহপরিচারিকা সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়োগদাতাকে আকর্ষণের উদ্দেশ্যে বিদেশী নারীকে বিভিন্ন উপায়ে পরিবেশন করে। পশ্চিম আফ্রিকার সিয়েরালিওন থেকে অনেক নারী কুয়েতে আসেন কাজের অনুসন্ধানে। লক্ষ্য থাকে সেবিকা বা হোটেলকর্মী হওয়ার। এজন্য কুয়েতের বিভিন্ন এজেন্টের সঙ্গে যোগাযোগ করে স্বদেশ ছাড়েন তারা। ‘চাকরি’ নামক সোনার হরিণটি ধরা দিলে গুনতে হয় ১ হাজার পাউন্ড। কিন্তু কুয়েতে এসে তাদের পড়তে হয় এক জটিল পরিস্থিতির মুখোমুখি। এজেন্ট তাদের প্রস্তাব দেয় গৃহপরিচারিকার কাজের। সে সময় ভিনদেশে আর কোনো উপায় না থাকায় নারীদের ওই কাজেই থিতু হতে হয়।

রাজধানীবাসীর কাছে এজেন্টদের পরিচারিকা বিক্রির কৌশলটি মনে করিয়ে দেয় মধ্যযুগের ক্রীতদাস বাণিজ্যের কথা, তবে পদ্ধতি খানিকটা আধুনিক। ক্রীতদাসের মতো পরিচারিকাও বেচাকেনা হয় একাধিকবার।

নিজের অভিজ্ঞতা এভাবেই বর্ণনা করলেন সিয়েরালিওন থেকে কাজের অনুসন্ধানে কুয়েতে আসা এক নারী। তিনি তার দেশে সেবিকার কাজ করতেন। বলেন, ‘এজেন্টরা তাদের অফিসে আমাদের নিয়ে আসে। গ্রাহকদের দৃষ্টি থাকে আমাদের দিকে। আমাদের কাউকে পছন্দ হলে গ্রাহকের বাড়ি দিয়ে আসে এজেন্টরা। দিনের প্রায় ২৪ ঘণ্টা কাজের মধ্যে কাটে। সাপ্তাহিক ছুটি নেই। মোবাইল ব্যবহার করতে দেয়া হয় না। ভালো করে কথাও বলেন না বাড়ির সদস্যরা। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে শারীরিক নির্যাতন করতেও পিছপা হন না তারা।’ ২৪ বছর বয়সী অ্যাডামাও ছিলেন এক বাড়িতে। সেখানে তার সঙ্গে আচরণ করা হতো ঠিক কেনা গোলামের মতো। শরীরে নির্যাতনের চিহ্নও জ্বলজ্বল করছে। বেতনও দেয়া হতো না তাকে।

শুধু সিয়েরালিওন নয়, অন্য দেশ থেকেও কাজের খোঁজে আসেন অনেক নারী। এশিয়া থেকে আসার হার বাড়ছে। তবে এখনো তা আফ্রিকাকে ছাড়িয়ে যেতে পারেনি। ক্যামেরুন, কেনিয়া ও ইথিওপিয়ার মতো দেশগুলো থেকেও আসছেন তারা।

কুয়েতে একবার গৃহকর্মী হিসেবে নিয়োগ পেয়ে গেলে নারীদের জীবন কঠিন হয়ে পড়ে। দেশটির কাফালা স্পন্সরশিপ সিস্টেমে পরিচারিকারা তাদের নিয়োগকর্তার অনুমতি ব্যতীত চাকরি পরিবর্তন বা ছাড়তে পারবেন না। এমনকি তাদের আবাসিক ঠিকানাও মালিকের সঙ্গে জড়িত।

গত বছর সিয়েরালিওন থেকে আগত নারীদের গল্প জনসমক্ষে উঠে এলে টনক নড়ে দেশটির কর্তৃপক্ষের। তারা নেপাল ও ইন্দোনেশিয়ার পথ অনুসরণ করে নাগরিকদের গৃহকর্মকে পেশা হিসেবে নেয়ার কাজে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। কিন্তু অবৈধ পথে সিয়েরালিওনের নাগরিকরা এ পেশায় প্রবেশ করছেন। গৃহকর্মীর কাজে নিষেধাজ্ঞা জারি থাকা সত্ত্বেও কৌতূহলবশত দেশটির দূতাবাস কুয়েতের চাকরিদাতা এজেন্টদের ফাইলপত্র জরিপ করেছে। নথিতে প্রায় ১০০ নারী পাওয়া গেছে।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের তথ্য থেকে জানা গেছে, ২০০৯ সালে কুয়েতে জনশক্তি রফতানিকারক দেশগুলোর দূতাবাস কর্মীদের কাছ থেকে ১০ হাজারেরও বেশি অভিযোগ পেয়েছে। দুঃখ-দুর্দশার কারণগুলো থেকে বাদ পড়েনি শারীরিক, মানসিক, যৌন নিপীড়নের মতো বিষয়। এছাড়া পাসপোর্ট প্রতিসংহার, বেতন-ভাতা না দেয়ার মতো ব্যাপার ঘটছে অহরহ। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যে কুয়েতের নাগরিকরাই বেশি গৃহকর্মের সঙ্গে জড়িত বলে মানকাধিকার-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। কুয়েতের আদমশুমারির বিবৃতি অনুসারে, ২০০৫ সালে দেশটির ২ লাখ ৪৬ হাজার নারী-পুরুষ গৃহকর্ম পেশার সঙ্গে নিযুক্ত ছিল। একবার গৃহকর্মী হিসেবে নিয়োগ পেয়ে গেলে সে নারীদের আর কোনো খোঁজখবরই রাখেন না এজেন্টরা। তারা তাদের প্রাপ্য অর্থটুকু নিয়েই সরে পড়েন অন্য ধান্ধায়।

অ্যাডামাকে গৃহকর্তার পছন্দ না হওয়ায় ফিরিয়ে দেয় এজেন্টের কাছে। শাস্তিস্বরূপ তাকে তিনদিনের জন্য আটকে রাখা হয় এজেন্টের বাড়ির ছোট কুঠুরিতে। কোনো খাবার ছাড়াই অ্যাডামাকে দিনপাত করতে হয়েছিল অন্ধকারে। তার পর আবারো অন্য ক্রেতার কাছে তাকে বিক্রির চেষ্টা শুরু করে বর্বর এজেন্ট।

পরবর্তীতে অ্যাডামা আশ্রয় পেয়েছিলেন সিয়েরালিওনের দূতাবাসে। তবে এর আগে তার ঠাঁই হয় পলাতক গৃহপরিচারিকাদের আশ্রয়কেন্দ্রে। দেখা হয় তারই মতো ৩০০ নারীর সঙ্গে। তারা সবাই সেখানে বাড়ি ফেরার অপেক্ষায়। কিন্তু আশ্রয়কেন্দ্রটি যেন আরেকটি বন্দিশালা। এখানের বাসিন্দাদের বাইরে বের হতে দেয়া হয় না। সেলফোন ব্যবহারেও রয়েছে নিষেধাজ্ঞা। তবে একটাই স্বস্তি— সপ্তাহ শেষে বাড়ির লোকদের সঙ্গে আশ্রয়কেন্দ্রের অফিসের ফোনের মাধ্যমে যোগাযোগ করা যায়। এখানে নারীরা বন্দি থাকেন হয়তো এক মাসের জন্য, বছরের জন্য নয়। অন্যদিকে কুয়েত সরকার গৃহকর্মী নিয়োগ নীতিমালায় পরিবর্তন আনার কথা বললেও এখনো এ-সংক্রান্ত কোনো আইন পাস করেনি।

তাই অ্যাডামা, আলিমার মতো ভিনদেশী নারীদের এখনো সরকারি আশ্রয়কেন্দ্রে ঠাঁই নিতে হবে। কুয়েতে আসার কয়েক সপ্তাহ পরেই আলিমা অনুভব করলেন তার শরীরে নতুন প্রাণের অস্তিত্ব। এজেন্টকে বলা সত্ত্বেও তাকে বাড়ি পাঠানোর কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। শুধু পরিবারের তরফ থেকে অর্থ পাঠালেই এটি সম্ভব ছিল। কিন্তু তার পরিবার নিম্নমধ্যবিত্ত হওয়ায় সেটা আর হয়ে ওঠেনি। এ অবস্থায় আলিমাকে কুয়েতের হাসপাতালে একাই সন্তান রিচির জন্ম দিতে হয়।

এসব বিষয়ে কুয়েত ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশনের অভিবাসী কর্মী কার্যালয়ের প্রধান আবদুল আলঘানিম জানালেন কিছু কথা। সরকার বহুদিন ধরেই গৃহকর্মীদের নিয়ে একটি আইনের খসড়া তৈরি করেছে। কিন্তু পার্লামেন্ট এখনো তা পাস করেনি। সরকার ও পার্লামেন্ট— কেউই বিষয়টি নিয়ে খুব একটা বিব্রত নয়। তাই কোনো গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপও নেয়া হচ্ছে না।

(বণিকবার্তার সৌজন্যে)

নিউজওয়ার্ল্ডবিডি ডট কম।

আরও পড়ুন