ঢাকায় গিয়ে ইসলামাবাদের বিরুদ্ধে কড়া মনোভাব দেখালেও আগামী বছর সার্ক সম্মেলনে যোগ দিতে পাকিস্তান যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। দু’দেশের মধ্যে এক বছরেরও বেশি সময় থমকে থাকা আলোচনা শুরু হয়ে যাবে তার আগেই। শীঘ্রই দিল্লিতে ভারত এবং পাকিস্তানের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার বৈঠক হতে চলেছে।
শুক্রবার ১০ জুলাই রাশিয়ার উফা শহরে দু’দেশের শীর্ষনেতাদের দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের পরে এই মাইলফলক সিদ্ধান্ত ঘোষণা করলেন বিদেশসচিব এস জয়শঙ্কর।
বৈঠকের পর যে যৌথ বিবৃতি প্রকাশিত হয়েছে, তাতে ভারতের উদ্বেগের দিকগুলি গুরুত্বের সঙ্গে জায়গা করে নিয়েছে। রয়েছে মুম্বই সন্ত্রাসে অভিযুক্তদের মামলা দ্রুত শেষ করার অঙ্গীকার। পাশাপাশি, গোটা অঞ্চলে ‘শান্তি বজায় রাখা’ এবং ‘উন্নয়নকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া’র জন্য যে ‘যৌথ দায়িত্ব’ রয়েছে, সে কথাও উল্লেখ করা হয়েছে এই যৌথ বিবৃতিতে।
সম্প্রতি ঢাকা গিয়ে পাকিস্তানের নাম না করে সন্ত্রাস প্রশ্নে ইসলামাবাদের চূড়ান্ত সমালোচনাও করে এসেছেন মোদী। আবার রমজানের সময় ফোন করে শুভেচ্ছাও জানিয়েছেন শরিফকে।
সব মিলিয়ে নরেন্দ্র মোদী প্রধানমন্ত্রীর কুর্শিতে বসার পর থেকেই পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কে যে টানাপড়েন চলছে, আজ তাতে নতুন মোড় এল বলেই মনে করছেন কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞেরা। সময় নষ্ট না করে এই বৈঠককে দ্রুত স্বাগত জানিয়েছে ওয়াশিংটন। আজ মোদী-শরিফ বৈঠকের পর বিদেশ দফতরের মুখপাত্র জন কিরবি জানিয়েছেন, ‘‘আমরা চাই উত্তেজনা কমুক। আমরা এটাও চাই, দু’দেশ নিজেদের মধ্যে বিষয়গুলি নিজেরাই মিটিয়ে নিক। উত্তেজনা বাড়ুক সেটা কেউই চায় না।’’ কিরবির মতে, গোটা অঞ্চল ইতিমধ্যেই বিপজ্জনক হয়ে রয়েছে। উত্তেজনা না কমলে সেই অস্থিরতা আরও বাড়বে।’’
গত এক মাস ধরেই চেষ্টা চলছিল যাতে রাশিয়ায় সাংহাই কোঅপারেশন অর্গানাইজেশন (এসসিও)-এর পার্শ্ববৈঠকে মুখোমুখি হতে পারেন দুই নেতা। সীমান্ত অশান্ত হয়েছে, দু’দেশের মধ্যে কটুক্তি বিনিময় হয়েছে, কিন্তু টেবলে বসে মুখোমুখি আলোচনারও যে প্রয়োজন রয়েছে সেই কূটনৈতিক মনোভাব থেকে পিছপা হননি মোদী বা শরিফ কেউই। এ ব্যাপারে গোড়ায় কড়া অবস্থান নিয়েই চলছিল আরএসএস তথা সঙ্ঘ পরিবার। আরএসএস নেতৃত্ব যদিও পাকিস্তানের সঙ্গে আলোচনার বিপক্ষে ছিলেন না, কিন্তু তাঁদের বক্তব্য ছিল, আলোচনা হলে ইসলামাবাদের সঙ্গে কড়া দরকষাকষির পথেই হাঁটতে হবে সরকারকে। আজ বৈঠকে ভারতীয় উদ্বেগের দিকটি সবিস্তার তুলে ধরেছেন প্রধানমন্ত্রী। সূত্রের খবর, আলোচনায় মুম্বই সন্ত্রাসের প্রধান মস্তিষ্ক জাকিউর রহমান লকভি থেকে মুম্বই সন্ত্রাসে মদতকারীদের দ্রুত শাস্তির আবেদন— সব কিছুই উঠে এসেছে। লকভির বিষয়টি যৌথ বিবৃতিতে রাখা না হলেও মোটা দাগে সন্ত্রাস প্রসঙ্গ রাখা হয়েছে।
সূত্রের খবর, গত মাসে রমজানের শুরুতে মোদী যখন টেলিফোন করে নওয়াজ শরিফকে শুভেচ্ছা জানান তখনই তাঁদের মধ্যে আসন্ন বৈঠকের নীল নকশা তৈরি হয়ে গিয়েছিল। যদিও এটি দু’দেশের মধ্যে পুরোদস্তুর পূর্বনির্ধারিত বৈঠক নয়, কিন্তু গুরুত্বের হিসাবে এটিকে পূর্ণাঙ্গ কূটনৈতিক মর্যাদাই দেওয়া হয়েছে দু’দেশের পক্ষ থেকে। এক ঘণ্টারও বেশি সময় একান্তে আলোচনা করেছেন দুই শীর্ষ নেতা। যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে,
১) সীমান্তরক্ষী বাহিনীর ডিজি এবং পাকিস্তান রেঞ্জার্সের ডিজি’র মধ্যে শীঘ্রই বৈঠক হবে।
২) পনেরো দিনের মধ্যে এক দেশ অন্য দেশের বন্দি মৎস্যজীবীদের ছেড়ে দেবে।
৩) ধর্মভিত্তিক পর্যটন বাড়ানোর রূপরেখা তৈরি করা হবে।
৪) মুম্বই সন্ত্রাস সংক্রান্ত মামলা দ্রুত শেষ করা হবে। কণ্ঠস্বরের নমুনা-সহ বাড়তি তথ্যও দেওয়া হবে।
গত মাসে মায়ানমারে ভারতীয় সেনা অভিযানের পর মোদী সরকারের মন্ত্রীদের করা কিছু মন্তব্যের জেরে যথেষ্ট তিক্ততা তৈরি হয়েছিল দু’দেশের সম্পর্কে। আন্তর্জাতিক মহলও বিষয়টিকে ভাল ভাবে নেয়নি। দক্ষিণ এশিয়া তথা আফগানিস্তান-সহ সামগ্রিক অঞ্চলটির নিরাপত্তা এবং শান্তি বজায় রাখার প্রশ্নে ভারতের উপর যথেষ্ট চাপ রয়েছে আমেরিকার পক্ষ থেকে। ইসলামাবাদ এবং নয়াদিল্লির মধ্যে সম্পর্কের উন্নতি হোক এটা চায় পশ্চিম বিশ্ব। অন্য দিকে, খোদ প্রধানমন্ত্রী মোদীও মনে করেন, পাকিস্তানের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক ভাল করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। যুদ্ধংদেহী প্রতিবেশীকে আলোচনার টেবিলে বসিয়ে যদি ব্যস্ত রাখা যায় তা আখেরে জাতীয় স্বার্থের জন্য ভাল— এমনটাই মনে করেন মোদী। তবে বিদেশনীতির সঙ্গে যেহেতু ঘরোয়া রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা এবং জাতীয় আবেগ সংযুক্ত তাই প্রয়োজনে কূটনৈতিক ভাবে কড়া মনোভাবও নিতে হয়েছে তাঁকে।
নয়াদিল্লি প্রতিনিধি
নিউজওয়ার্ল্ডবিডি ডট কম।



