উনিশ শতকের শুরুতে জন্ম নেওয়া মিলাডা হোরাকোভা চেক নারী রাজনীতিবিদ হিসেবে সমাদৃত। তিনি গ্রাজুয়েশন শেষ করে রাজনীতিতে নাম লেখান। ন্যাশনাল সোশ্যালিস্ট পার্টি দিয়ে তার যাত্রা শুরু হয়। নাৎসি বাহিনীর বিরুদ্ধে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও বিপ্লবের ডাক দেওয়া এই দলটিতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন ছিলেন। ১৯৩৯ সালের দিকে চেকোস্লাভিয়া জার্মানির হাতে চলে এলে হোরাকোভা আড়ালে চলে যান। আন্ডারগ্রাউন্ড বিপ্লবীদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে রাজনীতি করে যান তিনি।
এ নিয়ে চাপা উত্তেজনা সব সময়ই ছিল। এ ধরনের রাজনীতি মেনে নিতে পারেনি অনেকে। কিন্তু রাজনীতির মাঠে এর উত্তাপের কমতি ছিল না। আলোচনার বাইরে ছিলেন না হোরাকোভা। ১৯৪৮-এর পর প্রেক্ষাপট বদলে যায়। জনসম্মুখে আসেন তিনি। সক্রিয় রাজনীতিতে আবার মুখর হয়ে ওঠেন।
কিন্তু তার অতীত কর্মকাণ্ড ভুলে যায়নি কেউ। বিপ্লবের নামে সন্ত্রাসের অভিযোগে ১৯৪৯ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর গ্রেফতার হন তিনি। তাকে বিচারের মুখোমুখি দাঁড় করানো হয়। আরও ১২ জন সদস্যের বিরুদ্ধে এই বিচার প্রক্রিয়া চলে। শুনানি ও আপিল বিভাগের কাজ শেষ হওয়ার পর তাকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করে আদালত।
চল্লিশের দশকের শুরুতে চেক প্রজাতন্ত্র জার্মানির হাতে এলে চেক নারী রাজনীতিবিদ মিলাডা হোরাকোভা জড়িয়ে পড়েন আন্ডারগ্রাউন্ড বিপ্লবীদের সঙ্গে। এ ধরনের রাজনীতি তত্কালীন প্রেক্ষাপটে অনেকেই মেনে নিতে পারেননি। আলোচনা-সমালোচনার বাইরে ছিলেন না মিলাডা। এর পর ১৯৪৯ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর গ্রেফতার হন। সে সময় যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী উইন্সটন চার্চিল ও বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন মিলাডার মৃত্যুদণ্ড বাতিলের অনুরোধ জানালেও তা মঞ্জুর হয়নি। ১৯৫০ সালের ২৭ জুন মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেন আদালত। এর ঠিক আগের দিন তার ষোড়শী কন্যাকে একটি চিঠি লেখেন তিনি। দীর্ঘ এ চিঠির চুম্বক অংশ পাঠকদের উদ্দেশে দেয়া হলো:
আমার স্নেহময়ী কন্যা জানা,
আবার আমাদের বিচ্ছিন্ন হতে হলো। এবার আমি আর ফিরে আসছি না। তাই বলে ভয় পেয়ো না, মনে দুঃখও রেখো না। সবসময় নতুন কিছু শেখার চেষ্টা করবে। জীবন অনেক কঠিন, কাউকে প্রশ্রয় দিতে জানে না সে। প্রতিবার কোনো কাজ শুরুর আগে তুমি ১০ বার বিপর্যস্ত হতে পার। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব, এসবে অভ্যস্ত হতে হবে। কোনোক্রমেই ব্যর্থ হওয়া যাবে না। জীবনযুদ্ধের সৈনিক হওয়ার সিদ্ধান্ত নাও। মনোবল সঞ্চয় করো, স্পষ্ট উদ্দেশ্যে পা বাড়াও, দেখবে জয় তোমার নিশ্চিত। তোমার বয়স এখনো অনেক কম। অনেক কিছু জানার বাকি। কিন্তু আমার হাতে আর সময় নেই— তোমাকে কোনো কিছু বোঝানোর কিংবা তোমার কৌতূহল মনের প্রশ্নগুলোর উত্তর দেয়ার।
বড় হয়ে একদিন তুমি ভেবেও কিনারা করতে পারবে না— কেন তোমার মা জীবনের শ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি হিসেবে তোমাকে পেয়েও নিজের জীবনকে অদ্ভুত ছকে ফেলে দিল? আবার হয়তো তুমি নিজেই এসবের সঠিক সমাধান উপলব্ধি করতে পারবে। মনে রেখো, কোনো কিছু সঠিকভাবে জেনে এবং সত্যতার মাপদণ্ডে বিচার করেই সমাধান সম্ভব। কেবল বই বা পাঠ্যপুস্তকের জগত্ থেকে নয়, তোমাকে শিখতে হবে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে। সবার কাছ থেকে শেখার চেষ্টা করবে সবসময়, সেটা গুরুত্বপূর্ণ হোক বা না হোক! খোলা চোখে বিশ্বকে অনুধাবন করবে। নিজের দুঃখগাথা ও আগ্রহ নিয়ে একলা পড়ে থেকো না; অন্যদেরও বোঝার চেষ্টা করবে।
স্বার্থের সঙ্গে জড়িত না থাকলেও কোনো বিষয়কে অবহেলা করবে না। সবকিছুর প্রতি আগ্রহ থাকলে ভালো। এভাবেই তুমি প্রতিটি বস্তুর মধ্যে সমতা, পার্থক্য ও নিজস্বতা খুঁজে পাবে। মানুষ পৃথিবীতে একা জীবনযাপন করতে পারে না। সুখী হতে হলে দায়িত্ব নিতে হবে।
জেনে রাখো, মূল্যবোধ গড়ে তুলতে শুধু নিজেকে ঠিকভাবে জানলেই হয় না; নিজের চরিত্রেরও মূল্যায়ন প্রয়োজন। কিন্তু সবার আগে তোমাকে অন্যদের ব্যাপারে সচেতন হতে হবে। সম্ভব হলে পৃথিবীর অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যত্ সম্পর্কেও ঈষত্ ধারণা থাকা আবশ্যক।
ছোট করে বললে, কোনো কিছু সম্পর্কে জ্ঞান লাভের মানে হলো, বিষয়টি সঠিকভাবে বুঝতে সক্ষম হওয়া। ব্যক্তির খাতিরে বা অন্য কোনো কারণে নিজের কান বন্ধ রাখলে চলবে না। তোমার চিন্তা ও মতামতে কেউ বাগড়া দেয়ার চেষ্টা করলে থামবে না। এমনকি এজন্য শারীরিকভাবে কেউ আঘাত করলেও দমে যাবে না। পরীক্ষা করে দেখবে, ভেবেচিন্তে কাজ করে আত্মসমালোচনাও করবে। হ্যাঁ, আত্মসমালোচনায় কোনো অপরাধ নেই। বিতর্কে বিপক্ষে থাকলেও আত্মোপলব্ধির জন্য আত্মসমালোচনা জরুরি। আবার একগুয়ে আর জেদি মতামত নিয়ে গাল ফুলিয়ে দিন কাটিয়ে দিলে হবে না। কিন্তু যখন তুমি বুঝতে পারবে নিজের সিদ্ধান্তই সঠিক এবং তোমাকে আশাতীত মূল্যায়ন করা হচ্ছে না— তখন সেই বিতর্কের যুদ্ধে এগিয়ে যেতে হবে। এক্ষেত্রে প্রয়োজনবোধে জীবন বাজি রাখতে হবে।
ইতি
‘মা’



Leave a Reply