আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক পদটি ঐতিহাসিকভাবেই গুরুত্বপূর্ণ। এই পদের জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সরকারের মন্ত্রীত্ব ত্যাগ করেছিলেন। খন্দকার মুশতাক বয়সে সিনিয়র ছিল, তাকে বাদ দিয়ে মওলানা ভাসানী শেখ মুজিবুর রহমানকে সাধারণ সম্পাদক পদে সমর্থন করায়ও যোগ্যতর হবার কারণে শেখ মুজিব সাধারণ সম্পাদক হন। সেই থেকে নাকি শেখ মুজিবের বিরুদ্ধে খন্দকার মুশতাক গংদের ষড়যন্ত্রের কাল মাকড়সার জাল বিস্তার। ইয়াজউদ্দিন মইনউদ্দিন ফকরুদ্দিনের সরকারের প্রথম ও প্রধান কাজ ছিল মাইনাস শেখ হাসিনা। তখনকার ভারপ্রাপ্ত সভাপতি জিল্লুর রহমান ও ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফ শেখ হাসিনার মুক্তির প্রশ্নে অবিচল ছিলেন।
শেখ হাসিনার নির্দেশে ১৯৯৬ সালে সৈয়দ আশরাফ জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন। যদি তিনি বাংলাদেশে না আসতেন তাহলে এতদিনে বিলেতের সংসদের সদস্য থাকতেন। মন্ত্রীও হতে পারতেন। কেননা তাঁর সমসাময়িক অথবা রাজনৈতিক অধঃস্তন কেউ কেউ সে দেশে মন্ত্রীও হয়েছেন। তাই অনেকেই বলে থাকেন, সৈয়দ আশরাফ বিলিতি ঢঙে বাংলাদেশে রাজনীতি করতে চান। সৈয়দ আশরাফ মনে করেন, মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া থানা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদকের কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের কাছে কি কাজ থাকতে পারে? এটা কোনো রাজনৈতিক শৃংখলার মধ্যে পড়ে না। তাহলে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের কি কাজ? রাজবাড়ী জেলার পৌরসভার কাউন্সিলার কেন কারণে-অকারণে স্থানীয় সরকার মন্ত্রীর কাছে আসতে হয়। সৈয়দ আশরাফ অনেক কিছুই মানতে পারেননি। আবার অনেক কিছুই মানিয়ে নিতে পারেননি। বস্তুত বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর বাংলাদেশে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করা হয়েছে। এবং দম্ভভরে জিয়াউর রহমান সাহেব বলেছিলেন, ‘আমি রাজনীতিবিদদের জন্যে রাজনীতি কঠিন করে দেবো’ (ইংরেজিতে বলেছিলেন)। সৈয়দ আশরাফ নিশ্চয় এটা জানেন, আওয়ামী লীগ আমআদমীর দল। আওয়ামী লীগের তৃণমূলের নেতাকর্মীরা নৈতিকভাবে দারুণ শক্তিশালী। আর কেউ না জানুক সৈয়দ আশরাফ বেশ ভালই জানেন।
বঙ্গবন্ধু ১৯৭৪ সালের ১৮ জানুয়ারিতে আওয়ামী লীগের দ্বিবার্ষিক কাউন্সিলে উদ্বোধনী ভাষণ রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টদের জন্যে ভাবনা চিন্তার বিশেষ বিষয় হতে পারে। ‘আজ বাংলার নিভৃত কোণে আমার এক কর্মী পড়ে আছে, যার জামা নাই, কাপড় নাই। তারা আমার কাছে আসে না। কিন্তু আমি যদি চর কুকরীমুকরী যাই, আমার ঔ ধরনের কর্মীকে দেখি। এদের সাথে আমার রক্তের সম্বন্ধ। আজো আমি দেখি তার পরনে ছেঁড়া লুঙ্গি। আজো আমি দেখি, সেই ছেঁড়া পায়জামা, ছেঁড়া শার্ট, পায়ে জুতা নাই। বাংলাদেশে আমার এ ধরনের লক্ষ লক্ষ কর্মী পড়ে আছে। কিন্তু কিছু কিছু লোক যখন মধু-মক্ষিকার গন্ধ পায় তখন তারা এসে আওয়ামী লীগে ভিড় জমায়। আওয়ামী লীগের নামে লুটতরাজ করে- আওয়ামী লীগে থাকার তাদের অধিকার নাই।’ বঙ্গবন্ধু সেই অমোঘ উচ্চারণ আজও দারুণভাবে প্রাসঙ্গিক। তাই সৈয়দ আশরাফকে আরো অনেক সক্রিয় হতে হবে। সেই জন্যেই তো শেখ হাসিনা এক প্রকার জোর করেই সৈয়দ আশরাফকে বাংলাদেশে নিয়ে এসেছিলেন। সাথে থেকে লড়াই করবার জন্যেই। সৈয়দ আশরাফ চলে যেতে পারেন; কিন্তু কেন যাবেন?
সুভাষ সিংহ রায়: রাজনৈতিক বিশ্লেষক




Leave a Reply