বুধবার ৪ নভেম্বর ২০২৬

খুনীর টাকা খাওয়া ২ পুলিশ বরখাস্ত হলেও ওসি শুধুই প্রত্যাহার

Sylhet-Guilty-policeসিলেটে অামানষিকভাবে পিটিয়ে হত্যার পর খুনীদের সঙ্গে হাত মেলায় পুলিশ। আর কিছুই নয়, টাকার জন্য (তারা যা নিয়মিতই করে!)। টাকার বিনিময়ে শিশু রাজন হত্যার আসামি কামরুল ইসলামকে ছেড়ে দেয় এসআই আমিনুল ইসলাম। কামরুলকে বিদেশে পার করে দিতে বিমানবন্দর পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করে ওসি-তদন্ত আলমগীর। অথচ, তাকে শুধুই প্রত্যাহার করা হল।

হত্যাকাণ্ডের পর দুইদিন পুলিশ অপরাধীদের গ্রেপ্তারে কোন উদ্যোগ না নিয়ে চুপ করে থাকে। কামরুলের দেশত্যাগ ও লেনদেনের ঘটনা একসময় ফাঁস হয়ে যায়।

রাজন হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গাফিলতির অভিযোগে শুক্রবার সিলেট মহানগর পুলিশের জালালাবাদ থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আমিনুল ইসলাম ও জাকির হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। আর একই থানার পরিদর্শক পদমর্যাদার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি, তদন্ত) আলমগীর হোসেনকে প্রত্যাহার করা হয়েছে।

গত ৮ জুলাই শিশু সামিউলকে চোর সন্দেহে পিটিয়ে হত্যার পরপরই তার বাবা শেখ মো. আজিজুর রহমানের অভিযোগ পুলিশ গ্রহণ করেনি বলে অভিযোগ উঠে।

গত ১৪ জুলাই জালালাবাদ থানার এসআই আমিনুল ইসলামকে প্রত্যাহার করে মহানগর পুলিশের পদস্থ কর্মকর্তাদের নিয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির প্রধান ও মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার এসএ রোকনউদ্দিন বৃহস্পতিবার রাতে ৪২৪ পৃষ্ঠার তদন্ত প্রতিবেদন পুলিশ কমিশনারের কাছে জমা দেন। এতে পুলিশের গাফিলতির প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

এর পরিপ্রেক্ষিতে শুক্রবার পুলিশের এ তিন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন সিলেট মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার (গণমাধ্যম) মো. রহমত উল্লাহ।

জানা যায়, কামরুলকে ছেড়ে দিতে আমিনুলের সাথে ১২ লাখ টাকায় রফা হয়েছিল। সাথে সাথে ছয় লাখ টাকা দেওয়া হয় তাকে। বাকি টাকা সৌদি আরব পৌঁছে দেওয়ার কথা ছিল কামরুলের। এ কারণে তাকে মামলার প্রধান আসামি করেননি এসআই আমিনুল ইসলাম। প্রধান আসামি করা হয় মুহিত আলমকে। প্রথমে দুই জনকেই ধরে পুলিশে সোপর্দ করা হয়েছিল। কিন্তু টাকার বিনিময়ে কামরুলকে ছেড়ে দেওয়া হয়। পুলিশ বাদি হয়ে অজ্ঞাত হিসেবে মামলা দায়ের করে।

ভিডিওতে শিশু রাজন হত্যার সঙ্গে জড়িত লাঠি হাতে কালো টি-শার্ট পরা যার ছবি দেখা যায় তিনিই কামরুল। প্রাথমিক তথ্য বিবরণীতে পুলিশ বাদি হয়ে করা মামলার অভিযোগকারী জালালাবাদ থানার এসআই আমিনুল ইসলাম প্রধান আসামি করেন মুহিত আলমকে। যে পেশায় একজন মাইক্রোবাসের চালক এবং রাজনের লাশ তার গাড়িতে করে নদীতে ফেলে দেওয়ার দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিল।

সিলেট জেলা ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি শহীদুজ্জামান পাপলু বলেন, স্থানীয় জনগণ দুপুর ১২টায় রাজনের লাশ এবং মুহিত-কামরুলকে ধরে এসআই আমিনুলের কাছে হস্তান্তর করে। গাড়ির চালক মুহিত আলম সবকিছু তাদের খুলে বলে নাই এটা বিশ্বাস করি না। এমনকি মুহিত আলম রাজনকে চিনতো। ভালো করে চিনত তার বাবাকেও।

কিন্তু এসআই আমিনুল জনগণের সাহায্য পাওয়ার পরও রাজনের লাশ বেওয়ারীশ হিসেবে মর্গে পাঠিয়ে দেয়। পাপলু আরও জানান, রাজনের বাবা ছেলেকে সারাদিন খুঁজতে খুঁজতে রাত ১০টায় থানায় জিডি করতে গেলে খবর পান ছেলেকে হত্যা করা হয়েছে। কিন্তু পুলিশের কাছে মুহিত-কামরুল আটক থাকার পরও কামরুলকে ছেড়ে দেওয়া এবং বেওয়ারিশ হিসেবে রাজনকে মর্গে দেওয়া একটা বিষয়কেই ইঙ্গিত করে। তা হলো অনৈতিক লেনদেন।

রাজনের বাবা আজিজুর রহমান অভিযোগ করেন, জালালাবাদ থানা পুলিশ ১২ লাখ টাকার বিনিময়ে আমার ছেলে রাজনের হত্যাকাণ্ডটি ধামাচাপা দিতে চেয়েছিল। তিনি বলেন, রাজনকে হত্যার পর বুধবার রাত ১০টার দিকে জালালাবাদ থানায় মামলা করতে গিয়েছিলাম। কিন্তু পুলিশ মামলা নেয়নি। আমাকে থানা থেকে গলা ধাক্কা দিয়ে বের করে দেয় এসআই আমিনুল।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ৮ই জুলাই বুধবার সিলেট নগরীর কুমারগাঁওয়ে রাজনকে চুরির মিথ্যা অপবাদে খুঁটির সঙ্গে বেঁধে পৈশাচিক নির্যাতন চালানো হয়। একপর্যায়ে সামিউল আলম রাজন মারা গেলে তার লাশ গুম করার চেষ্টাকালে জনতার হাতে আটক হয় মুহিদ আলম।

ঘটনাস্থল থেকে লাশ উদ্ধার করেন জালালাবাদ থানার এসআই আমিনুল।

পৈশাচিক নির্যাতনে রাজনের মৃত্যুর বিষয়ে পুরোপুরি অবহিত থাকার পরও ঐদিন সন্ধ্যায় জালালাবাদ থানার ওসি (তদন্ত) আলমগীর হোসেন ও এসআই আমিনুলের সঙ্গে বৈঠক করে কামরুল ও মুহিত। চুক্তি হয় ১২ লাখ টাকার। ৬ লাখ টাকা হাতে পেয়ে জালালাবাদ থানার ওসি (তদন্ত) আলমগীর হোসেন ও এসআই আমিনুল মামলার প্রধান আসামি কামরুলকে সৌদি আরব পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেন।

বাকি ৬ লাখ টাকা হাতে পেলে জনতার হাতে আটকের পর গ্রেপ্তার হওয়া কামরুলের বড় ভাই মুহিত আলমকেও ছেড়ে দেবে বলে কথা দেয় পুলিশ।

১০ই জুলাই বিজি-৪০৪ যোগে সিলেট বিমানবন্দর ছাড়ে কামরুল।

নিরাপদ প্রস্থান নিশ্চিতের দায়িত্ব পালন করেন ওসি (তদন্ত) আলমগীর হোসেন। হত্যাকাণ্ডের পর দুইদিন পুলিশ অপরাধীদের গ্রেপ্তারে কোন উদ্যোগ না নিয়ে চুপ করে থাকে। কামরুলের দেশত্যাগ ও লেনদেনের ঘটনা একসময় ফাঁস হয়ে যায়। ১১ই জুলাই এলাকাবাসী ঘেরাও করে জালালাবাদ থানা। টনক নড়ে মেট্রোপলিটন পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তাব্যক্তিদের।

নিহত রাজনের বাবা আজিজুর রহমান জানান, ৮ জুলাই রাত সাড়ে ৯টার দিকে এসআই আমিনুল রাজনের লাশের ছবি দেখায় তার মোবাইলফোনে।

এরপর হাসপাতাল মর্গে গিয়ে লাশ শনাক্ত করে থানায় যাই মামলা করতে। তিনি জানান, ‘ততক্ষণে এসআই আমিরুল অজ্ঞাতদের নামে আগেই মামলা করে বসে আছেন। আমি আসামিদের নাম ধরে মামলা করতে চাইলে এক পর্যায়ে এসআই আমিনুল আমাকে গলা ধাক্কা দিয়ে থানা থেকে বের করে দেয়।’

তিনি অভিযোগ করেন, ‘পুলিশ অপরাধীদের গ্রেপ্তারে কোন উদ্যোগ নেয়নি। চারদিন পর পত্রিকায় খবর বের হলে পুলিশ তৎপর হয়। পুলিশ কোন আসামিকে ধরেনি। মুহিত আলমকে পাবলিক ধরেছে।’

সংবাদদাতা
নিউজওয়ার্ল্ডবিডি ডট কম।

আরও পড়ুন