বুধবার ৪ নভেম্বর ২০২৬

হিন্দুপাড়ায় এখনো আতঙ্ক

CTG_Kundeshary_একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের যে কয়টি অভিযোগে সালাউদ্দিন কাদেরের মৃত্যুদণ্ড হয়েছে তার মধ্যে অন্যতম কুণ্ডেশ্বরী ও জগৎমল্ল পাড়ায় হত্যাকাণ্ড। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়েও কাদের চৌধুরী পরিবারের দাপটে সব সময় ভয়ে থাকতেন একাত্তরে স্বজন হারানো বা নির্যাতিত সংখ্যালঘু হিন্দু পরিবারের লোকজন। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরও রাউজান-রাঙ্গুনিয়া এলাকা থেকে কয়েক দফায় সাংসদ নির্বাচিত হন সালাউদ্দিন ও তার ছোটভাই গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী।

একাত্তরে চট্টগ্রামের রাউজানের যেসব হিন্দুপাড়ায় হত্যা ও গণহত্যার জন্য সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর সর্বোচ্চ শাস্তি হল, সেই এলাকাগুলোতে এখনও রয়েছে আতঙ্ক।

বুধবার ২৯ জুলাই সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে সালাউদ্দিন কাদেরের মৃত্যুদণ্ড বহালের আদেশ আসার পর রাউজানের কুণ্ডেশ্বরী ও জগৎমল্লা পাড়ায় গিয়ে অধিকাংশ ঘর-বাড়ি ভিতর থেকে দরজাবন্ধ পাওয়া যায়। বাইরে থেকে কড়া নেড়েও সাড়া পাওয়া যায়নি।

গণমাধ্যম কর্মীদের সঙ্গে কথা বলতে আগ্রহী নন কেউই। দুয়েকজন কথা বললেও পরিচয় প্রকাশে অনাগ্রহী। তাদের চোখে-মুখে এখনও আতঙ্কের ছাপ।

রায়ের পর রাউজান সদরে আওয়ামী লীগের পক্ষে আনন্দ মিছিল আর মিষ্টি বিতরণ করা হয়। তবে এ আনন্দ মিছিলে দলীয় নেতাকর্মী ছাড়া সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ ছিল খুবই কম। এমনকি সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দেওয়া ব্যক্তিদেরও দেখা যায়নি।

একাত্তরে চট্টগ্রামে ত্রাস সৃষ্টিকারী সালাউদ্দিন কাদেরের বাড়ি রাউজান উপজেলার গহিরায়। শুধু সালাউদ্দিন নন, তার বাবা মুসলিম লীগ নেতা ফজলুল কাদের চৌধুরীসহ পরিবারের অন্যান্য সদস্যরাও প্রত্যক্ষভাবে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতায় ছিলেন।

১৯৭১ সালের ৩ এপ্রিল কুণ্ডেশ্বরী ঔষধালয়ের মালিক নূতন চন্দ্রকে বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে হত্যা করা হয়।

সকালে ঢাকায় রায় ঘোষণার পর কুণ্ডেশ্বরী ঔষধালয় ভবনের সামনে গেলে দেখা যায় ভেতর থেকে দরজা বন্ধ। বাইরে সড়কে লোকজনের চলাচলও তেমন নেই। মূল ফটকে দারোয়ান দায়িত্ব পালন করছে। ভেতরে পুলিশ সদস্যরা পাহারায় আছেন।

প্রায় আধ ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকেও ভেতরে ঢোকা যায়নি। দারোয়ানের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “গেট খোলা মানা।”

বেলা ১১টার দিকে কুণ্ডেশ্বরী স্কুলে ছুটি দিয়ে দেওয়া হয়। ছুটির পর শিক্ষার্থীরা দল বেঁধে স্কুল থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিলেন।

এসময় শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করলে তারা এই প্রতিবেদককে এড়িয়ে যান।

এলাকার অজয় মল্লিক নামের একজন বলেন, “এ রায় রাউজানবাসীর জন্য বিরাট সুখবর। এর চেয়ে বড় সুখবর আর হতে পারে না। ফাঁসির রায় কার্যকরের মাধ্যমে রাউজানবাসী কুলাঙ্গার মুক্ত হবে।”

১৯৭১ সালের ১৩ এপ্রিল জগৎমল্ল পাড়ায় ৩২ জন এবং ৫ মে ৩ জনকে হত্যা করে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী। পথ দেখিয়ে তাদের ওই গ্রামে নিয়ে গিয়েছিলেন সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী।

বেশ কয়েকবছর ধরে পরিস্থিতির পরিবর্তন হলেও এখনও সেখানকার সংখ্যালঘু পরিবারের সদস্যদের মাঝ থেকে আতঙ্কের ছাপ মুছে যায়নি।

সকালে জগৎমল্ল পাড়ায় গিয়ে দেখা যায়, পাড়ার সব ঘরের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। কয়েকটি ঘরে বাইরে থেকে তালা দেওয়া।

এর আগে ২০১৩ সালের ১ অক্টোবর ট্রাইব্যুনালে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ফাঁসির রায় ঘোষণার পরও জগৎমল্ল পাড়ার অবস্থা ছিল প্রায় একই রকম।

রাউজান থানার ওসি প্রদীপ কুমার দাশ ও পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে বুধবার বেলা ১২টার দিকে আবারও জগৎমল্ল পাড়ায় যান কয়েকজন গণমাধ্যমকর্মী।

এসময় ট্রাইব্যুনালের সাক্ষী জগৎমল্ল পাড়ার বাসিন্দা আশীষ চৌধুরীর সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করেন ওসি।

এরপর আশীষ চৌধুরীর ঘরের দরজার একাংশ খুলে ভেতর থেকে কথা বলেন তার স্ত্রী মেরী চৌধুরী।

তিনি বলেন, “মুক্তিযুদ্ধের সময় আমার শ্বশুর (প্রেমাংশু চৌধুরী) ও ভাসুরকে (অনতু চৌধুরী) মেরে ফেলা হয়। আমরা সব সময় আতঙ্কে থাকি।”

পুলিশের উপস্থিতিতে বারবার অনুরোধের পরও টেলিভিশন ক্যামেরার সামনে কোনো কথা বলতে রাজি হননি পরিবারটির কোনো সদস্য।

ওসি প্রদীপ কুমার বলেন, “এক সময় রাউজানের যে পরিবেশ ছিল এখন তা নেই। তারা কেন ভয় পাচ্ছেন সেটা বুঝতে পারছি না। আজকে রাউজানের পরিস্থিতি স্বাভাবিক আছে। কোনো ধরনের সমস্যা নেই। পুলিশের সঙ্গে র‌্যাবও বিভিন্ন এলাকায় টহল দিচ্ছে।

সংবাদদাতা
নিউজওয়ার্ল্ডবিডি ডট কম।

আরও পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *