ঔপোনিবেশিক শাসনের ইতি ঘটলেও সীমান্ত বিভাজনের অদ্ভুত পদ্ধতি থেকে ৬৮ বছর পর অবশেষে মুক্ত হল তিন প্রজন্মের মানুষ। ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ১৬২টি ছিটমহল শুক্রবার মধ্যরাত থেকে নিজেদের মধ্যে বিনিময় হয়েছে।
শনিবার সকাল থেকে বাংলাদেশের ভেতরে আসা ১১১টি ছিটমহল এবং ভারতের মূল ভূখণ্ডে যুক্ত হওয়া ৫৫টি বাংলাদেশি ছিটমহলে উড়বে ভারতীয় পতাকা।
এদিকে ছিটমহল বিনিময় নিয়ে শুক্রবার গেজেট প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ সরকার। যদিও প্রকৃত অর্থে গত ৬ জুন ছিটমহল বিনিময় হয়ে গেছে। শুক্রবার মধ্যরাত বা পয়লা আগস্ট একটি প্রতীকী দিন।
এদিকে ছিটমহল বিনিময়কে সামনে রেখে শুক্রবার দুপুর থেকেই ছিটমহলগুলোতে চলছে উৎসব; যা শেষ হয় শুক্রবার মধ্যরাতের অনেক পর। ১৬২টি ছিটমহলের ৫৬টিতে অবশ্য মানুষ বাস করে না।
দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত এই সমস্যার অবসানের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের মানচিত্র পূর্ণতা পাওয়ার পথে এগিয়ে যাবে আরও এক ধাপ। মুক্ত জীবনের প্রত্যাশায় উন্মুখ হয়ে থাকা ছিটমহলগুলোতে চলে সেই উৎসব। শুক্রবার মধ্যরাতের পর বাংলাদেশে ছিটমহল শব্দটি ঠাঁই নিল ইতিহাসের পাতায়।
সীমান্তে আর কোনো জনপদকে ‘ছিটমহল’ হিসেবে পরিচিত হতে হবে না। বাসিন্দারা পাবেন নাগরিক সুযোগ সুবিধা, দেশের আর সবার মতো স্বাভাবিক জীবনে ফিরবেন তারা। গত ১৬ জুন দুই দেশের জয়েন্ট বাউন্ডারি ওয়ার্কিং গ্রুপের বৈঠকে ঠিক করা ছিটমহল বিনিময়ের কর্মকৌশল অনুযায়ী ৬ থেকে ১৬ জুলাই যৌথ সমীক্ষ চালানো হয়। সে সময় ছিটমহলগুলোর জনগণনার পাশাপাশি কে কোন দেশে থাকতে চান তা জানতে চাওয়া হয়।
ভারতে সবগুলো ছিটমহলের অবস্থান পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহার জেলায়। আর বাংলাদেশে ছিটমহলগুলো পঞ্চগড়, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম ও নীলফামারী জেলায়।
ভারতে বাংলাদেশের হাইকমিশনার সৈয়দ মোয়াজ্জেম আলী এই প্রসঙ্গে বলেছেন, এর মধ্যে দিয়ে সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করা সম্ভব হল। ভারতীয় হাই কমিশনার পঙ্কজ শরণ একে উল্লেখ করেন ‘এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত’ হিসেবে।
আটষট্টি বছর ধরে এক দেশের সীমান্তের ভেতরে অন্য দেশের ‘বিচ্ছিন্ন দ্বীপ’ হয়ে থাকা ১৬২টি ছিটমহলের বাড়িতে বাড়িতে শুক্রবার মধ্যরাতে জ্বলে উঠে ৬৮টি করে প্রদীপ; বদলেস গেছে পতাকা, পরিচয়; অবসান ঘটবে ৫০ হাজার মানুষের দীর্ঘ প্রতীক্ষর। যদিও বাংলাদেশের ভেতর ভারতীয় ছিটমহলের প্রায় ৪০ হাজার মানুষ বাংলাদেশি পরিচয় গ্রহণ করলেও ৯৭৯ জন যাচ্ছেন ভারতে। তারা আগামী ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত তাদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ বিক্রি বা সঙ্গে করে নিয়ে যেতে সময় পাচ্ছেন।
ভারত ও বাংলাদেশের স্থলসীমান্ত চুক্তি অনুযায়ী, শুক্রবার রাত ১২টা ১ মিনিটে ক্যালেন্ডারের তারিখ ১ অগাস্টে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে কার্যকর হয় ছিটমহল বিনিময়। এর ফলে বাংলাদেশের ভেতরে থাকা ১৭ হাজার ১৬০ দশমিক ৬৩ একর আয়তনের ভারতের ১১১টি ছিটমহল হবে বাংলাদেশের ভূখণ্ডের অংশ। অন্যদিকে ভারতের মধ্যে থাকা ৭ হাজার ১১০ দশমিক ০২ একর আয়তনের বাংলাদেশের ৫১টি ছিটমহল ভারতের মানচিত্রে মিলে যাচ্ছে। বাংলাদেশ-ভারত স্থল সীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়নে দুই দেশের হাইকমিশনাররা বৃহস্পতিবার তেজগাঁওয়ে ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরে এক অনুষ্ঠানে ৩০টি গুচ্ছ মানচিত্রে (স্ট্রিপ) সই করেন। এর মাধ্যমে কেবল মুহুরির চরের দুই কিলোমিটার এলাকা ছাড়া দুই দেশের মধ্যে ১ হাজার ১৪৪টি মানচিত্রে সই হল। ২০১৬ সালের ৩০ জুনের মধ্যে নতুন করে চিহ্নিত এসব সীমান্তে সীমানা পিলার বসানোর কথা রয়েছে।
১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসনের অবসানে দেশ ভাগের সময় সিরিল রেডক্লিফ কমিশন তাদের কাজ সঠিকভাবে না করার কারণেই সীমান্তে ছিটমহল জটিলতার শুরু। উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া এই সমস্যার অবসানে ১৯৭৪ সালে মুজিব-ইন্দিরা চুক্তি হয়। এরপর তা কার্যকরে প্রটোকল সই হয় ২০১১ সালে। গত ৭ মে ভারতের সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে ওই চুক্তি বাস্তবায়নের পথ তৈরি হলে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ঢাকা সফরে অনুসমর্থনের দলিল হস্তান্তর হয়।
নিজ নিজ দেশের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে এসব ছিটমহলের সরাসরি কোনো যোগাযোগ না থাকায় রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব ছিল না। আরেক দেশের সীমানার ভেতরে হওয়ায় হাসপাতাল, বিদ্যুৎ, স্কুল-কলেজ বা বিচার-প্রশাসনও ছিল না সেখানে। ফলে ছিটের বাসিন্দাদের ইচ্ছা থাকলেও ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া করানোর সুযোগ ছিল সীমিত। অনেকেই বাংলাদেশি বা ভারতীয় ঠিকানা ব্যবহার করে লেখাপড়া করলেও ছিটমহলের বাসিন্দা হওয়ায় চাকরির সুযোগ তাদের এতোদিন হয়নি।
ছিটমহল বিনিময়ের গেজেট:
দুই দেশের ছিটমহল বিনিময় নিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে বাংলাদেশের ভূমি মন্ত্রণালয়। ওই প্রজ্ঞাপনে বাংলাদেশ এবং ভারত দুই দেশের মোট কয়টি ছিটমহল, ছিটমহলগুলোর আয়তন পৃথক পৃথকভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে ১৯৭৪ সালের স্থলসীমান্ত চুক্তি ও ২০১১ সালের প্রটোকল অনুসমর্থনের দলিল বিনিময়ের ফলে বাংলাদেশের ৫১টি ছিটমহল (ভারতে থাকা) পাচ্ছে ভারত এবং ভারতের ১১১টি ছিটমহল (বাংলাদেশের মধ্যে থাকা) পাচ্ছে বাংলাদেশ। এতে বাংলাদেশ পাচ্ছে প্রায় ১০ হাজার একর জমি। আর ভারত পাচ্ছে ৭ হাজার একর জমি।
ছিটমহল বিনিময়ের নথিতে যা আছে:
ছিটমহল বিনিময়ের নথিতে বলা হয়েছে, ‘ভারত এবং বাংলাদেশ এই মর্মে সম্মত হয়েছে যে, বাংলাদেশের মধ্যে ভারতের যে ছিটমহল রয়েছে এবং বাংলাদেশের যে ছিটমহল ভারতের মধ্যে রয়েছে তা ১৯৭৪ সালের চুক্তি এবং ২০১১ সালের প্রটোকল অনুযায়ী বিনিময় হবে, যা ২০১৫ সালের ৩১ জুলাই থেকে কার্যকর হবে। ছিটমহলবাসীদের জাতীয়তা এবং নাগরিকত্ব ১৯৭৪ সালের চুক্তি এবং ২০১১ সালের প্রটোকল অনুযায়ী নির্ধারিত হবে। ছিটমহল এলাকায় বসবাসরতরা তাদের পছন্দ অনুযায়ী নাগরিকত্ব লাভের অধিকার পাবেন। নাগরিকত্ব লাভের এই অধিকার তারাই পাবেন যাদের নাম ২০১১ সালের জুলাই মাসে দুই দেশের যৌথভাবে করা গণনাতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। পাশাপাশি ২০১১ সালের শুমারিতে অন্তর্ভুক্তদের পরবর্তী সময়ে প্রসব করা সন্তানরাও এ অধিকার পাবেন। নিরাপদে এবং সহজে ছিটমহলবাসীদের স্থানান্তর এবং তাদের সম্পদের স্থানান্তরেরের বিষয়টি বাংলাদেশ ও ভারত সরকার নিশ্চিত করবে।’
নথিতে আরও বলা হয়েছে, ‘ছিটমহল থেকে যে সকল অধিবাসী বাংলাদেশ বা ভারতের মূল ভূখণ্ডে বসবাস করতে চান তাদের এই বসবাসের ব্যবস্থা সমঝোতা অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্র ব্যবস্থা করবে, যা ২০১৫ সালের ৩০ নভেম্বরের মধ্যে করতে হবে। এ ক্ষেত্রে হলদিবাড়ি, বুড়িবাড়ি এবং বাঙলাবান্ধা এই সীমান্ত দিয়ে এ প্রক্রিয়া কার্যকর হবে। যে কোনো ধরনের সমস্যা ২০১১ সালের প্রটোকল অনুযায়ী সমাধান করা হবে। সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে দুই দেশের মানচিত্রও ২০১১ সালের প্রটোকল অনুযায়ী সংশোধন করা হবে। মানচিত্রে সীমানা নির্ধারণের কাজ দুই দেশের সরকারি জরিপ বিভাগ ২০১৬ সালের ৩০ জুনের মধ্যে শেষ করবে।’
ছিটবাসীদের সম্পদ স্থানান্তর সম্পর্কে নথিতে বলা হয়েছে, ‘ছিটমহলবাসীরা ভারত বা বাংলাদেশের মূল ভূখণ্ডে স্থায়ী সম্পদ হস্তান্তর করতে চাইলে ২০১৫ সালের ৩১ জুলাইয়ের আগেই সংশ্লিষ্ট জেলা প্রসাশককে প্রয়োজনীয় নথিপত্র দিতে হবে। সংশ্লিষ্ট দেশের সরকার নিরাপদে স্থায়ী সম্পদ হস্তারন্তর বা বিক্রির ব্যবস্থা করবে। দুই দেশের যৌথ সীমান্ত ওয়ার্কিং গ্রুপ এই স্থানান্তর প্রক্রিয়ার সবকিছু চ’ড়ান্ত করবে। ২০২০ সাল পর্যন্ত ছিটমহলবাসীদের স্থানান্তর বা এ সংক্রান্ত কোনো সমস্যা হলে তা দুই দেশের যৌথ সীমান্ত ওয়ার্কিং গ্রুপ সমাধান করবে।’
নিজস্ব প্রতিবেদক
নিউজওয়ার্ল্ডবিডি ডট কম।


