হঠাৎ করেই ডেঙ্গুর প্রকোপ বেড়েছে। গত দুই মাসেই ঢাকা শহরে বিভিন্ন হাসপাতালে ১৪৮ ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী ভর্তি হয়েছেন। প্রতিদিন গড়ে তিনজন করে রোগী ভর্তি হচ্ছেন। এদের মধ্যে সুস্থ হয়ে ছাড়পত্র নিয়ে ১২৭ জন বাসায় ফিরেছেন। বাকিরা চিকিৎসাধীন রয়েছেন। স্থাস্থ্য অধিদপ্তরের ন্যাশনাল ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম প্রাপ্ত সূত্রে এই তথ্য জানা গেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জুন-জুলাই-আগস্ট মাসে ডেঙ্গুর মশার উপদ্রব বাড়ে। থেমে থেমে বৃষ্টির কারণে বিভিন্ন স্থানে পানি জমে থাকে। জমে থাকা বৃষ্টির পানি থাকলে মশার প্রজনন বাড়ে। তাই বাড়ি বা বাড়ির আঙ্গিনার কোথাও যেন পরিষ্কার পানি জমে না থাকে সে ব্যাপারে সতর্ক দৃষ্টি রাখার পরামর্শ দেন তারা।
ঢাকার অভিজাত এলাকা ধানমন্ডি, কলাবাগান, গুলশান, বনানী, রমনা ও ইস্কাটন এলাকার বাসিন্দারাই ডেঙ্গু জ্বরে বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন। এসব এলাকার বাসিন্দাদের সঙ্গে আলাপকালে জানা গেছে, গত কয়েকদিন থেমে থেমে বৃষ্টি হওয়ায় হঠাৎ করেই মশার প্রকোপ মারাত্মক আকারে বেড়ে গেছে। সন্ধ্যা নামতে না নামতেই ঝাঁকে ঝাঁকে মশা ঘরবাড়িতে ঢুকে পড়ছে। তারা অভিযোগ করেন, মশার উপদ্রব বাড়লেও উত্তর বা দক্ষিণ কোন সিটি কর্পোরেশনে মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম তেমন চোখে পড়ছে না। প্রতি বছর ডেঙ্গু মওসুম শুরুর আগে ডিসিসি’র পক্ষ থেকে নাগরিক কমিটির মাধ্যমে জনসচেতনতা কার্যক্রম শুরু করে। এবার অনেক পরে এ বিষয়ে মানুষকে সচেতন করে ডিসিসি পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়েছে।
মহাখালী রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) পরিচালক অধ্যাপক ডা. মাহমুদুর রহমান বলেন, এবছর এই মুহূর্তে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা নিয়ে এখনও উদ্বেগ হওয়ার মতো নয়। কারণ গত বছরের তুলনায় সংখ্যা কম রয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ন্যাশনাল ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম সূত্র জানা গেছে, গত ১ জুন থেকে ২৯ জুলাই পর্যন্ত সময়ে রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে মোট ১৪৮ জন ডেঙ্গু জ্বরে আাক্রান্ত রোগী ভর্তি হয়েছেন। তাদের মধ্যে জুন মাসে ১৫ জন ও জুলাই মাসে ১৩৩ জন ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন। ১২৭ জন সুস্থ হয়ে ছাড়পত্র নিয়ে বাড়ি চলে গেছেন। হাসপাতালে আছেন ২১ জন।
এখন বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তিকৃত মোট ২১ জন ডেঙ্গু জ্বরের রোগীর মধ্যে হলিফ্যামিলি হাসপাতালে চারজন, ইব্নে সিনায় ৮ জন, স্কয়ারে একজন, ইউনাইটেডে দুইজন, খিদমাহ্তে তিনজন ও অ্যাপোলো হাসপাতালে ৩ জন ভর্তি রয়েছেন।
অন্যদিকে, রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের পরিসংখ্যান মতে, চলতি বছরের গত ২৬শে জুলাই পর্যন্ত ৮৯ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন বিভিন্ন হাসপাতালে।
এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ন্যাশনাল ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের ইনচার্জ ডা. আয়েশা আক্তার জানান, সাধারণত জুন, জুলাই ও আগস্ট মাসে ডেঙ্গু মশার উপদ্রব বেড়ে যায়। তবে, জুলাই মাসে বেশি থাকে। কারণ এই সময়ে বর্ষার পানি জমে। পানি তিনদিন একই স্থানে স্থির থাকলে সেখানে এডিস মশা ডিম পাড়ে। তিনি জানান, আগের বছরগুলোর তুলনায় গত বছরে এবং এবছর ডেঙ্গু জ্বরের রোগীর সংখ্যা কম এবং কেউ মারাও যাননি।
স্থাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০১৪ সালে ভর্তি হয়েছেন ৩৭৩ জন। কেউ মারে যাননি। ২০১৩ সালে ১৪৭৮ জন, ২০১২ সালে ১২৮৬ জন ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত রোগী ভর্তি হয়েছেন। ২০১১ সালে ১৩৬২ জন, ২০১০ সালে ৪০৯ জন। এই সালে ছয়জন রোগীর মৃত্যু হয়েছে। ২০০৯ সালে ৪৭৪ জন, ২০০৮ সালে ১১৫৩ জন ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত রোগী হাসপাতলে আসেন।
ডেঙ্গু জ্বরের উৎস ও কারণ: চিকিৎসকরা জানান, ডেঙ্গু জ্বর একটি মশাবাহী রোগ। এই রোগের উৎস এডিস মশা। বছরের একটি নির্দিস্ট সময়ে প্রধানত বর্ষার শুরুতে কিংবা শেষের দিকে এই রোগের প্রাদুর্ভাব বেশি ঘটে। এডিস ইজিপটাই ও এলবোপিকটাস নামক দুই প্রতাজির স্ত্রী মশা ডেঙ্গু জ্বরের বাহক। ডেঙ্গ ভাইরাসবাহী মশাটি যে সুস্থ মানুষকে কামড়াবে তার শরীরে ডেঙ্গু ভাইরাস সংক্রমিত হবে এবং ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হবেন তিনি।
ডেঙ্গু জ্বরের উপসর্গ: ডেঙ্গু জ্বর সাধারণত দুই প্রকার ক্ল্যাসিকাল ও হেমোরেজিক। ডেঙ্গু ভাইরাস চার প্রকার ডিইএন এক থেকে চার পর্যন্ত। এর যে কোন একটির দ্বারা আক্রান্ত হলেই ডেঙ্গু জ্বর হতে পারে। এই রোগীর বমিভাব, মাথাব্যথা, কাশি, শরীরের বিভিন্ন জয়েন্টে ব্যথা, কোমর ব্যথা করবে। জ্বর সব সময়েই ১০৪ থেকে ১০৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট এর উপরে থাকবে। শরীরের বিভিন্ন স্থলে লাল লাল চাকার মতো দেখা দিতে পারে। শরীরের এলার্জির প্রভাব লক্ষ্য করা যাবে বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন। এছাড়া নাক, দাঁতের মাড়ি দিয়ে রক্তক্ষরণ হতে পারে। বমি হতে পারে এবং তাতে রক্ত দেখা দিতে পারে। অনেক সময়ে পায়খানার সঙ্গে কালো রক্ত যেতে পারে।
চিকিৎসকরা জানান, বাংলাদেশ ১৯৬৪ সালে সর্বপ্রথম ডেঙ্গু রোগ ধরা পড়লেও ২০০০ সাল থেকেই এই রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। পচাগলা, আবদ্ধ পানি থেকে এই রোগের বাহক মশার উৎপত্তি।



Leave a Reply