বুধবার ৪ নভেম্বর ২০২৬

প্রবাসে বাঙালির বিচিত্র মানসিকতা ও আমরা

ফারুক নওয়াজ, প্যারিস থেকে।

বাঙ্গালি ঐতিহ্যগতভাবেই একসঙ্গে সহাবস্থান করতে পারেনা- এটি চিরন্তন সত্য! আবার এটিও সত্য যে কোনও ধরনের জাতীয় সমস্যা বা দুর্যোগে এ বাঙ্গালিরাই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করার মানসিকতা রাখে। এ রকম হাজারো লড়াইয়ে বাঙ্গালিরা পরাজিত হয়েছে এমন কথা খুব কম শোনা যায়। মোঙ্গল আধিপত্যবাদীদের সেনানায়ক মানসিংহকে বাঙ্গালিরাই পরাজিত করছিলো। বাঙ্গালিদের ইতিহাস ঘাটলে এ রকম হাজারো বিজয়গাথা পাওয়া যাবে।

ঐক্যবদ্ধ থাকলে যে কোন দুর্যোগ বা চক্রান্তকে মোকাবেলা করা খুব একটা কঠিন কাজ না। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য আমরা বাঙ্গালিরা সচেতনভাবেই এ শব্দটিকে এড়িয়ে চলার চেষ্টা করি। অতিসম্প্রতি প্যারিসে দেশের একটি সুপরিচিত উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের তথাকথিত সাবেক ছাত্রদের সংগঠন সৃষ্টি এবং তার বিভক্তি থেকেই আজকের এ নিবন্ধের অবতারণা।

ফেসবুকের কল্যাণে আজকাল কোনও ঘটনা জানার জন্য শব্দতরঙ্গ বা ছাপার কাগজের অপেক্ষা করতে হয়না। সে রকম একটি সংবাদ জানা গেলো প্যারিসের এক বাঙ্গালি ব্যবসায়ীর প্রতিষ্ঠানে গুটিকয় সাবেক ছাত্র একত্রিত হয়ে একটি সংগঠনের জন্ম দিয়েছেন। একটি ছবি ও দেয়া হলো সেখানে। ছবিতে সা্তজনকে দেখা যাচ্ছে। এর মাঝে আবার দুইজন সে সংগঠনের উপদেষ্টা গোছের কোন পদে আছেন। সে হিসেবে মাত্র পাঁচজন সাবেক ছাত্রকে নিয়ে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংগঠন আত্মপ্রকাশ করাটা কতোটা যৌক্তিক তা বিবেচনার মতো জ্ঞান আমার নেই।

প্যারিসে আজ প্রায় চল্লিশ বছর ধরে বাঙ্গালিরা স্থায়ীভাবে বাস করছেন। এর আগে যারাই এসেছেন তারা খুব অল্প সংখ্যক স্থায়ী হয়েছিলেন। আমাদের জানামতে মাইকেল মধুসূদন দত্ত থেকে শুরু করে হাল অবধি ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ প্যারিসে এসেছিলেন তবে উনারা কউ স্থায়ী হননি। ব্যতিক্রম হিসেবে লালসালু খ্যাত কথাসাহিত্যিক সৈয়দ ওয়ালীউল্লা সাহেবের নাম বলা যায়। উনি ফ্রান্সে স্থায়ী হয়েছিলেন বৈবাহিক সুত্রে এবং এ ফ্রান্সেই মৃত্যবরন করেছিলেন। এরপর অতিসম্প্রতি নভেরা আহমেদ এর কথা ও বলা যেতে পারে। কিন্তু উনারাে কেউ প্রত্যক্ষভাবে বাঙ্গালিদের সংস্পর্শে আসেননি।

চল্লিশ বছর ধরে প্যারিসে যে সব বাংলাদেশিরা এসেছেন তাদের অধিকাংশই শুধু শিক্ষিত না উচ্চশিক্ষিত বলতে হবে। আজ ফ্রান্সে অবস্থানরত বাংলাদেশির সংখ্যা কম করে হাজার ত্রিশেক হবে বলে ধারণা করি। যদিও ফরাসী স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ সংখ্যাটিকে পনেরো হাজারের ঘরে বলে মনে করেন। বৈধতার হিসেবে এটিকে ও মানতে হবে। প্রশ্ন থাকে যদি পনেরো হাজার বৈধ বাঙ্গালিই থাকে এর মাঝে কি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া ছাত্র মাত্র পাঁচজন মতান্তরে সাতজন !

পাঁচজনের তথাকথিত সংগঠনের আত্মপ্রকাশের পাঁচদিনের মধ্যে একই বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনগুণ বেশী সাবেক ছাত্র নিয়ে আরেকটি সংগঠন আত্মপ্রকাশ করলো। তবে এবারের আত্মপ্রকাশের প্রক্রিয়াটা গণতান্ত্রিক বলা যায়। উনারা ঘোষণা দিয়ে ছাত্রদের বৈঠকে আসার আহবান জানিয়েছেন। যে বা যারা উপস্থিত ছিলেন তাদের মতামত নিয়ে একটি আহবায়ক কমিটি গঠন করেছেন। সে কমিটি সাবেক ছাত্রদের তথ্য সংগ্রহ করে একটি পুর্ণাঙ্গ কমিটি করবেন বলে প্রতিশ্রুতি ও দিয়েছেন বলে প্রকাশিত সংবাদে জানা যায়।

দ্বিতীয় সংগঠনটি অপেক্ষকৃত অধিক গণতান্ত্রিক। প্রথম সংগঠনটির পাচজনের মধ্যে তিনজনকেই শীর্ষ তিন পদের দায়িত্বে রাখা হয়েছে। যারা কোন সংগঠন করার বিষয়ে অগ্রণী ভূমিকা নেন অবশ্যই তাদের মূল্যায়ন করা হবে। কিন্তু এর মানে এ নয় যে তাদের চেয়ে অধিকতর যোগ্য কাউকে পাওয়া গেলে দেরীতে নাম অন্তর্ভূক্তির কারণে তাকে নেতৃস্থানীয় কোনও পদে রাখা যাবে না। পাঁচজনের সংগঠনে উপস্থিত একজন সেদিন কথা প্রসঙ্গে জানালেন তারাও একটি আহবায়ক কমিটি গঠনের চেষ্টা করেছিলেন কিন্তু সেখানে উপস্থিত একজন অতিউৎসাহী এবং পদলোভী ব্যক্তি সংগঠনের নেতৃত্বে নিজের অবস্থান ধরে রাখার জন্য তড়িঘড়ি পুর্ণাঙ্গ কমিটি করতে চাপ দেন। এর ফলশ্রুতিতেই এ বিতর্কের সৃষ্টি।

প্রশ্ন থাকে যে বা যারা শুধুমাত্র পদের জন্য এ রকম সংগঠনের জন্ম দিয়ে থাকেন তাদের কি বলা যাবে ?

নিজেদের অস্তিত্ব জানান দেয়ার জন্য এরা সমাজের অনেক নিরীহ ভদ্রলোককেও আজ বিতর্কিত করছেন। পদ নয় নিজের যোগ্যতা দিয়ে সমাজের কাজ করুন এক সময় না এ সময় অবশ্যই আপনাদের মুল্যায়ন করা হবে। শুধুমাত্র সংগঠন করলে হবে না সেটা টিকিয়ে রাখার পাশাপাশি সকলে ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে যাওয়ার মানসিকতা পোষণ করতে হবে।

ফ্রান্স প্রবাসী চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র / ছাত্রীদের একটি ঐক্যবদ্ধ ও প্রগতিশীল সংগঠন দেখতে চাই।

ফারুক নওয়াজ: ফ্রান্স প্রবাসী সাংবাদিক, নিউজওয়ার্ল্ডবিডি ডট কমের ইউরোপ ব্যুরো চিফ।

আরও পড়ুন