মাঝে কয়েকবছর বন্ধ থাকার পর বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিনের পরিবার নিয়ে আবারো বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে। জাতির সাত শ্রেষ্ঠ সন্তানের একজনের এই রুহুল আমিনের ছোট ছেলে ভিখারী ও দিনমজুর বলে প্রচারণা চালানো হচ্ছে। যদিও তিনি কিছুটা মানসিক রোগে আক্রান্ত; ফলে তার অপরিচ্ছন্ন থাকা ও অস্বাভাবিক অবস্থার ছবিকে প্রচারণায় ব্যবহার করা হচ্ছে।
২০০৯ সালে দৈনিক প্রথম আলোতে প্রকাশিত এক সংবাদ, এবং ২০১৪ সালের মাঝামাঝিতে বাংলানিউজ২৪ ডট কমে প্রকাশিত এক সংবাদের সূত্র ধরে বলা হচ্ছে, ভিখারীর মতো মানবেতর জীবন যাপন করছেন জাতির এই শ্রেষ্ঠ সন্তানের কনিষ্ঠ পুত্র, শওকত আলী পাটোয়ারী। চায়ের দোকানের পানি টেনে, কখনোবা করাত কলে কাজ করে দিনাতিপাত করছেন তিনি। এছাড়া এলাকাবাসীর সহায়তায় বেঁচে আছে তার পরিবারের সদস্যরা- এমনই বলা হয় সংবাদ মাধ্যমগুলোতে। বিভিন্ন অনলাইনে এসব নিউজ প্রকাশ করা হচ্ছে। যদিও প্রথম আলো তাদের অনলাইন থেকে অনেক আগেই ওই নিউজ সরিয়ে ফেলেছে।
বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিনের নাতি, তাঁর বড় কন্যা নুরজাহান বেগমের পুত্র সোহেল হোসেন চৌধুরীর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “মুক্তিযুদ্ধে আমার নানা এবং কিছুদিন পর আমার নানী মারা যান। তাহলে আমার মা এবং তাঁর ভাই বোনেরা কিভাবে এতো বড় হয়েছে? এতোদূর তারা আসলেন কি করে? আমাদের পরিবার এটি নিয়ে ভীষণ বিব্রত যে, আমার নানার নাম ভাঙ্গিয়ে একটি বিশেষ মহল ব্যবসা করার চেষ্টা করছে।
রুহুল আমিন জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান, আর সে কারণে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই আমরা সরকারের কাছে যথার্থ সাহায্য সহযোগিতা পেয়ে আসছি। কিন্তু এখনই কেন আমার ছোট মামাকে ভিখারি-দিনমজুর বানিয়ে সংবাদ ছড়ানো হচ্ছে? এসব পুরোপুরি ভিত্তিহীন।”
বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিনের নাতি খবরটিকে শুধু ভুয়া, এবং বিশেষ সময়ে ঝামেলা সৃষ্টির জন্য উদ্দেশ্যমূলক ভাবে ছড়ানো হচ্ছে।
রুহুল আমিনের নাতি সোহেল আরো বলেন, “আমার মামা শওকত মানসিক ভারসাম্যহীন। ফলে তিনি ময়লা জামা কাপড় পড়ে থাকেন এবং পরিচ্ছন্নতার প্রতি তার অনীহা। ফলে, তার পোশাক ও বেশভূষার ফায়দা ওঠাতে তৎপর এক মহল ছড়িয়েছে, সে ভিখারির জীবন যাপন করছেন। অথচ বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিনের বাড়িতে শওকত মামা একাই থাকেন পরিবার নিয়ে। তাদের পারিবারিক কিছু জমি ও দুইটি পুকুরও রয়েছে! যার সম্পূর্ণ ভোগদখল করছেন তিনি একাই। বাকী ভাই বোন এবং তাদের পরিবার সব সময়ই সরকারের সহযোগিতা পেয়েছে, এবং তারা সবাই শিক্ষিত ও স্বনির্ভর।”
বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিনের চার সন্তান। একাত্তরে ছোট ছেলে শওকতের বয়স ছিলো ২ বছর। তাঁর বাকী সন্তানেরা সবাই নিজেদের কর্মক্ষেত্রে উজ্জ্বল। তাঁর বড় মেয়ে নুরজাহান বেগমের বয়স ৫৫ বছর। তিনি স্বামী ও সন্তানদের নিয়ে ভালো অবস্থানে আছেন, সন্তানেরাও সরকারি চাকরি সহ, নানা কাজে ব্যস্ত, তাঁর বড় ছেলে মরহুম মোহাম্মদ আলি বাহার ছিলেন বিদেশি জাহাজের সাবেক ক্যাপ্টেন, তাঁর পরিবার বর্তমানে লন্ডনে বসবাস করছেন। ছোট মেয়ে রেজিয়া বেগমের বয়স ৪৮, তিনিও সরকারের সহায়তায় পরিবার নিয়ে সুখে আছেন।
আলোচিত ছোট ছেলে শওকত আলির বয়স ৪৬ পেরিয়েছে। তিনি অনেকদিন ধরেই মানসিক রোগী। আগে চট্টগ্রামের পূর্ব ফিরোজ শাহ কলোনির ২৭ নম্বর প্লটে সরকার প্রদত্ত বাড়িতে ছিল। ২০০৬ সালে সে নোয়াখালীতে চলে যায়। এবং সেখানে একমাত্র কন্যা বৃষ্টি ও স্ত্রীকে নিয়ে বসবাস করছেন।
মানসিক ভারসাম্যহীন শওকত আলী স্বাবলম্বী নয় বলে তাঁর পরিবারের কিছু আর্থিক সমস্যা আছে, কিন্তু এমন নয় যে তাকে ভিক্ষা করে বা দিনমজুর করে দিন কাটাতে হচ্ছে। এছাড়াও অন্যান্য ভাইবোনেরা যখনই সম্ভব তাকে সাহায্য করে থাকেন।
সবশেষে বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিনের নাতি বলেন, “যারা আমার মামাকে কলুষিত করছেন তাদের সবাইকে আমি আমন্ত্রণ জানাই নোয়াখালির সোনাইমুড়ী উপজেলায় আমার নানা বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিনের বাড়িতে। আপনারা এসে দেখে যান, সংবাদে উদ্দেশ্যমূলক ভাবে কি ছাপা হয়েছে আর বাস্তবতা কি!
সোহেল বলেন, মামাকে ভিখারী বা দিনমজুর দেখিয়ে প্রকাশিত নিউজগুলোতে কয়েকটি ব্যাঙ্ক একাউন্ট দিয়ে আর্থিক সাহায্যও চাওয়া হয়েছে। অথচ বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিনের পরিবারের কেউ এসব ব্যাংক একাউন্ট পরিচালনা করেন না।
রুহুল আমিনের সংগ্রাম: ৬ ডিসেম্বর ১৯৭১, মুক্তিবাহিনী যশোর সেনানিবাস দখলের পর ‘পদ্মা’, ‘পলাশ’ এবং ভারতীয় মিত্রবাহিনীর একটি গানবোট ‘পানভেল’ খুলনার মংলা বন্দরে পাকিস্তানি নৌ-ঘাটিঁ পি.এন.এস. তিতুমীর দখলের উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ-এ প্রবেশ করে। ১০ ডিসেম্বর দুপুর ১২ টার দিকে গানবোটগুলো খুলনা শিপইয়ার্ডের কাছে এলে অনেক উচুঁতে তিনটি জঙ্গি বিমানকে উড়তে দেখা যায়। শত্রুর বিমান অনুধাবন করে পদ্মা ও পলাশ থেকে গুলি করার অনুমতি চাওয়া হয়। কিন্তু অভিযানের সর্বাধিনায়ক ক্যাপ্টেন মনেন্দ্রনাথ ভারতীয় বিমান মনে করে গুলিবর্ষণ থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেন। এর কিছুক্ষণ পরে বিমানগুলো অপ্রত্যাশিত ভাবে নিচে নেমে আসে এবং আচমকা গুলিবর্ষণ শুরু করে। প্রথম গোলা এসে পড়ে ‘পদ্মা’য় এবং পরবর্তীতে ‘পলাশে’।
গোলা সরাসরি ‘পদ্মা’ এর ইঞ্জিন রুমে আঘাত করে ইঞ্জিন বিধ্বস্ত করে। হতাহত হয় অনেক নাবিক। ‘পদ্মা’-র পরিণতিতে পলাশের অধিনায়ক লে. কমান্ডার রায় চৌধুরী নাবিকদের জাহাজ ত্যাগের নির্দেশ দেন। রুহুল আমিন এই আদেশে ক্ষিপ্ত হন। তিনি উপস্থিত সবাইকে যুদ্ধ বন্ধ না করার আহ্বান করেন। কামানের ক্রুদের বিমানের দিকে গুলি ছুড়ঁতে বলে ইঞ্জিন রুমে ফিরে আসেন। কিন্তু অধিনায়কের আদেশ অমান্য করে বিমানগুলোকে চ্যালেঞ্জ করা হয়নি।
বিমানগুলো উপূর্যপুরি বোমাবর্ষণ করে পলাশের ইঞ্জিনরুম ধ্বংস করে দেয়। আহত হন তিনি। কিন্তু অসীম সাহসী রুহুল আমিন তারপর-ও চেষ্টা চালিয়ে যান পলাশ কে বাঁচানোর। তবে ইঞ্জিন বিকল হয়ে আগুণ ধরে যায় এবং গোলার আঘাতে রুহুল আমিনের ডান হাতটি সম্পূর্ণ উড়ে যায়। অবশেষে পলাশের ধ্বংশাবশেষ পিছে ফেলেই আহত রুহুল আমিন ঝাঁপিয়ে পড়েন রূপসা-এ। প্রাণশক্তি-তে ভরপুর এ যোদ্ধা একসময় পাড়ে-ও এসে পৌছান।
কিন্তু ততক্ষণে সেখানে ঘৃণ্য রাজাকারের দল অপেক্ষা করছে তার জন্য। আহত এই বীর সন্তান কে তারা বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করে রূপসা-র পাড়ে-ই। তাঁর বিকৃত মৃতদেহ বেশকিছুদিন সেখানে পড়ে ছিলো অযত্নে, অবহেলায়। তিনি শহীদ হলেন। পরবর্তীতে স্থানীয় জনসাধারণ বাগমারা গ্রামে রূপসা নদীর পাড়ে তাঁকে দাফন করে এবং সেখান একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মান করা হয়।
সচেতনতায় সংকলিত
নিউজওয়ার্ল্ডবিডি ডট কম।


