বৃষ্টি না হওয়ায় এবং পানি নামতে শুরু করায় সারাদেশে বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। তবে দূর্ভোগ কমেনি দূর্গত মানুষের। কোথাও কোথাও পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাবও দেখা দিয়েছে। দুর্যোগ এলাকাগুলোতে ত্রাণ দেয়া হলেও তা পর্যাপ্ত নয়।খুলনায় অবিরাম বৃষ্টিতে উজানের পানির চাপ বৃদ্ধি পাওয়ায় খুলনা-সাতক্ষীরা অঞ্চলের দুর্বল বেড়িবাঁধগুলো ভাঙতে শুরু করেছে। বর্তমানে আরো শতাধিক বেড়িবাঁধ মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। ফলে চরম আতঙ্কের মধ্যে রয়েছে উপকূলীয় এলাকার হাজার হাজার মানুষ। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, টানা বর্ষণ ও উজানের পানির চাপের কারণে বেড়িবাঁধগুলো ভাঙছে। একদিনের ব্যবধানে দাকোপ উপজেলা ও ডুমুরিয়া উপজেলায় বেড়িবাঁধ ভেঙে লোকালয়ে ঢুকে পড়েছে পানি। পাউবো খুলনা-২ এর নির্বাহী প্রকৌশলী পিযুষ কৃষ্ণ কুন্ডু বলেন, বেড়িবাঁধের ঝুঁকিপূর্ণ পয়েন্টগুলো মেরামতের জন্য ইতিমধ্যে টেন্ডার হয়ে গেছে। অর্থ ছাড় হলেই কাজ শুরু হবে।
সেনবাগ (নোয়াখালী) সংবাদদাতা জানান, প্রবল বর্ষন ও ফেনী নদী থেকে ধেয়ে আসা জোয়ারের পানির কারণে নোয়াখালীর সেনবাগে গত এক সপ্তাহ ধরে সৃষ্ট জলাবদ্ধতা ভয়াবহ বন্যায় রুপ নিয়েছে। স্মরণকালের ভয়াবহ এ বন্যায় সেনবাগ পৌরসভাসহ উপজেলার লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি অবস্থায় মনবেতর জীবন যাপন করেছে। অনেক রাস্তাঘাট পানির নিচে তলিয়ে রয়েছে। ফলে এলাকার মানুষজন চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছে।
নড়িয়া (শরীয়তপুর) সংবাদদাতা জানান, শরীয়তপুর নড়িয়া উপজেলার সুরেশ্বরে গতকাল সোমবার সকালে ৪৫টি বাড়ীঘর নদীতে বিলীন হয়ে গেছে । স্থানীয়লোকজন কোন কিছু বোঝার আগেই স্রোত বৃদ্ধি পেয়ে বাড়িঘর তলিয়ে যায়। লোকজনকে খোলা আকাশের নীচে মানবতার জীবনজাপন করতে হচ্ছে।
মণিরামপুর (যশোর) সংবাদদাতা জানান, অতিবর্ষনে কপোতাক্ষ নদের উপচে পড়া পানিতে মণিরামপুরের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। পানিবন্দী হয়ে পড়েছে হাজার হাজার মানুষ। কৃষি জমি, বাড়িঘর, মত্স্য ঘের, রাস্তাঘাট তলিয়ে গেছে। স্যানিটেশন ব্যবস্থা পুরোটাই ভেঙ্গে পড়েছে। উপজেলার ১২ টি ইউনিয়নের শতাধিক গ্রাম প্লাবিত হয়ে প্রায় ২০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। ইতিমধ্যে জ্বর, ডায়রিয়াসহ পানিবাহিত নানা রোগের প্রকোপ দেখা দিয়েছে বন্যা কবলিত এলাকায়। খাবার পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে কোন কোন এলাকায়।
নোয়াখালী প্রতিনিধি জানান, টানা বর্ষণে জলাবদ্ধতায় সৃষ্ট বন্যার পানিতে ডুবে বেগমগঞ্জ উপজেলার দূর্গাপুর গ্রামের শারজাহান বেগম (৫০) নামের এক মহিলার মৃত্যু হয়েছে। গতকাল সোমবার সকাল ১০ টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। দেড় মাস আগে তার স্বামী গোলাম মোস্তফার মৃত্যু হয়েছিল।
বরগুনা (দক্ষিণ) প্রতিনিধি জানান, বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার পদ্মা এলাকার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভেঙ্গে অন্তত ৫টি গ্রামের ঘর-বাড়ি প্লাবিত হয়েছে। ভাঙ্গা বাঁধ দিয়ে লবন পানি ঢুকে নষ্ট হচ্ছে কৃষি জমি ও বীজতলা। এছাড়া গতকাল জোয়ারের পানিতে বরগুনা শহরের বঙ্গবন্ধু সড়ক, পশু হাসপাতাল সড়ক, কলেজ রোড, সিরাজউদ্দীন সড়কের পাশের ঘর-বাড়ি এবং চরকলোনীসহ কয়েকটি নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে।
কয়রা (খুলনা) সংবাদদাতা জানান, উপজেলার উত্তর বেদকাশি ইউনিয়নের কপোতাক্ষ নদের পাউবোর ১৪/১ পোল্ডারের বেড়িবাঁধ ভেঙে শাকবাড়িয়া গ্রামের ১৪টি পরিবার সহ বেশ কয়েকটি চিংড়ি ঘের প্লাবিত হয়েছে। কপোতাক্ষ নদের পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় এবং প্রবল ভাঙনে হঠাত্ একটি চর সহ শাকবাড়িয়া গ্রাম পানিতে তলিয়ে যায়।
লালমোহন ও মনপুরা (ভোলা) : রোববার ধলীগৌরনগর ইউনিয়নের পাটোয়ারীর হাট অংশের বাঁধ ধসে পড়ে। এতে বাঁধে আশ্রয় নেয়া মানুষের মাঝে আতংক দেখা দেয়। তাৎক্ষণিক স্থানীয়রা বালুর বস্তা ফেলে ধস ঠেকান। ঝুঁকির মধ্যে আছে লর্ডহার্ডিঞ্জের ফাতেমাবাদ ও চাঁদপুর এলাকার বেড়িবাঁধ। শনিবার ফাতেমাবাদ স্লুুইস এলাকায় বাঁধের কিছু অংশ ভেঙে যায়। এতে সেখানকার ৩-৪টি বসতঘরের ক্ষতি হয়। এছাড়া লালমোহনের পশ্চিমে তেঁতুলিয়া নদীতে অস্বাভাবিক পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় পশ্চিম চরউমেদ ইউনিয়নের গজারিয়া খাল গোড়া এলাকায় ছোট বেড়িবাঁধ শনিবার রাতে ভেঙে যায়। পানিতে তলিয়ে গেছে ব্রিকফিল্ডসহ স্থানীয় একাধিক মাছের খামার এবং বাড়িঘর। সোমবারও মনপুরায় মেঘনার পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। মূল ভূখণ্ডের কিছু এলাকা ও চরাঞ্চল প্লাবিত হয়ে এখনও শত শত বাড়িঘর ডুবে রয়েছে। এতে ৪০ হাজার মানুষ পানিবন্দি রয়েছে। তবে নতুন বর্ষণ না থাকায় পানি কমতে শুরু করেছে এসব এলাকায়। এতে কিছুটা উন্নতি হয়েছে বন্যার।
রাউজান ও রাঙ্গুনিয়া (চট্টগ্রাম) : সোমবার পর্যন্ত ডুবে রয়েছে রাউজান উপজেলার বিস্তীর্ণ জনপদ। তবে দু’দিন বর্ষণ না থাকায় কিছুটা উন্নতি হয়েছে। বানের পানিতে শত শত সড়কের পাশাপাশি ভেঙে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে রাউজান নোয়াপাড়া সেকশন ২ সড়ক। এতে ভোগান্তিতে পড়েছেন উপজেলার পশ্চিম গুজরা, বিনাজুরী ও গহিরার মানুষ। এদিকে বৃষ্টিপাত কমে যাওয়ায় পানি নামতে শুরু হলেও কাপ্তাই পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের গেট খুলে দেয়ায় রাঙ্গুনিয়াসহ পার্শ্ববর্তী এলাকার নিুাঞ্চল প্লাবিত হয়। ভেসে যায় পুকুরের মাছ। তলিয়ে রয়েছে রোপা আমন ও শস্যক্ষেত।
রাঙ্গামাটি : সম্প্রতি ভারি বর্ষণে কাপ্তাই লেকের পানির উচ্চতা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে তলিয়ে যায় রাঙ্গামাটির মনোরম ঝুলন্ত সেতুটি। স্থানীয় পর্যটন কর্পোরেশন ও হলিডে কমপ্লেক্সের ওই সেতুটি এখন হাঁটু পানির নিচে। সেতুর পাটাতন যাতে নষ্ট না হয় সেজন্য পারাপার সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। এতে লোকজনকে পারাপার হতে হচ্ছে নৌকা ও সাম্পান দিয়ে।
বান্দরবান : জেলা শহরের সাংগু নদীর তীরে অবস্থিত মধ্যমপাড়ার অর্ধশত বসতঘর বানের পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে ধসে পড়েছে। পরে ক্ষতিগ্রস্তরা উঁচু এলাকায় আশ্রয় নেয়।’মনিরামপুর (যশোর) : বৃষ্টি কমে গেলেও কপোতাক্ষ নদের পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। বানের পানিতে তলিয়ে রয়েছে বিস্তীর্ণ এলাকার কৃষি জমি, বাড়িঘর, মৎস্য ঘের, টিউবওয়েলসহ রাস্তাঘাট। স্যানিটেশন ব্যবস্থার পুরোটাই ভেঙে পড়েছে। পানিবন্দি রয়েছে উপজেলার ১২টি ইউনিয়নের শতাধিক গ্রামের মানুষ।
ডেস্ক রিপোর্ট
নিউজওয়ার্ল্ডবিডি ডটকম


