বুধবার ৪ নভেম্বর ২০২৬

কিউবা ও যুক্তরাষ্ট্র: প্রশ্নগুলো সহজ আর জবাবও জানা

Farrok-Nawazফারুক নওয়াজ, প্যারিস থেকে।

ভৌগলিক দূরত্ব স্বত্বেও কিউবা ও যুক্তরাষ্ট্রের সর্ম্পক কখন পুন:স্থাপিত হতে পারে বলে আপনি মনে করেন ?’ জবাবে স্বভাবসুলভ ভঙ্গীতে হাভানা চুরুটে টান দিয়ে একগাল ধোয়া ছেড়ে হেসে বললেন, যখন মার্কিন মুলুকে একজন কৃষ্ণাঙ্গ রাষ্ট্রপতি এবং মহান পোপ দক্ষিন আমেরিকার কোন দেশ থেকে নির্বাচিত হবেন।
ছোট্ট একটি প্রশ্ন। অথচ সে প্রশ্নের গভীরতা কতোটা বিশাল তা সহজেই অনুমেয়। আবার যাকে এ প্রশ্ন করা হচ্ছে তার উত্তরের ঘনত্ব বিচার করাটাও জটিল।

বিস্মৃতপ্রায় এ প্রশ্নোত্তরের খেলার ঠিক ৪২ বছর পর অনেকটা কাকতালীয়ভাবেই ঘটনাটি খাপে খাপে মিলে গেছে। দুনিয়ার তাবড় তাবড় সংবাদ মাধ্যমে উত্তর দাতাকে একজন বড় মাপের ভবিষ্যতবক্তা বা মহাপুরুষ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। উত্তরদাতা সেটা হেয়ালী করেই বলেছিলেন কিনা তা নিয়ে প্রতি নিয়ত নতুন নতুন বিতর্কের অবতারনা হচ্ছে।

প্রশ্নটা করা হয়েছিলো কিউবার (সম্প্রতি অবসরে যাওয়া) স্থপতি হিসেবে স্বীকৃত ফিদেল ক্যাস্ট্রোকে। ১৯৭৩ সালের অক্টোবর মাসে অস্ট্রেলীয় বংশোদ্বুত ব্রিটিশ সাংবাদিক নেইল ব্রায়ান ডেভিস (ছদ্মনাম ব্রায়ান ডেভিস) এক সংবাদ সম্মেলনে ফিদেলকে এ প্রশ্ন করেছিলেন। ( প্রশ্নকর্তা সে সময় একটি ব্রিটিশ সংবাদ সংস্থায় কাজ করতেন। তিনি যুদ্ধকালীন সাংবাদিক হিসেবে ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়া যুদ্ধ কাভার করেছিলেন। কিউবায় রাশিয়ান ক্ষেপনাস্ত্র স্থাপনের উপর একটি তথ্যচিত্র নির্মানের জন্য সে সময় কিউবায় অবস্থান করছিলেন। এ প্রশ্ন করার কারনে তার বিরুদ্ধে মার্কিনের হয়ে গোয়েন্দাবৃত্তির অভিযোগ আনা হয়। ১৯৮৫ সালে এ সাংবাদিক মৃত্যবরন করেন।)

প্রশ্নের গভীরতাকে ছাপিয়ে ফিদেল ক্যাস্ট্রো উত্তর করেছিলেন, যেদিন মার্কিন মুলুকে কৃষ্ণাঙ্গ রাষ্ট্রপতি এবং দক্ষিণ আমেরিকান একজন পোপ নির্বাচিত হবেন তখন ভেঙ্গে যাওয়া এ সর্ম্পক পুন:স্থাপিত হতে পারে। সে সময়ের জন্য অবিশ্বাস্য হলেও এখন এটাই সত্য। বর্তমানে মার্কিন মুলুকে কেনিয়ার বংশোদ্ভুত বারাক ওবামা উপর্যুপরি দ্বিতীয়বারের (২০০৮ ও ২০১২) মতো রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন। পাশাপাশি ভ্যাটিকান সিটি’র রোমান ক্যাথলিক ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মযাজক বা পোপ ফ্রান্সিস ও একজন দক্ষিণ আমেরিকান নাগরিক। ১৯৩৬ সালের ১৭ ডিসেম্বর আর্জেটিনার রাজধানী বুয়েনস আইরেস এ জন্মগ্রহন করেন তিনি। ২০১৩ সালের ১৩ মার্চ রোমান ক্যাথলিক গীর্জার ২৬৬ তম পোপ বা ধর্মযাজকের দায়িত্ব গ্রহন করেন তিনি।

মার্কিন কিউবা সম্পর্কের ইতিহাস: কিউবা ছিল আগে স্পেনের অধীনে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ১৮৯৮ সালে এক যুদ্ধের মাধ্যমে স্পেনের কাছ থেকে কিউবা দখল করে নেয়। এরপর ১৯০২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে কিউবা স্বাধীন হয়; কিন্তু শর্ত ছিল যুক্তরাষ্ট্র তার অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করতে পারবে। ১৯৩৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র তার হস্তক্ষেপের অধিকার উঠিয়ে নেয়। ১৯৫৯ সালে বিপ্লবী নেতা ফিদেল ক্যাস্ট্রো ৯ হাজার যোদ্ধা নিয়ে হাভানায় অভিযান চালান। যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত প্রেসিডেন্ট ফুলগোনিকো বাতিস্তা পালিয়ে যান এবং ক্যাস্ট্রো ক্ষমতা গ্রহণ করেন। এরপর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কিউবার সম্পর্কের অবনতি শুরু হয়। ১৯৬০ সালে ক্যাস্ট্রো ক্ষতিপূরণ ছাড়াই সব ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে জাতীয়করণ করেন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ওয়াশিংটন হাভানার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে। ১৯৬১ সালে নির্বাসিত কিউবানরা যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতায় পিগস উপসাগরে অভিযান চালায়। ক্যাস্ট্রো কিউবাকে কমিউনিস্ট রাষ্ট্র ঘোষণা করে সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে জোট গঠন করেন। তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি ১৯৬২ সালে কিউবার ওপর বাণিজ্যিক অবরোধ আরোপ করেন। ওই বছরই কিউবা তার ভূখণ্ডে সোভিয়েত ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েনে রাজি হলে সোভিয়েত-মার্কিন সম্পর্কে উত্তেজনা সৃষ্টি হয় এবং একপর্যায় পারমাণবিক যুদ্ধ বেঁধে যাওয়ার আশংকা দেখা দেয়। সোভিয়েত ইউনিয়ন তখন কিউবায় ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনের উদ্যোগ থেকে সরে এলে উত্তেজনা প্রশমিত হয়। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কিউবার সম্পর্ক কখনোই ভালো ছিল না। জানা যায়, সিআইএ ক্যাস্ট্রোকে হত্যার চেষ্টা করে অন্তত পাঁচটি অভিযান চালায়।

১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর কিউবায় অর্থনৈতিক সংকট শুরু হয়। একবিংশ শতাব্দীর শুরুতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ কিউবার ওপর নতুন করে অবরোধ আরোপ করেন। ২০০১ সালে হারিকেন মিশেল আঘাত হানলে হাভানার অনুরোধে যুক্তরাষ্ট্র ৪০ বছরের মধ্যে প্রথম কিউবায় খাদ্য রফতানি করে। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার ২০০২ সালে কিউবা সফর করেন। এটি ছিল ক্যাস্ট্রো ক্ষমতায় আসার পর প্রথম কোনো মার্কিন নেতার সফর। এর পরের বছর জর্জ ডব্লিউ বুশ কিউবার সমাজতান্ত্রিক শাসন উৎখাতের ঘোষণা দেন। ২০০৪ সালে কিউবায় ডলার ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়। বাণিজ্যের ক্ষেত্রে একমাত্র স্থানীয় মুদ্রা পেসোকে বাধ্যতামূলক করা হয়। এরপর ২০০৬ সালে ফিদেল ক্যাস্ট্রো অসুস্থ হলে ভাই রাউল ক্যাস্ট্রোর কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। এর কয়েক মাস পর যুক্তরাষ্ট্রের রিপাবলিকান কংগ্রেসম্যান জিফ ফেলেক ১০ সদস্যের প্রতিনিধি নিয়ে কিউবা সফর করেন।

২০০৯ সালে বারাক ওবামা প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর কিউবার সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের আগ্রহ ব্যক্ত করেন। ওই বছরেই ওবামা কিউবায় পারিবারিক ভ্রমণ ও রেমিটেন্সের ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেন। ২০১৩ সালে ওবামা দ্বিতীয়বার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে সম্পর্ক উন্নয়নের নতুন উদ্যোগ নেন। সে বছরই ওবামার দুই নিরাপত্তা উপদেষ্টা গোপনে কিউবা সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করে মুখোমুখি বৈঠকের প্রস্তাব দেন। এরপর ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে দক্ষিণ আফ্রিকার অবিসংবাদিত নেতা নেলসন ম্যান্ডেলার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় অংশ নিতে গিয়ে প্রেসিডেন্ট ওবামা ও প্রেসিডেন্ট রাউল ক্যাস্ট্রো পরস্পর করমর্দন ও কুশল বিনিময় করেন। ২০১৪ সালের মার্চে ওবামা ভ্যাটিকান সফরে গেলে কিউবার সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে পোপকে ব্যক্তিগতভাবে উদ্যোগ গ্রহণের অনুরোধ জানান। পোপ ফ্রান্সিস সম্পর্কোন্নয়নের এ সুযোগ নষ্ট না করতে প্রেসিডেন্ট রাউল ক্যাস্ট্রোকে ব্যক্তিগতভাবে অনুরোধ করেন। ক্যাস্ট্রোর ইতিবাচক জবাবের পর ভ্যাটিকানের উদ্যোগে রোমে কিউবা ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের গোপন বৈঠক বসে। এতে সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠার শর্তগুলো চূড়ান্ত হয়।

গত বছর নভেম্বরে দুই দেশের শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে ওবামা একটি চুক্তির পক্ষে মত দেন। এরপর কানাডায় সব প্রশ্নে মতৈক্যের পর দুই পক্ষের মধ্যে একাধিক বৈঠক হয়। স্থির হয় বন্দিবিনিময় প্রক্রিয়া। সম্প্রতি উভয় দেশের মধ্যে কিছু বন্দিবিনিময় হয়। গত ডিসেম্বরে ওবামা রাউল কাস্ট্রোকে ফোন করে ঘণ্টাখানেক কথা বলেন এবং উভয়েই আনুষ্ঠানিক ঘোষণার সময় নির্ধারণ করেন। এ ধারাবাহিকতায় কয়েকদিন আগে মধ্য আমেরিকার দেশ পানামায় অনুষ্ঠিত এসওএ (সামিট অব দি আমেরিকাস) শীর্ষ সম্মেলনে এক ঐতিহাসিক বৈঠক করেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি ও কিউবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্রুনো রদ্রিগেস। ওই বৈঠক চূড়ান্ত রূপ পায় রাউল কাস্ট্রোর সঙ্গে ওবামার সাক্ষাতের মধ্য দিয়ে।

সেই ঐতিহাসিক বৈঠকটি হয় ১১ এপ্রিল। সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনে এক ফাঁকে দুই নেতা বৈঠকে মিলিত হন। গত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকের পর চির বৈরী দু’দেশের শীর্ষস্থানীয় নেতার প্রথম বৈঠক এটি।
এর বর্ধিত অংশ হিসেবে ২০১৫ সালের ২০ জুলাই সোমবার প্রথম প্রহরে ওয়াশিংটনে কিউবার এবং হাভানায় যুক্তরাষ্ট্রের কুটনৈতিক মিশনে একযোগে জাতীয় পতাকা ওড়ানো হয়।

ফারুক নওয়াজ, ফ্রান্স প্রবাসী সাংবাদিক ও নিউজওয়ার্ল্ডবিডি ডট কমের ইউরোপ ব্যুরো চিফ।

আরও পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *