বুধবার ৪ নভেম্বর ২০২৬

২০১৮ সাল পর্যন্ত ছিটমহলবাসীকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে: দীপ্তিমান

Diptiman-ছিটমহল বিনিময়কে দুই দেশের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে দাঁড় করাতে কাজ করেন ভারত-বাংলাদেশ ছিটমহল বিনিময় সমন্বয় কমিটির প্রধান সমন্বয়ক বা মুখপাত্র দীপ্তিমান সেনগুপ্ত। ৩ আগস্ট পঞ্চগড় এলজিইডি গেস্ট হাউসে ছিটমহল আন্দোলনের ইতিবৃত্ত নিয়ে বিশেষ সাক্ষাৎকার দেন তিনি।

গত ২ থেকে ৪ আগস্ট বাংলাদেশ সফরে ছিলেন ছিটমহল আন্দোলনের সফল নেতা দীপ্তিমান সেনগুপ্ত। সরেজমিন তিনি পঞ্চগড়, নীলফামারী, লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রামের সঙ্গে একীভুত হওয়া ১১১টি ছিটমহলের বাসিন্দাদের খোঁজখবর নেন। এ সময় তিনি হাজার হাজার মানুষের ফুলেল শুভেচ্ছায় সিক্ত হন।

গত ১ আগস্ট বাংলাদেশ ও ভারতের সঙ্গে একীভূত হয়ে ১৬২টি ছিটমহলের বাসিন্দা পেয়েছেন উভয় দেশের নাগরিকত্ব। এর সঙ্গে বিলুপ্তি ঘটেছে ছিটমহল শব্দটির। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ ভাগ হয়ে ভারত ও পাকিস্তান নামক দু’টি রাষ্ট্রের জন্মের পর উভয় দেশের মূল ভুখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ‘ছিটমহল’ শব্দটির সৃষ্টি হয়। দীর্ঘ ৬৮ বছর ধরে ছিটমহলের অধিবাসীরা সব ধরনের নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছিলেন।

ছিটমহলবাসীর দুঃখ-দুর্দশার চিত্র দেখে বসে থাকতে পারেননি পশ্চিমবঙ্গের সিতাই বিধান সভা থেকে কংগ্রেস দলীয় চারবারের বিধায়ক দ্বীপক সেনগুপ্ত। হতভাগ্য এসব মানুষের বঞ্চনা ও অধিকার প্রতিষ্ঠায় ১৯৭৪ সালের মুজিব-ইন্দ্রিরার স্থল সীমানা চুক্তির বাস্তবায়নের দাবিতে ২২-২৪ বছর আগে প্রতিষ্ঠা করেন ভারত-বাংলাদেশ ছিটমহল বিনিময় সমন্বয় কমিটি। ছিটমহলবাসীর এ অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে তিনি দলের সহযোগিতা চেয়েও সেভাবে পাননি। তাই দল ছেড়ে ১৬২ ছিটমহলের পঞ্চাশ হাজারের বেশি মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় সামাজিক সংগঠন ছিটমহল বিনিময় সমন্বয় কমিটিকেই বেছে নেন জীবনের ব্রত হিসেবে। ২০০৯ সালে মারা যান দ্বীপক সেনগুপ্ত। কিন্তু মারা যাওয়ার সময় তার স্বপ্ন বাস্তবায়নের ভার দিয়ে যান ছেলে দীপ্তিমান সেনগুপ্তের ওপর। ভারতের একটি নামি-দামি মোবাইল কোম্পানির চাকরি ছেড়ে দীপ্তিমান সেনগুপ্ত বাবার স্বপ্ন বাস্তবায়নে যোগ দেন ছিটমহলবাসীর অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে। পশ্চিমবঙ্গের কুচবিহার জেলার নিজ জন্মস্থান দিনহাটা থেকে শুরু করে ভারতের অভ্যন্তরে বাংলাদেশের ৫১টি ছিটমহল এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ১১১টি ছিটমহল চষে বেড়াতে থাকেন তিনি।

তার নির্দেশনাতেই অধিকার আদায়ে উভয় দেশের সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণে মানববন্ধন, সেমিনার-সিম্পোজিয়াম, সড়ক অবরোধ ও অনশনের মতো কঠোর কর্মসূচি পালিত হয় উভয় দেশের ছিটমহলগুলোয়। ছিটমহলের বাসিন্দারা দীপ্তিমানের নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ হয় নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠায়।

১৯৭৪ সালের মুজিব-ইন্দিরা স্থল সীমান্ত চুক্তি অনুযায়ী ছিটমহলগুলো বিনিময়ে বাংলাদেশ সরকারের সমর্থন থাকলেও বরাবরই পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কারণে তার বাস্তবায়ন দীর্ঘায়িত হতে থাকে। তাই পশ্চিমবঙ্গ সরকার প্রধান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছেও ছিটমহলবাসীর বঞ্চনার প্রকৃত চিত্র তুলে ধরেন দীপ্তিমান সেনগুপ্ত। ফলে মমতার হৃদয়ের বরফও গলে, দেশটির সংসদের উচ্চ ও নিম্নকক্ষে স্থল সীমান্ত চুক্তি পাশের পরই গত ৬ জুন মমতাকে সঙ্গে নিয়ে ঢাকা সফরে আসেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। এ সময় উভয় দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিবের মধ্যে ছিটমহল বিনিময়পত্র হস্তান্তর হয়। বলা হয়, ১ আগস্ট থেকে ১৬২টি ছিটমহল আনুষ্ঠানিকভাবে বিনিময় হয়েছে বলে গণ্য হবে। এর ফলে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে থাকা ১১১টি ছিটমহল বাংলাদেশের সঙ্গে একীভূত হয়। অন্যদিকে ভারতের অভ্যন্তরে থাকা ৫১টি ছিটমহল ভারতের মানচিত্রের সঙ্গে এক হয়ে যায়।

৬৮ বছর পর ছিটমহলবাসী নতুন দেশ পেয়েছে। এর পেছনে বাংলাদেশ-ভারত ছিটমহল বিনিময় সমন্বয় কমিটি কী ধরনের দায়িত্ব পালন করেছে?
ছিটমহলবাসীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় আমার বাবা দ্বীপক সেনগুপ্ত ২২-২৪ বছর পর আন্দোলন শুরু করেছিলেন। আন্দোলনটা ছিল সামাজিক। বাবার মৃত্যুর পরে আমাকে এ আন্দোলনে যোগ দিতে হয়। এ সময় অনশন থেকে শুরু করে সব ধরনের কর্মসূচি পালন করেছি। ছিটমহলের বাসিন্দাদের নিজ অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য ঐক্যবদ্ধ করেছি। উভয় দেশের সরকারকে বুঝানোর চেষ্টা করেছি— এসব মানুষের মৌলিক অধিকার পাওয়া জরুরি। কিন্তু এটা খুব সহজে হয়নি। অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে। সমন্বয় কমিটির কাজটা ছিল মূলত অনুঘটকের মতো। আমরা সরকারকে কনফিডেন্টস দিয়েছি। ছিটমহল বিনিময়ের ফলে অধিকাংশ মানুষ উপকৃত হয়েছে।

ছিটমহলবাসী নতুন দেশ পাওয়ায় সমন্বয় কমিটির সমন্বয়ক হিসেবে আপনি কি মনে করছেন আপনাদের আন্দোলন সংগ্রাম পরিপূর্ণতা পেয়েছে?
হ্যাঁ, অবশ্যই। কারণ আমাদের একটাই এজেন্ডা ছিল। আর তা হল ১৯৭৪ সালের মুজিব-ইন্দিরা স্থল সীমান্ত চুক্তির বাস্তবায়ন। আর এটা তো শেষ পর্যন্ত হয়েছে।

৬৮ বছর ছিটমহলবাসী নানা বঞ্চনার শিকার হয়েছেন। তাদের আর্থ-সামাজিক মানোন্নয়নে আপনাদের কি দাবি-দাওয়া আছে? থাকলে এ ব্যাপারে শিগগির কোনো পদক্ষেপ নেবেন কিনা?
দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের পর ছিটমহলবাসী উভয় দেশের নাগরিকত্ব পেয়েছে। আমার মনে হয় উভয় দেশের মূল ভুখণ্ডের বাসিন্দারা যেভাবে সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছেন- এরাও (ছিটমহলবাসী) তা পাবে।

দুই দেশের সরকারের নতুন এই নাগরিকদের ভাগ্যোন্নয়নে প্রথম কী পদক্ষেপ নেওয়া উচিত বলে আপনি মনে করছেন?
বিলুপ্ত ছিটমহলগুলোর রাস্তাঘাট অনুন্নত। নেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান-বিদ্যুৎ। আমার মনে হয় সরকারকে এসব সমস্যার সমাধান আগে করা উচিত। তাদের মূলধারায় ফিরিয়ে আনতে তথা মূল ভুখণ্ডের বাসিন্দাদের সঙ্গে তাদের মধ্যে সমতা আনতে আর্থিক সচ্ছলতা কিভাবে আনা সম্ভব তা-ও ভাবা উচিত।

আপনাদের আন্দোলনের ফসল তো ছিটমহলবাসীর ঘরে উঠল। এখন কী করবেন?
দীর্ঘ ৬৮ বছর অধিকার বঞ্চনার পর ছিটমহলবাসীর নাগরিকত্ব মিলেছে। ফলে আমার বাবার স্বপ্নটা পূরণ হয়েছে। আমি আমার বাবার স্বপ্ন পূরণের জন্যই চাকরি ছেড়ে দিয়ে সমন্বয় কমিটির আন্দোলনে শরিক হয়েছিলাম। তবে আমি মনে করি— হয়ত অচিরেই ছিটমহল সমন্বয় কমিটির বিলুপ্তি ঘটবে। কিন্তু আমাদের কাজ এখনো শেষ হয়ে যায়নি। ছিটমহলবাসীর নাগরিকত্ব মিলেছে। কিন্তু নিজেদের অধিকার আদায় ও উন্নয়নের জন্য কমপেক্ষ ২০১৮ সাল পর্যন্ত ঐক্যবদ্ধ থাকা প্রয়োজন।

বাবা চারবার এমপি ছিলেন, আপনার রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হওয়ার ইচ্ছে আছে কিনা?
আমি কখনো ভোটের রাজনীতিতে যাব না। ভোটভিক্ষার মতো পাপের কাজ করতে যাব না। বাবা আমাকে যে দায়িত্ব দিয়েছিলেন, আমি তা পালন করেছি। আগামী দিনেও আমি মানুষের পাশেই থাকতে চাই। তবে রাজনীতির মাধ্যমে নয়। সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমে।
আপনি নতুন নাগরিকদের ঐক্যবদ্ধ থাকার কথা বলছেন। এখন তাদের ঐক্যবদ্ধ রাখার জন্য কোনো প্ল্যাটফরম তৈরির পরিকল্পনা আছে কিনা?
সেটা হবে। সময় মতোই তা জানতে পারবেন।

ছিটমহলের অনেক মানুষের নামই জরিপে বাদ পড়েছে— অভিযোগ করা হয় তাদের জরিপে অংশ নিতে সেভাবে সময় দেওয়া হয়নি…
বাদ পড়েছে এটা ঠিক। কিন্তু এ দোষ কাদের দেব? ২০১১ সালে যখন জনগণনা হয়, তখন আমি নিজে সবার পায়ে ধরেছি। কিন্তু তারা সাড়া দেয়নি। এবার যারা জরিপে নাম তুলতে আসছে ১০০ জনের ৯৯ জনই সুবিধাবাদী। তারা তখন বলেছিল কি জানেন? ‘জরিপে নাম লিখালি আমার বাংলার নামটি কাটি যাবে।’ তখন বলেছিলাম— যে যেখানে আছে, প্রতি বাড়ির কমপক্ষে একজন করে বাড়িতে থাকুক। কিন্তু আমাদের কথায় কেউ সাড়া দেয়নি। যদি সুযোগ-সুবিধা বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু এবার কেন? নোট পাওয়া যাবে, টাকা পাওয়া যাবে। অর্থাৎ স্বার্থ।

দ্য রিপোর্ট অবলম্বনে-
নিউজওয়ার্ল্ডবিডি ডট কম।

আরও পড়ুন