বুধবার ৪ নভেম্বর ২০২৬

বিদেশের বাংলাদেশ দূতাবাসে অনাচার ঠেকাতে নজিরবিহীন আচরণবিধি

32323বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বাংলাদেশ দূতাবাস ও কনস্যুলেটগুলোতে কর্মকর্তাদের দ্বারা নারী কর্মকর্তাদের যৌন হয়রানিসহ নানা ধরনের যৌন অনাচার ও বিতর্কিত ঘটনা ঠেকাতে সচেষ্ট হয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। বিভিন্ন ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে অনেকটা বাধ্য হয়েই ঢাকা থেকে দুই পাতার এক সুর্দীর্ঘ ‘আচরণবিধি’ জারি করা হয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রশাসন অণুবিভাগের মহাপরিচালক আল­ামা সিদ্দীকী স্বাক্ষরিত ওই আচরণবিধিটি মন্ত্রণালয়সহ বিদেশের সবগুলো দূতাবাস ও মিশনে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।

সম্প্রতি কয়েকটি ঘটনা গণমাধ্যমে প্রকাশের পর এই প্রজ্ঞাপন জারি করা হলো। মন্ত্রণালয়ের এ উদ্যোগের মাধ্যমে নিগ্রহ ও হয়রানির ঘটনা কমে আসবে বলে মনে করছেন কর্মরত কূটনীতিকরা। এছাড়া নারী কূটনীতিকরা এই প্রজ্ঞাপনে উচ্ছসিত হয়েছেন বলেও সূত্রের খবর।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র থেকে এই আচরণবিধির অনুলিপি নিউজওয়ার্ল্ডবিডি ডট কমের এই প্রতিবেদকের কাছে এসেছে। এতে বলা হয়, গভীর উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্য করা যাচ্ছে, ইদানিং বিদেশস্থ বাংলাদেশ মিশনসমুহে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারিদের মাঝে আস্থা, শিষ্টাচার, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও সৌহাদ্যের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা ঐতিহ্যপূর্ণ পেশাদার সম্পর্কের অবনতি ঘটেছে। ফলে মিশনগুলোতে ব্যক্তিগত অসন্তোষ এবং নিগ্রহের ঘটনা বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষ করে যৌন নিগ্রহ সম্পর্কিত কিছু অভিযোগ প্রকাশিত হওয়ায় পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারিদের অর্জিত সুনাম ও সম্মান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাছাড়া তাদের সততা, নিষ্টা ও কর্মদক্ষতাও প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। এসব ঘটনা অগ্রহনযোগ্য ও নিন্দনীয়। এই বিব্রতকর পরিস্থিতি মোকাবেলা করে প্রাতিষ্ঠানিক ভাবমূর্তি সংরক্ষণে মন্ত্রণালয় ও মিশনগুলোতে কর্মরতদের সার্বিক সচেতনতা ও ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা অতি জর“রি হয়ে পড়েছে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আচরণবিধিতে বলা হয়, বিদেশে বাংলাদেশ মিশনগুলোতে একের পর শিষ্টাচার বহির্ভূত আচরন বিশেষত যৌন নিগ্রহের ঘটনা প্রকাশ পাওয়ায় বিব্রত পররাষ্ট মন্ত্রনালয়। এই বিব্রতকর পরিস্থিতি মোকাবেলায় মন্ত্রনালয় কঠোর অবস্থান নিয়েছে। মন্ত্রণালয় ও কূটনৈতিক পেশার ভাবমূর্তি রক্ষয় প্রথমবারের মতো এই যৌন হয়রানি বা নিগ্রহের সংজ্ঞা ও ঘটনা পরবর্তী কর্মপদ্ধতি নির্ধারন করে অনুশাসন জারি করা হয়েছে। আচরণবিধিতে বলা হয়েছে, এই অনুশাসনের সুষ্পষ্ট ব্যতয় কর্তৃপক্ষের নিকট হয়রানি বলে গণ্য হবে।

প্রজ্ঞাপনে অনুশাসন প্রদান করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, কর্মক্ষেত্রে বা প্রত্যক্ষ কর্মক্ষেত্রের বাইরে কর্মকর্তা-কর্মচারিদের তাদের সহকর্মীদের নৃতাত্বিক উৎস, শারীরিক বৈশিষ্ট্য, বয়স, লিঙ্গ, ধর্ম বিশ্বাস, বৈবাহিক ও পারিবারিক অবস্থা, যৌনতাসহ অন্যান্য সংবেদনশীল, একাš— ব্যক্তিগত ও গোপণীয় বিষয়ে অপ্রয়োজনীয় বা অনাকাক্সিখত আলোচনা, সমালোচনা, তথ্য বিনিময় বা উপদেশ প্রদান থেকে সর্বতোভাবে বিরত থাকবেন।

পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয় বলেছে, বিশেষত: কোনও কর্মকর্তা-কর্মচারী যদি তার সরকারি ক্ষমতা ও অবস্থানের অপব্যবহার করে বিপরীত বা সমলিঙ্গের সহকর্মীকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যৌনতা সংশি­ষ্ট বিষয়ে অংশগ্রহণের প্রলুব্ধ, প্ররোচিত, আসক্ত বা সন্ত্রস্ত করে তোলেন বা তোলার চেষ্টা করেন বা এমন কিছু করার চেষ্টায় নিমগ্ন বা সম্পৃক্ত আছেন বলে কর্তৃপক্ষের কাছে যুক্তিসংগতভাবে মনে হয় তবে সেটি যৌন হয়রানি বা নিগ্রহ হিসেবে গণ্য হবে।

যদি যৌন হয়রানি বা নিগ্রহের কাজে সক্রিয় কর্মকর্তা-কর্মচারি তার এই অনাকাক্সিখত কর্মকান্ডের সঙ্গে নিগৃহীতের কর্মক্ষেত্রে পদোন্নতি, পদায়ন বা চাকরি সংক্রান্ত অন্য কোনও সুবিধার বিষয়গুলো মিলিয়ে ফেলেন বা নিজের ক্ষমতা ও পদমর্যাদার অপব্যবহার করেন বা উদ্ভুত পরিস্থিতিতে অনৈতিক সুবিধা নিচ্ছেন বা নেয়ার চেষ্টা করছেন বলে প্রতিফলিত হয় তাহলে তা গুরুতর অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। অভিযুক্তের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

অসন্তোষ, নিগ্রহ বা হয়রানির ঘটনা ঘটে গেলে সেক্ষেত্রে পরবর্তী পদক্ষেপের কয়েকটি সুষ্পষ্ট ও কার্যকর নির্দেশনা দিয়েছে মন্ত্রনালয়। প্রথমত, সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি ও অনাকাক্সিখত আচরণকারী কর্মকর্তা-কর্মচারি নিজেদের মধ্যে আলোচনা করবেন। প্রয়োজনের সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি লিখিতভাবে অনাকাক্সিখত আচরণকারী সহকর্মীকে আপত্তির কথা জানাবেন। সরাসরি আলোচনা সম্ভব না হলে বা দূরহ বলে মনে হলে নিগ্রহ বা হয়রানির বিষয়টি প্রমানসহ মিশন প্রধান বা মন্ত্রণালয়ের সংশি­ষ্ট অণুবিভাগের উর্দ্ধতন কর্মকর্তাকে জানাবেন।

এমনকি কোনও কর্মকর্তা-কর্মচারি যদি কোনও সহকর্মীর দ্বারা ভবিষ্যতে নিগৃহীত হতে পারেন এমন যথেষ্ট যুক্তি উপস্থাপন করতে পারেন তাহলেও উর্দ্ধতনকে সঙ্গে সঙ্গে অবহিত করবেন। মিশন প্রধান বা সংশি­ষ্ট অনুবিভাগের উর্দ্ধতন কর্মকর্তাকে জানানো সম্ভব না হলে দ্রুততম সময়ে সরাসরি মন্ত্রণালয়ের প্রশাসন অনুবিভাগের মহাপরিচালককে জানাবেন।

দ্বিতীয় পর্যায়ে, অভিযোগ পাওয়ার পর মিশন প্রধান নিজে উদ্যোগী হয়ে উভয়পক্ষের সঙ্গে বৈঠক করে প্রমাণিত তদন্ত করবেন। প্রাথমিকভাবে মিশনপ্রধান প্রয়োজনীয় পরামর্শ, ভৎর্সনা, অভয় ও অনুশাসনের মাধ্যমে সম্মানজনক ও গ্রহণযোগ্য সমাধানের চেষ্টা করবেন। সম্ভব না হলে বা বিষয়টি গুরুতর বলে মিশন প্রধানের তদন্তে প্রমাণ হলে কালক্ষেপন না করে মহাপরিচালক (প্রশাসন) বা উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে জানাবেন। তৃতীয় পর্যায়ে, অনুশাসনের কোন ব্যতয় ঘটলে এবং অভিযুক্ত ব্যক্তি সরকারি কর্মচারি আচরণ বিধিমালা-১৯৭৯ এর অসদাচরণের দায়ে দোষী হলে তার বিরুদ্ধে সরকারি কর্মচারি শৃঙ্খলা ও আপীল বিধিমালা ১৯৮৫ এর অধীনে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, বিদেশে প্রজাতন্ত্রের প্রতিনিধিত্বকারিরা সহকর্মীদের সঙ্গে সৌজন্য-শিষ্টাচার ও পরিমিতি বজায় রেখে সম্মানের সঙ্গে কর্তব্য পালন করবেন। তাই শিষ্টাচার, সৌজন্য ও পরিমিতি বোধ বিবর্জিত আচরণ, কাজ, প্রকাশ, বাক্য বিনিময় ও অভিব্যক্তি হতে মন্ত্রনালয়ের সব কর্মকর্তা-কর্মচারিকে বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়া হলো।

বিশেষ প্রতিনিধি, ঢাকা
নিউজওয়ার্ল্ডবিডি ডট কম।

আরও পড়ুন