শিক্ষা সচিব নজরুল ইসলাম খানের বিরুদ্ধে অনিয়মের মাধ্যমে প্লট, ফ্ল্যাট, খাসজমি দখলসহ অনিয়মের অভিযোগ করা হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর কাছে ।
অভিযোগে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর আশীর্বাদপুষ্ট হিসেবে নিজেকে পরিচয় দিয়ে শিক্ষা সচিব নজরুল ইসলাম খান প্লট, ফ্ল্যাট, খাসজমি দখলসহ বিভিন্নভাবে প্রভাব বিস্তার করে আছেন। এমনই প্রভাব, এখন তিনি শিক্ষা মন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের নির্দেশনাও মানছেন না। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একটি ঘনিষ্ঠ সুত্র জানিয়েছে, এবারই প্রথম নয়, এর আগে এনআইখানের বিরুদ্ধে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইয়েদ আহমেদ পলকও অভিযোগ করেন। এরপরই তাকে ওই মন্ত্রণালয় থেকে সরিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে আনা হয়।
অভিযোগে বলা হয়, ২০০৯ সালে প্রধানমন্ত্রীর একান্ত সচিব হয়েই ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে সম্প্রসারিত উত্তরা আবাসিক এলাকার ১৭/ডি সেক্টরের ৩ নম্বর সড়কের ৩২ নম্বর তিন কাঠার প্লটটি বদল করে বরাদ্দ নেন ১১ নম্বর সেক্টরের এই পাঁচ কাঠার বাণিজ্যিক প্লট। বরাদ্দ নিয়ে ১১ নম্বর সেক্টরের সেই পাঁচ কাঠার প্লটে তিনি ১০তলার বিশাল বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণ করেন। এর তিনটি বিক্রি করে দেন মিসেস সাবরিনা বারীর কাছে। তবে ১০টি ফ্লোরই অটবির কাছে ভাড়া দেওয়া আছে।
এদিকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জোট সরকারের আমলে ২০০৩ সালের ২৯ ডিসেম্বর এন আই খান সম্প্রসারিত উত্তরা আবাসিক এলাকায় ১৭/ডি সেক্টরের ৩ নম্বর সড়কে তিন কাঠা আয়তনের ৩২ নম্বর প্লটটি পেয়েছিলেন। তিনি এই প্লটের বিপরীতে দুটি কিস্তির টাকা পরিশোধও করেন এবং বরাদ্দপত্র নেন। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার দুই সপ্তাহের মধ্যেই ২০০৯ সালের ১৯ জানুয়ারি তিনি ওই তিন কাঠা প্লটটির পরিবর্তে তৎক্ষনাত বাড়ি করার উপযোগী উত্তরা আবাসিক এলাকার ১১ নম্বর সেক্টরের সোনারগাঁও জনপথ ১০০ ফুট প্রশস্ত রাস্তার পাশে পাঁচ কাঠার ৩৪ নম্বর প্লটটি তার নামে বরাদ্দ দেওয়ার জন্য অনুরোধ করেন।
অভিযোগে আরো বলা হয়, এন আই খান উত্তরা ১১ নম্বর সেক্টরের সোনারগাঁও জনপথ সড়কের ৩৪ নম্বরের যে প্লটটি নিয়েছেন, সেটিসহ ১০০ ফুট রাস্তার উভয় পাশের প্লটগুলো রাজউকের পূর্ব অনুমোদিত লে-আউট নকশা অনুযায়ী বাণিজ্যিক হিসেবে চিহ্নিত ছিল। পরবর্তী সময়ে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে জারিকৃত পত্রের নির্দেশনার মাধ্যমে লে-আউট প্ল্যানটি আংশিক সংশোধন করে একটি নির্দিষ্ট বলয়কে আবাসিক প্লটে রূপান্তরিত করা হয়। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী রাজউকের নগর পরিকল্পনা শাখা লে-আউট নকশায় সোনারগাঁও জনপথ সড়কের ৩০ থেকে ৪০ নম্বর পর্যন্ত মোট ১১টি প্লটকে আবাসিক হিসেবে রূপান্তরিত করে।
উত্তরার বাড়িটির বর্ণনা দিয়ে বলা হয়, উত্তরার ১১ নম্বর সেক্টরের সোনারগাঁও জনপথ সড়কের ৩৪ নম্বরের ১০ তলা ভবনের দিকে চোখ পড়লেই কিছুক্ষণের জন্য হলেও থামতে ইচ্ছা করবে নগর জীবনের যেকোনো কর্মব্যস্ত মানুষকে। একটু চোখ জুড়িয়ে নেবেন নাগরিকরা।
এতো চমৎকার ভবনটি কার? জিজ্ঞেস করতেই বাড়ির কেয়ারটেকার বলবেন, এটি বর্তমান শিক্ষা সচিব এন আই খান সাহেবের বিল্ডিং। পুরোটাই অটোবির কাছে ভাড়া দেওয়া। এন আই খান ক্ষমতার দাপটে শুধু এই ভবনটিই করেননি, তিনি অনৈতিকভাবে আরও অনেক সম্পদ করেছেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব থাকাকালে। এখনো করছেন।
সব সময় মুখে তিনি নীতি বাক্য আওড়ান আর ভেতরে ভেতরে নিজেই অনিয়ম করে সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলেছেন। এই ১০ তলা ভবন ছাড়াও তার ঢাকার অভিজাত এলাকায় ৬টি ফ্ল্যাট, খাসজমির উপর ৪ ইউনিটের একটি বাড়ি, লালমাটিয়ায় কর্মকর্তাদের জন্য বরাদ্দকৃত আবাসিক একটি ফ্ল্যাটসহ নামে বেনামে আরও কিছু খাস জমি দখল করেছেন।
এছাড়া লালমাটিয়ার সরকারি ফ্ল্যাটে তিনি নিজের মতো ডেকোরেশন করে ভাড়া দিয়েছেন। সরকারি চাকরি বিধিতে স্পষ্ট বলা হয়েছে, সরকারী কর্মকর্তা কর্মচারীদের জন্য বরাদ্দকৃত ফ্ল্যাটগুলোতে নিজেদেরই থাকতে হবে। না হয় সেগুলো বাতিলা হয়ে যাবে।
একজন কর্মকর্তা একটি প্লট অথবা ফ্ল্যাট পাবেন। দুটোই নিতে পারেন না। আর খাস জমির বিষয়ে বলা হয়েছে, গৃহহীন এবং ভ‚মিহীনরাই কেবল খাস জমি পেতে পারেন। কিন্তু এন আই খান কিভাবে এতো কিছু থাকার পরও গৃহহীনদের জমি নিয়ে ভবন তৈরি করলেন তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সূত্র জানায়, এর আগে ঢাকা জেলার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক থাকার সুবাদে মোহাম্মদপুর কাটাসুরে সরকারি খাসজমি বরাদ্দ নিয়ে ৪ ইউনিটের একটি ফ্ল্যাট নির্মাণ করেন। তবে এই জমিটি তিনি কৌশলে তার দুই ভাই হাফিজুর রহমান ও শাহরিয়ার কবির কাবিলের নামে নিয়েছেন। একইভাবে আইনের ম্যারপ্যাচ করে এন আই খান জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ থেকে লালমাটিয়ার একটি ফ্ল্যাট বাগিয়ে নেন।
এখানেই শেষ নয়, তিনি ক্ষমতার দাপটে মন্ত্রীদের নামের ইয়ারমার্ক করা মিন্টু রোডের সরকারী বাসভবনে অবস্থান করছে। অথচ এখনো বর্তমান সরকারের অনেক মন্ত্রীই আবাসন সুবিধা পাচ্ছেন না।
তথ্য ও প্রযুক্তি মন্ত্রনালয়ের একটি বিশেষ সূত্র জানিয়েছে, বর্তমান সরকারের শুরুতেই তাকে এই মন্ত্রণালয়ের সচিব করা হয়। কিন্তু সেখানেও তিনি অনিয়ম ও অনৈতিক কাজ করার পায়তারা করলে প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ হোসেন পলকের সঙ্গে মতবিরোধ দেখা দেয়।
এরপর আগের শিক্ষা সচিব অবসের যাওয়ার পর তাকে গত বছরের সেপ্টেম্বরে শিক্ষা সচিব হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
অভিযোগে আরো বলা হয়, বর্তমানে শিক্ষা সচিব হিসেবে যোগ দিয়েই তিনি প্রভাব বিস্তার করে চলেছেন। তার সমস্ত অনৈতিক কাজের সহকারি মনিরুল ইসলাম মিলনকে ব্যাক্তিগত কর্মকর্তা (পিও) হিসেবে তার সঙ্গে যুক্তকরার আদেশ দেন। তাকে দিয়ে মন্ত্রণালয়ের পদোন্নতি ও বদলী বানিজ্য করানোই লক্ষ্য ।
এ ব্যাপারে বক্তব্য জানতে নজরুল ইসলাম খানকে তার দুটি মোবাইলে যোগাযোগ করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।
নিউজওয়ার্ল্ডবিডি ডট কম।


