ছিটমহল বিনিময় সমন্বয় কমিটির নেতা হিসেবে মফিজার রহমান নিজ স্বার্থ চরিতার্থ করার কাজ করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এতোদিন এই নিয়ে কথা না বললেও এখন ছিটমহলগুলো স্ব স্ব দেশের অন্তর্ভূক্ত হওয়ার পর এখন অনেকেই মফিজার রহমান সহ অন্য আরও কয়েকজনের ব্যাপারে সরব হয়েছে।
মফিজার রহমান। বাংলাদেশ-ভারত ছিটমহল বিনিময় সমন্বয় কমিটির পঞ্চগড় ও নীলফামারী জেলার সভাপতি। এই কমিটির ব্যানারে আন্দোলন করে দীর্ঘ ৬৮ বছর নিজ ভূমে পরবাসী থাকার পর ১৬২টি ছিটমহলের ৫০ হাজারেরও বেশি মানুষ বাংলাদেশ ও ভারতের নাগরিকত্ব পেয়েছেন।
কিন্তু, মফিজার রহমান কিভাবে ছিটমহলের নেতা হলেন-তিনি ছিটমহলের বাসিন্দা কিনা-এ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে সংশ্লিষ্ট মহলে। পঞ্চগড় সদর উপজেলার হাঁড়িভাষা ইউনিয়নের ইয়ারপাড়া গ্রামের ফজলুল হক প্রধানের ৬ ছেলে ও ৩ মেয়ের মধ্যে মফিজার রহমান অন্যতম। জম্ম সূত্রে তারা সবাই বাংলাদেশের নাগরিক; তবে, ২০০৯ সাল থেকে মফিজার রহমান হঠাৎই বনে যান পাশের গাড়াতি ছিটমহলের চেয়ারম্যান বা ত্রাণকর্তা।
গাড়াতি ছিটমহলের বাসিন্দাদের অভিযোগ, মফিজারের দ্বিতীয় ভাই জেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক (বর্তমানে যুগ্ম আহ্বায়ক) মোখলেছার রহমানের ক্ষমতার দাপটেই অবৈধভাবে তিনি চেয়ারম্যান সেজেছেন। মফিজার ও তার বাবাসহ অন্য ৫ ভাইয়ের নাম বাংলাদেশের মূল ভূখণ্ড পঞ্চগড় পৌরসভা ও ইয়ারপাড়া গ্রামের ভোটার তালিকায় রয়েছে। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর গাড়াতি ছিটমহলের কর্তৃত্ব নেন মফিজার রহমান। ছিটহলের বাসিন্দা না হয়েও নিজেকে ছিটমহলের চেয়ারম্যান দাবি করে গড়ে তোলেন নিজস্ব বলয় ও গ্রুপ।
গাড়াতি ছিটমহলের আরেক চেয়ারম্যান দাবিদার আব্দুল লতিফ সরকার। নিজেকে বৈধ চেয়ারম্যান দাবি করে দ্য রিপোরর্টের এই প্রতিবেদককে এর পক্ষে একটি চিঠিও দেখান। গাড়াতি ছিটমহলের চেয়ারম্যান (সভাপতি) বৃদ্ধ মুজিবুর রহমান মারা যাওয়ার পর ছিটমহলের স্থায়ী বাসিন্দাদের মধ্য থেকে গণমান্য ব্যক্তিদের সমন্বয়ে আব্দুল লতিফ সরকারকে চেয়ারম্যান করে ২০১০ সালের ১৬ এপ্রিল ২১ সদস্যের গাড়াতি ছিটমহল সর্বমঙ্গল কমিটি গঠন করা হয়। ২০১০ সালের ৪ মে পঞ্চগড় সদর উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান কাজল রেখা গাড়াতি ছিটমহলের চেয়ারম্যান মরহুম মুজিবুর রহমানের ছেলে খাজা মঈন উদ্দিনকে ছিটমহলের যাবতীয় কাগজপত্র নতুন চেয়ারম্যান আব্দুল লতিফ সরকারকে বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য আদেশ দেন।
তবে, মফিজার রহমানও নিজেকে ছিটমহলের চেয়ারম্যান আখ্যা দিয়ে প্রভাব খাটিয়ে ছিটমহলের বাসিন্দাদের নিয়ে নিজস্ব গ্রুপ তৈরি করেন। এ নিয়ে ওই সময় থেকেই অস্থিরতা চলতে থাকে। মারামারি, খুনাখুনি থেকে বহু ঘটনার সূত্রপাত হয় এ নিয়ে। তবে, পুরো ছিটমহলের নিয়ন্ত্রণ নিতে বেশি দিন লাগেনি মফিজার রহমানের।
মফিজার রহমান বাংলাদেশের ভূখন্ডের নাগরিক হওয়া সত্ত্বেও পার্শ্ববর্তী (বাড়ি সংলগ্ন) গাড়াতি ছিটমহলের বাসিন্দা হিসেবে ২০১১ সালের জনগণনার তালিকায় নিজের নাম লিখান। এ তালিকায় তিনি ছাড়া তার পরিবারের আর কেউ নেই।
ছিটমহলের নাগরিক না হয়েও জনগণনায় মফিজারের নাম তালিকাভুক্ত হওয়া এবং তার চেয়ারম্যান দাবি করার প্রেক্ষিতে আনছার আলীসহ ছিটমহলের বেশ কিছু মানুষ নাম বাদ দেওয়ার জন্য জেলা প্রশাসক বরাবর আবেদন করেন। কিন্তু, কোনো কাজ হয়নি। অল্প সময়ের মধ্যেই মফিজারের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয় গাড়াতি ছিটমহলে। শুধু গাড়াতি ছিটমহলের চেয়ারম্যানই নয়, এরই মধ্যে মফিজার রহমান বাংলাদেশ-ভারত ছিটমহল বিনিময় সমন্বয় কমিটির সমগ্র পঞ্চগড় ও নীলফামারী জেলার সভাপতিও বনে যান।
মফিজারের বাবা ফজলুর রহমান প্রধান বলেন, ১৯৪৭ সালে ভারত-পাকিস্তান সৃষ্টি হলে আমরা ভারতের হলদিবাড়ি থেকে পাকিস্তান (বর্তমানে বাংলাদেশ) অংশে চলে আসি। আমার জম্ম ভারতে হলেও ১৯৪৭ সালের পর থেকেই প্রথমে পাকিস্তানের নাগরিক এবং ১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে ইয়ারপাড়া গ্রামে বসবাস করছি।আমার ৬ ছেলে ও ৩ মেয়ে এখানেই (ইয়ারপাড়া) জম্মগ্রহণ করেছে। তারা সবাই বাংলাদেশের নাগরিক।
ইয়ারপাড়া গ্রামের শেষ সীমানায় গাড়াতি ছিটমহল লাগোয়া ফজলুর রহমানের বাড়ি। বাড়ির সীমানা পেরুলেই গাড়াতির জমি। বাড়ির সামনের জমির একটিতে ধান চাষ করেছেন তিনি। অন্য জমিতে চারচালা একটি টিনের ঘর এবং খড়ের পালা। যেখানে গরু বাছুরও রাখা হয়েছে।
ওই ঘরটি কার জানতে চাইলে ফজলুর রহমান বলেন, ওটা মফিজারের। ওখানে ছিটমহলের জমি রেজিস্ট্রি হয়। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি আসার পর জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
ছিটমহলে লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, চারচালা ওই ঘরটিকেই মফিজার তার বাড়ি হিসেবে দেখিয়ে ২০১১ সালে ছিটমহলের বাসিন্দা হিসেবে জনগণনায় নাম তুলেছেন।
মফিজারের বিরুদ্ধে জবরদস্তির অভিযোগও কম নয়। যদিও এখন প্রকাশ্যে কেউ আর মুখ খুলতে চান না। আনছার আলী নামে ছিটমহলের বাসিন্দা দ্য রিপোর্টকে বলেন, মফিজারের লোকজন আমাকে হত্যা করার জন্য বহুবার চেষ্টা করেছিল। সর্বশেষ আমাকে তারা অপহরণও করেছিল। পঞ্চগড় জেলা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার হস্তক্ষেপে তাদের হাত থেকে পুলিশ আমাকে উদ্ধার করে। জীবননাশের হুমকি থাকায় আমি এখন পৌর শহরেই থাকি।
গাড়াতি ছিটমহলের বাসিন্দা আমিরুল ইসলাম বলেন, ৫ বছর আগে রমজান নামে এক বাংলাদেশীকে হত্যা করে ছিটমহলের মধ্যে রেখে আমাদের ওপর দোষ চাপিয়ে দেওয়া হয়। ছিটমহলের বাসিন্দারা এর প্রতিবাদে বিক্ষোভ করেন। এ সময় পরিকল্পিতভাবে ১৫-২০টি বাড়িতে আগুন দেয় ওই কুচক্রীমহল। আর এ জন্য আমিসহ ৬০-৭০ জনকে আসামি করা হয়। এর পেছনে কলকাঠি নাড়েন মফিজার রহমান।
তিনি বলেন, ‘আমার ১৪ বিঘা জমি আছে। ওই জমির ফসল নষ্ট করা হয়, জমির আইলের গাছ কেটে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু ছিটমহলের বাসিন্দা বলে আমাদের নামে মামলা হলেও আমাদের মামলা থানা পুলিশ নেয় না (১ আগস্টের আগ পর্যন্ত)। শেষ পর্যন্ত আমাদের মধ্য থেকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব আছে এমন একজনকে দিয়ে মফিজারসহ অন্যদের বিরুদ্ধে কোর্টে মামলা করিয়েছিলাম। কিন্তু ফলাফল শূন্য।কারণ তারা তো অনেক প্রভাবশালী।
জন্ম সূত্রে বাংলাদেশী হওয়া সত্ত্বেও কীভাবে ছিটমহলের নাগরিক হলেন-জানতে চাইলে মফিজার রহমান বলেন, ‘ছিটমহলের ৮০-৮৫ ভাগ হলেন বাইরের লোক। আব্বা হচ্ছেন ভারতের জলপাইগুড়ির বাসিন্দা। রংপুরে তিনি লেখাপড়া করা অবস্থায় ভারত-পাকিস্তান সৃষ্টির সময় বাংলাদেশ অংশে চলে আসেন। তিনি গাড়াতি ছিটমহলেই বাড়ি করেছিলেন প্রথম দিকে, কিন্তু ডাকাতি হওয়ার কারণে তিনি বাংলাদেশের অংশে বাড়ি করেন। পরে ভাইগুলো বড় হওয়ার পরে ছিটেও বাড়ি করি, বাংলাদেশেও করি। আমাদের তিন ভাই পঞ্চগড় শহরে থাকেন।
বাড়ির সামনে চারচালা টিনের ঘর দেখিয়েই তো আপনি ২০১১ সালের জনগণনায় ছিটমহলের বাসিন্দা হিসেবে নাম তুলেছেন-জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ-তখন ওখানেই ছিলাম। সমস্যার কারণে পরে বাংলাদেশ অংশে বাড়ি করি।
বড় ভাই ক্ষমতাসীন দলের নেতা-এ সুবাদেই জনগণনায় নাম তুলেছেন এবং ছিটমহলের নেতা হয়েছেন- এমন অভিযোগ প্রসঙ্গে মফিজার রহমান বলেন, ‘বড় ভাই আওয়ামী লীগের নেতা বা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সম্পর্ক আছে-এজন্যই ২০১১ সালে জনগণনায় নাম উঠেছে এমন নয়। ওই সময় যারা বাড়িতে ছিলেন তাদের নামই কেবল ভারতের কর্তৃপক্ষ হেডকাউন্টিং করেছেন। ছিটমহলের বাসিন্দা, কিন্তু বাড়িতে ছিলেন না- ঢাকায়, পঞ্চগড়, হাসপাতালে কিংবা মাঠে ছিলেন তাদের নাম তালিকা ওঠেনি।’ তবে ক্ষমতার দাপটে চেয়ারম্যান হওয়ার বিষয়টি এড়িয়ে যান তিনি।
শুধু মফিজার রহমান নন, পঞ্চগড় জেলার দেবীগঞ্জ উপজেলার কোর্ট ভাজনী ছিটমহলের চেয়ারম্যান আলতাফ হোসেনও জন্মসূত্রে নাগরিক এবং ২০১১ সালে ছিটমহলের বাসিন্দা হিসেবে নাম লিখিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে এ ব্যাপারে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
নিউজওয়ার্ল্ডবিডি ডট কম।


