বুধবার ৪ নভেম্বর ২০২৬

সুইডেনের ভবঘুরেরা এখন বাংলাদেশে

Sweedish_at_Dhakaকয়েদিন আগে পরিচয় হল এমন এক সুইডিশের সঙ্গে সঙ্গে, যিনি ইউরোপের ছন্নছাড়া পর্যটকদের কিংবা সহজ ইংরেজিতে যাদের ‘ব্যাকপ্যাকার্স’ বলা হয় তাদেরই ‘আধ্যাত্মিক গুরু’, এক কথায় পথিকৃত। তবে বাংলাদেশের পর্যটনের সঙ্গে তিনি কীভাবে যুক্ত হলেন। প্রশ্নের জবাব মিলে গাইড ট্যুরসের শীতলক্ষ্যা নদীতে থাকা পর্যটন জাহাজ রুপসীতে উঠবার পর।

ভদ্রলোকের নাম ক্রিশ্চিয়ান জুতভিক। সুইডেনে তার ‘লাস ওক রেস’ নামে একটি ‘ট্যুর অপারেটর’ কোম্পানি আছে, যেটি কিনা হিপ্পি ইউরোপিয়ানদের নিয়ে দেশে বিদেশে ঘুরে বেড়ায়। যেহেতু হিপ্পিরা তার ব্যবসার মূল ভিত্তি, সুতরাং এশিয়া আর আফ্রিকার ‘পর্যটকদের কাছে অপরিচিত’ দেশগুলোতেই যাতায়াত বেশি জুতভিকের।

তবে তার প্রথম বাংলাদেশ সফরের ঘটনাটা অবশ্য কোনো পর্যটক দলের সঙ্গে নয়, বরং সুইডিশ ডেভেলাপমেন্ট এজেন্সি-সিডার’এর চাকরি নিয়ে। ১৯৭৭ সালে বঙ্গীয় ব-দ্বীপে প্রথম পা পরে এই স্ক্যান্ডানেভিয়ানের। তবে তখনও পর্যটন শিল্পের সঙ্গে যুক্ত নন হাসান মনসুর। বিএডিসি’র সহকারী ব্যবস্থাপনার কাজ আর পাশাপাশি মালিবাগ রেললাইনের পাশে ভাইদের মিলে গড়ে তোলা গাড়ির যন্ত্রাংশের দোকান চালিয়েই জীবন কাটাচ্ছেন তিনি। প্লেনে করে ঠাকুরগাঁও যাওয়ার পথে পরিচয় হয় এই দুই প্রান্তিক মহীরুহ’র।

এর আগে ‘হিচ হাইকিং’ বা রাস্তায় গাড়ির পর গাড়ি পাল্টিয়ে, পশ্চিমা সংস্কৃতিতে প্রচলিত ‘লিফট’ নিয়ে নিয়ে সুইডেন থেকে তুরষ্ক, ইরান হয়ে নেপাল এসেছেন তিনি। ভারত ঘুরে গেছেন ১৯৬৯ সালে। নিজের বোহামিয়ান জীবনের অভিজ্ঞতা আর ব্যক্তিগত জীবনের নানান খুঁটিনাটি গল্প করেই হয়তো ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠেছিলেন হাসান মনসুরের। উড়োজাহাজ ভ্রমণের সঙ্গী হওয়ার কিছুদিনের মাঝেই, ধীরে ধীরে পেশাগত জীবনেও একে অপরের বন্ধু হয়ে ওঠেন দুজন।

তখনও পর্যটনের অ আ ক খ জানা হয়নি হাসান মনসুরের। তবে এরই মাঝে ভারত নেপাল ঘুরানোর জন্য পর্যটকদের নিয়ে আসেন অথবা ব্যবস্থা করে দেন জুতভিক। বন্ধুতবের জায়গা থেকে একে অপরকে এমন নানান কাজে সহযোগিতা করতে গিয়েই হয়ত পর্যটনের নেশায় পেয়ে বসে হাসান মনসুরকে। দুজনের পরিচয়ের কয়েক বছরের মাঝেই নিজের প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন হাসান মনসুর। বন্ধুর দেখানো পথে অগত্য যাত্রা শুরু করেছিলেন হাসান মনসুর, যা আজ পথ দেখাচ্ছে হাজারো মানুষকে।

যখন দুই বন্ধু কিংবা আদতে দুই দেশের দুই প্রতিনিধির এই যুগপত যাত্রার গল্প শুনছি, ততক্ষণে গাইড ট্যুরসের রুপসী জাহাজ আমাদের শীতলক্ষ্যার রূপ দেখাতে শুরু করেছে। ঠিক মাঝ বিকেলে জাহাজে উঠেছিলাম কড়কড়ে রোদের মাঝে। তবে দুই এক ঘণ্টার মাঝেই ঝড়-বৃষ্টি স্বাগত জানালো আমাদের। ঈশ্বরের বাণী পৌঁছে দিতে জাহাজের আশপাশে শুশুকের আনাগোনা বাড়তে লাগলো। দেশের ভিতরেও এক না দেখা দেশ কিংবা নদীর মাঝেও এক রুপসী তণ্বীর দুয়ার যেন খুলে দিল।

আড্ডা চলছিলো জুতভিকের সঙ্গে। ও হ্যাঁ যাত্রায় আমাদের সঙ্গী ছিলেন জুতভিকের অর্ধাঙ্গী বোয়েল হেগেনব্লাড, হাসান মনসুর পরিবারের সদস্য সৌরভ মনসুর, এলিজাবেথ মনসুর ও তার দুই সন্তান, এই প্রতিবেদক ছাড়াও আরও তিনজন সাংবাদিক ও জাহাজের তিন কর্মী।

কথা প্রসঙ্গে জুতভিক জানালেন সুইডেনের পর্যটকেরা মূলত আয়েশি ভ্রমণ পছন্দ করেন, তাই তার সঙ্গে ঘুরতে আসা পর্যটকদের সঙ্গে গড়পড়তা সুইডিশ পর্যটকদের মেলালে ভুল হবে। আর জুতভিকের ভ্রমণ অভিজ্ঞতা জিজ্ঞেস করতে উত্তর এলো এভাবে,

“যদি খুব ভুল না করি, ভারতে আমি এসেছি প্রায় ৬০ বারের মতো। এমন সব জায়গায় গিয়েছি, যেখানে ভারতীয়রাই যেতে খুব একটা স্বচ্ছন্দ্যবোধ করেন না। এখানে-ওখানে, গলি-ঘুপচিতে ঘুরে বেরিয়েছি, মিশেছি মানুষের সঙ্গে। আসলে এগুলোই সাহায্য করেছে আমার ব্যবসার প্রসারে। কারণ আমি নিজে না দেখলে, গেলে; অন্যদের সেখানে নিয়ে যেতে পারতাম না। আর এটা মানতেই হবে, এশিয়ার এ অঞ্চলে মানুষ (ইউরোপিয়ানরা) এইসব অভিজ্ঞতার জন্যই ঘুরতে আসে। কারণ সমুদ্র সৈকত, দামি খাবার অথবা ধরুন খুবই আধুনিক ও সাজানো গোছানো সুযোগ-সুবিধা যে এখানে পাওয়া যাবে না, এটা পর্যটক মাত্রই জানে।”

দুই একটা উত্তর পেয়েই সাহস বেড়ে গেল। জিজ্ঞেস করলাম বাংলাদেশে এসেছেন ক’বার এ পর্যন্ত?

“আমি বাংলাদেশে কবার এসেছি কিংবা কোথায় কোথায় গিয়েছি এরকম প্রশ্নের উত্তর দেওয়াটা আমার জন্য একটু কষ্টকর। তবে এটা বলতে পারি এখানে দু’বছর ছিলাম। আর একটা অভিজ্ঞতার কথা বলতেই পারি।

তিনি বলতে থাকলেন, “১৯৭৭-৭৮ সালের দিকে। হাতি দেখবার উদ্দেশ্যে আমি টেকনাফের ওই বড় বনে (সম্ভবত বর্তমান গেম রিজার্ভ) যাই। বন বিভাগের কর্মীরা আমাকে ভিতরে যেতে দিতে চাইছিলো না। তারা বলছিল, হাতি বিপদের কারণ হতে পারে। এছাড়া, ওই এলাকার ভিতরে বসবাসরত চাকমাদেরও (সম্ভবত রাখাইন) তারা খুব এটা বিশ্বাস করতে পারে না। আমি তো একজন শেতাঙ্গ। সে যাই হোক, আমি কোনোভাবে বনের ভিতরে ঢুকে, হাঁটতে হাঁটতে এক চাকমা (রাখাইন) গ্রামে হাজির হলাম। তাদের অতিথেয়তায় আমি অবাক হলাম এই ভেবে যে, এত সুন্দর এই মানুষগুলো নিয়েই বনবিভাগের কর্মীরা সন্দেহ করছিল। যাই হোক, আমি তাদের জানালাম, হাতি দেখাই আমার মূল উদ্দেশ্য। জানা গেলো ব্যাপারটার মধ্য একটু ঝুঁকি থাকলেও, তারা এ ব্যাপারে সাহায্য করতে পারবে। গ্রামের দুই জন পুরুষ আমার সঙ্গে ভিতরে যাওয়ার জন্য রাজি হল। আমি ওদের সঙ্গে এগিয়ে গেলাম আরও ভিতরে। একদিন পর হঠাৎই উপত্যকার মতো একটা জায়গায় দূর থেকে হাতির পাল আসবার মতো, ধুলা উড়তে দেখলাম আমরা।

ঠিকঠাক মতো জায়গা নিয়ে দাঁড়ালাম। ক্যামেরা নিজের হাতে রেখে বাকি সব আমার দুই সঙ্গীর কাছে রাখলাম। হাতির পাল কাছে  আসবার সঙ্গে সঙ্গে তারা আমাকে সরে আসতে বলল। আমাদের একদিকে খাড়া পাহাড় নিচে নেমে একটা নদীতে মিশেছে। আর আরেকদিকে ঘন জঙ্গল। আমি কিছু ছবি তুললাম। এরই মাঝে আমার যেন মনে হল, একটা হাতির সঙ্গে আমার চোখাচোখি হচ্ছে; এ এক অন্যরকম অভিজ্ঞতা।  এর কিছুক্ষণের মাঝেই দেখলাম ওই হাতিটিই আমার দিকে এগিয়ে আসছে। আমারও এখন আর নিরাপদে সরে যাওয়ার তেমন কোনো সুযোগ নেই। আমি বাঁচবার জন্য পাহাড়ের ঢালে শরীর ছেড়ে দিলাম। আর চিকার করে আমার অন্য দুই সঙ্গীকে নিরাপদে সরে যেতে বলছিলাম। জানি না আদৌ তারা শুনেছিল কিনা। তবে অনেকখানি গড়িয়ে নদীতে পড়বার ঠিক আগ মূহুর্তে ক্যামেরাটা আমি নদীর পাড়ে ছুড়ে ফেলতে পেরেছিলাম। মনে নেই ঠিক কতক্ষণ নদীতে ছিলাম। পরে সেখান থেকে উঠে আমার দুই সঙ্গীর একজনকেও পেলাম না। অবশ্য আমার যে খুব দুঃশ্চিন্তা হচ্ছিলো এমনটাও না। ক্যামেরা নিয়ে, অনেকটা নিজের চোখের উপর ভরসা করে, আমি ফিরতি পথ ধরে সেই গ্রামে ফিরলাম আরও একদিন পর। অবশ্য ফেরবার পর টাকা থেকে শুরু করে পরনের সব কাপড় সেখানে শুকাতে দিতে হয়েছিল যা খুবই হাস্যকর ছিল। আর সেখান থেকে ফিরবার পথে বন বিভাগের কর্মীদের সঙ্গে আবারও দেখা হল। আমি অবশ্য জানাতে ভুল করিনি যে, আমি সেই চাকমাদের (রাখাইন) সঙ্গে করেই হাতি দেখে ফিরছি।”

নিজের কথাতেই আসলে প্রমাণ দিয়ে যাচ্ছিলেন জুতভিক যে, আসলে কেনো তিনি হাসান মনসুরকে অনুপ্রাণিত করতে পেরেছিলেন। অজানা সম্পর্কে অন্যকে জানাতে হলে, সেই অজানার রহস্য আগে ভেদ করতে হয়, সেটা মনে হয় নিজের জীবনযাপন দিয়েই প্রমাণ করে দিয়েছেন জুতভিক। মানুষকে ঘুরবার অনুপ্রেরণা দেওয়ার পাশাপাশি নিজেও ঘুরে বেড়িয়েছেন, মিশেছেন মানুষের সঙ্গে, পেয়েছেন অদ্ভুত সব বন্ধুতা, অভিজ্ঞতার থলিতে পুরেছেন হাজারও গল্প।

ফিরে গেলাম তার সহধর্মিনীর কাছে। বরাবরই এত মানুষের মধ্যমণি হয়ে থাকেন জুতভিক, কেমন লাগে তার এই আপাত নিঃসঙ্গতা, নারী হিসেবে পুরুষতান্ত্রিক এই সমাজের ‘উন্নত বিশ্বের’ মানুষ হিসেবে কতটা উপভোগ্য এই জীবন।

তিনি বলেন, “আমি তো মানুষ নিয়েই কাজ করি। সুইডেনের একটি টেলিকমিউনিকেশন প্রতিষ্ঠানের ‘হিউম্যান রিসোর্স’ কর্মকর্তা হিসেবে আমার মূলত মানুষকেই জানতে হয়। সুতরাং জুতভিকের সঙ্গে ঘুরবার সময়টায় যখন সবাই ওকে নিয়ে ব্যস্ত থাকে সে সময়টা বরং আমি উপভোগ করি। এত মানুষের মাঝেও আমি যে একা থাকতে পারি এটা বরং আমার মানুষকে দেখতে, বুঝতে সাহায্য করে। মানুষের মাঝে আমি জুতভিককে দেখতে পাই।”

তার এই উত্তরের পর আসলে আগে বাড়বার সাহস হচ্ছিলো না। বরং ইচ্ছে হচ্ছিলো ছোট্ট ওই জাহাজে তাকে আরও একাকিত্ব উপহার দেওয়ার। তাই জুতভিককে বুঝতে চাইলাম।

জানতে পারলাম বাংলায় তার পছন্দের গান ‘প্রথম বাংলাদেশ আমার শেষ বাংলাদেশ’। অল্প অল্প জানা বাংলায় তার বহুল ব্যবহৃত শব্দ ‘সর্বনাশ’। এছাড়া পছন্দ করেন পালতোলা নৌকা, যা দেখতে না পেয়ে একটু হতাশই হলেন এ যাত্রায়। তবে খুব আগ্রহ ছিল তার আইডলদের (নায়ক) চিনবার। প্রস্তুত হচ্ছিলাম পরিচিত কোনো নাম শুনবার। তবে ভাষার বৈতরনী পেরিয়ে মনে রাখা গেল না নাম দুটো। কারণ, তার জীবনের দুই অনুপ্রেরণার একজন পরিব্রাজক, যিনি হেঁটে সুইডেন থেকে চীন পর্যন্ত এসেছিলেন, সেও অনেক আগের কথা। আর আরেকজন সুইডিশ বনবিভাগের কর্মী, তাও আবার ইন্দোনেশিয়ায় কর্মরত।

এমন গল্পে গল্পেই কাটে বেলা। শীতলক্ষ্যায় কাঞ্চন ব্রিজ থেকে শুরু করে ডেমরা ঘটে এসে শেষ হয় আমাদের যাত্রা। সন্ধ্যার আঁধারে পাড়ের ছোট দোকানগুলোতে জ্বলতে থাকা টাংস্টেন বাল্বের আলোয় আমাদের গল্প ফুরায়। জানি না প্রথমবার হাসান মনসুরের সঙ্গে যাওয়া সুন্দরবনের সেই অভিজ্ঞতার মতো আর কোনো অভিজ্ঞতা তার অন্য কোথাও অন্য কোন দেশে হয়েছিলো কি না।

তবে সেই অভিজ্ঞতাকে মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত করতে চান হাসান মনসুর। তাই হয়ত সবার সামনেই নিজের অভিপ্রায়ের কথা জানিয়ে রাখলেন তিনি।

জানালেন ২০১৭’তে, সেই যাত্রার অর্ধশত বার্ষিকীতে আবারও জুতভিককে নিয়ে ‘বাদা’য় যেতে চান তিনি। নিমন্ত্রণ জানালেন উপস্থিত সবাইকে। হতে পারে সেটিও বাংলাদেশের পর্যটন শিল্প বিকাশে আর বড় কোনো পরিবর্তন নিয়ে আসতে পারে। মনের মাঝে অমলিন স্মৃতির পাতায়, তাই সঙ্গে সঙ্গে নিমন্ত্রণটা টুকে নিয়ে সুন্দরী শীতলক্ষ্যা আর বাংলাদেশ অন্তপ্রাণ এক ভবঘুরেকে বিদায় জানালাম।

সৌজন্যে: বিডিনিউজ
নিউজওয়ার্ল্ডবিডি ডট কম।

আরও পড়ুন