দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) পাশাপাশি অর্থ পাচার বিষয়ে তদন্ত এবং মামলা করার একক কর্তৃত্বও হারিয়েছে সংস্থাটি। প্রতারণা, আত্মসাৎ ও জালিয়াতির মামলার তদন্তভার সরাসরি পুলিশের এখতিয়ারে রেখে নীতিগত অনুমোদন দেওয়া আইনের খসড়াটির চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। সোমবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে ‘দুর্নীতি দমন কমিশন (সংশোধন) আইন- ২০১৫’ (দুদক আইন) খসড়ার চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়। এর আগে গত সোমবার (১০ আগস্ট) আইনটির নীতিগত অনুমোদন দিয়েছিল মন্ত্রিসভা।
বিদ্যমান ‘মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২’তে দুদককে এককভাবে এ দায়িত্ব দেয়া রয়েছে। ওই আইন সংশোধন হলে দুদকের পাশাপাশি পুলিশ ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) অর্থ পাচার মামলা তদন্ত করতে পারবে। তবে শর্ত রয়েছে যে, পুলিশ বা এনবিআরের তদন্তাধীন যেকোনো অর্থ পাচার মামলা ইচ্ছা করলে দুদক নিজেদের হাতে নিয়ে পুনর্তদন্ত করতে পারবে।
জানা গেছে, মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন সংশোধন নিয়ে গত বছর পুলিশ ও দুদকের মধ্যে দ্বন্দ্ব শুরু হয়। পুলিশের পক্ষ হয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আলোচিত আইনটি সংশোধন করে অর্থ পাচার বিষয়ে তদন্ত, গ্রেফতার ও মামলা করার ক্ষমতা দুদকের পাশাপাশি পুলিশের হাতে দেয়ার দাবি জানায়। এ বিষয়ে তাদের পক্ষ থেকে বেশকিছু যুক্তিও উপস্থাপন করা হয়। বর্তমান আইনে অর্থ পাচার-সংক্রান্ত অভিযোগের তদন্ত ও মামলা দায়েরের ক্ষমতা একচ্ছত্রভাবে দুদকের হাতে ন্যস্ত রয়েছে। ফলে সীমিত জনবল নিয়ে দুদকের পক্ষে অর্থ পাচার-সংক্রান্ত অভিযোগ দ্রুত খতিয়ে দেখা সম্ভব হচ্ছে না। এতে অনেক অভিযোগ চূড়ান্ত নিষ্পত্তিও করা যাচ্ছে না। পাশের দেশের উদাহরণ টেনে পুলিশের পক্ষ থেকে যুক্তি দেয়া হয়েছে, ভারতেও একাধিক সংস্থা দিয়ে এ ধরনের মামলার তদন্ত করানো হয়। শুধু তা-ই নয়, অর্থ পাচারবিরোধী আন্তর্জাতিক সংস্থা দ্য ফিন্যান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্কফোর্সও (এফএটিএফ) পুলিশকে দিয়ে অর্থ পাচার অপরাধের তদন্তের সুপারিশ করেছে।আইনের প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনতে অর্থমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অর্থ মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত জাতীয় সমন্বয় কমিটির সভায় আইন সংশোধনের ব্যাপারে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।
উল্লেখ্য, মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধে বিভিন্ন দিকনির্দেশনা এবং নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের লক্ষ্যে এ সমন্বয় কমিটি গঠন করা হয়।
সমন্বয় কমিটির বৈঠকে আইনমন্ত্রী ও কমিটির অন্য সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের ৯, ১২, ১৪ ও ২৩ ধারা সংশোধনের জন্য প্রস্তাব করা হয়। আইনের ৯ ধারায় উল্লেখ করা হয়েছে, (১) ‘অন্য আইনে যা কিছুই থাকুক না কেন, এ আইনের আওতাধীন অপরাধগুলো দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪ (২০০৪ সনের ৫ নং আইন)-এর অধীন তফসিলভুক্ত অপরাধ বলে গণ্য হবে এবং দুর্নীতি দমন কমিশন বা কমিশনের কোনো কর্মকর্তা অথবা দুর্নীতি দমন কমিশন থেকে অনুমতি পাওয়া অন্য কোনো তদন্তকারী সংস্থার কর্মকর্তা কর্তৃক তদন্তযোগ্য হবে।’ (২) ‘এ আইনের অধীন অপরাধগুলো ক্রিমিনাল ল (১৯৫৮)-এর অধীন নিযুক্ত স্পেশাল জজ বিচার করবেন।’ (৩) ‘অভিযুক্ত ব্যক্তির সম্পদ অনুসন্ধান ও শনাক্তকরণের নিমিত্তে দুর্নীতি দমন কমিশন এ আইনের পাশাপাশি দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪তে দেয়া ক্ষমতাও প্রয়োগ করতে পারবে এবং দুর্নীতি দমন কমিশন থেকে ক্ষমতাপ্রাপ্ত অন্য কোনো তদন্তকারী সংস্থার কর্মকর্তা এ আইনের পাশাপাশি অন্য আইনে প্রদত্ত ক্ষমতাও প্রয়োগ করতে পারবেন।’
মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের ১২ ধারার ১ নম্বর উপধারায় বলা হয়েছে, ‘ফৌজদারি কার্যবিধি বা আপাতত বলবৎ অন্য কোনো আইনে যা কিছুই থাকুক না কেন, দুর্নীতি দমন কমিশনের অনুমোদন ছাড়া কোনো আদালত এ আইনের অধীন কোনো অপরাধ বিচারার্থ আমলে (কগনিজেন্স) নেবে না।’
আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকে সিদ্ধান্তের পর এখন আইনটি সংশোধনের প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য নিয়মানুযায়ী মন্ত্রিপরিষদে পাঠানো হয়েছে। মন্ত্রিপরিষদের অনুমোদন পেলে তা সংশোধনের জন্য সংসদে পাঠানো হবে।
আইন সংশোধনের মাধ্যমে দুদকের তফসিলভুক্ত মানি লন্ডারিং অপরাধের তদন্তভার পুলিশকে দেয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে দুদকের কমিশনার মো. সাহাবুদ্দিন চুপ্পু বণিক বার্তাকে বলেন, এ বিষয়ে আমরা আমাদের মতামত দিয়েছি। মানি লন্ডারিং অপরাধ দুদকের তফসিলভুক্ত অপরাধ। দুর্নীতি দমন ব্যুরোর আমলেও এ ক্ষমতা ছিল। ওই আইনের মাধ্যমেই প্রয়োজনে দুদক, সিআইডি কিংবা পুলিশকে দিয়ে মানি লন্ডারিং অপরাধ অনুসন্ধান ও তদন্ত করার সুযোগ ছিল। এর পরও নতুনভাবে আইন সংশোধন করে যদি পুলিশ কিংবা অন্য কাউকে দেয়া হয়, তবে তা হবে অপ্রয়োজনীয় ও অপ্রত্যাশিত।


