নিউ ইয়র্কে এখন বিকেল। সকাল থেকে পশ্চিম আকাশটা একটু মেঘাচ্ছন্ন। তাই রুদ্রোজ্জল আকাশকটা আজ তেমনিভাবে দেখা হয়নি। এ নিয়ে মন খারাপ থাকতেই পারে। কিন্তু সেই খারাপের মধ্যে এমন সংবাদ পড়লাম বাংলাদেশের সোস্যাল মিড়িয়াগুলোতে তাতে ‘বিষ্মিত’ না হয়ে পারলাম না? কিন্তু না ভয় হচ্ছে। আমার জন্য নয়, যার কাছে এ লেখাটি মতামত হিসেবে ছাপানোর জন্য পাঠাতে সিদ্ধান্ত নিয়েছি তার জন্য। কারণ তিনি আমার খুবই কাছের বন্ধু (বয়সে ছোট হলেও) এ এইচ এম আনোয়ারুল করিম। যার সম্পাদনায় নিউজ ওয়ার্ল্ডবিডি ডট কম (মুক্তচিন্তার অনলাইন সংবাদপত্র)। ভয় হচ্ছে এ জন্য যে, লেখাটি তিনি তার অনলাইন সংবাদপত্রে প্রকাশ করতে পারবেন কি না? আতকিংত হচ্ছি, এ এইচ এম আনোয়ারুল করিমের বাসার পেছনে হাতকড়া নিয়ে পুলিশ দাঁড়ানো নাই তো?
সুদুর আমেরিকা থেকে এ একটি লেখা লিখে সুহৃদ এ এইচ এম আনোয়ারুল করিমকে জেলে ঠেলে দিবো? হাত কড়া পরানোর ব্যবস্থা করবো? সম্পাদক এ এইচ এম আনোয়ারুল করিম লেখাটি প্রকাশ করে কার সঙ্গে ফাইট করবেন? প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেয়াই ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেনের সঙ্গে? না এ হতে পারে না। ‘কোবরা সাপ নিয়ে আনোয়ারুল করিম কান চুলকাতে পারেন না?’ কারণ এরই মধ্যে সে রকম কোবরা সাপ নিয়ে খেলা করতে গিয়ে তথ্য প্রযুক্তি আইনে গ্রেফতার হয়ে কারাগারের গেছেন একাত্তরের শহীদ সন্তান সাংবাদিক প্রবীর শিকদার।
সকাল থেকে ঢাকার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বেশ ক‘টি ছবি পোষ্ট করা হয়েছে। এসব ছবির মধ্যে স্পষ্টই দেখা যাচ্ছে একটি ছবিতে জামায়াত নেতা মতিউর রহমান নিজামীকে পুলিশ মাথার উপর ছাতা দিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন (যদিওবা এটি অনেক আগের ছবি)। আর পাশের ছবি সাংবাদিক প্রবীর শিকদারকে হাতকড়া পরানো হয়েছে (গতকালকে)। আবার যে হাতে হাত কড়া পরানো হয় সেই হাতে ক্রেস্টে ভর দিয়ে সাংবাদিক প্রবীর শিকদারকে হাটতে হচ্ছে পুলিশের সঙ্গে সঙ্গেই। আজ যদি পশ্চিমা মুল্লুকে অর্থাৎ আমেরিকায় এ ধরনের ঘটনা ঘটতো তাহলে মানবাধিকার সংঘঠনগুলো রাস্তা ছাড়তো না।
বাস্তবতা হলো; স্থানীয় সরকারমন্ত্রীর হাত অনেক লম্বা, তার কথায় দিন রাত হচ্ছে, রাত দিন হচ্ছে। পঙ্গু হওয়া এ সাংবাদিকদের এক পা ভালো আছে, মন্ত্রীতো চাইলে তার অন্য পাও ভেঙ্গে দিতে পারতেন? কিন্তু সেটা করলেন না কেন? তাহলেতো প্রবীর শিকদার আর থানায় জিডি করতে যেতে পারতেন না। আর এখন তাকে জেলে যেতে হতো না।
আমার কক্সবাজার এলাকার এক সিনিয়র সাংবাদিকদের একটি কথা মনে পড়ে গেছে। তিনি তার জীবনের একটি বাস্তব ঘটনা বলেছিলেন। তিনি চট্টগ্রাম শহরের পড়ার সময় হোস্টেল থাকতেন। এ হোস্টেলের একজন কেয়ারটেকার ছিলেন। অক্ষরজ্ঞানহীন ওই কেয়ারটেকারের এক ছেলে পড়তেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। মাসে এক বা দু‘টি চিঠি লিখতেন তিনি ছেলের কাছে। আর সে চিঠি লিখে দিতেন আমার ওই সিনিয়র সাংবাদিক ভাই। একদিন রাতে সাংবাদিক বড়ো ভাই হোস্টেলে ফিরেছেন অনেক রাত করে। তিনি ঘুম থেকে উঠবেন একটু দেরিতে। কিন্তু ভোর বেলায় হাজির কেয়ারটেকার; বললেন ‘বাবা ছেলের জন্য একটি চিঠি লিখে দাও’।
উত্তরে আমার সিনিয়র সাংবাদিক ভাই বললেন; ‘না আজ পারবো না, পা ব্যাথা’। কেয়ারটেকার বললেন পায়ে ব্যাথা তো কি হয়েছে? চিঠিতো লিখবা হাতে? উত্তরে সাংবাদিক ভাই বললেন; বাবা আমি যদি এখন চিঠিটা লিখে দিই সঙ্গে সঙ্গে বলবেন সকাল ১০ টার মধ্যে আধা কিলোমিটার দূরের পোষ্ট অফিসের বক্সে গিয়ে ফেলে আসতে, এ জন্য বললাম পা ব্যাথা বা সমস্যা।
আমার যেটি বলার বিষয়; স্থানীয় সরকারমন্ত্রীতো পারতেন প্রবীর শিকদারের আরেক পা ভেঙ্গে দিতে! তাহলেতো প্রবীর শিকদার আর থানায় জেতে পারতেন না, জিডি করার সাহস পেতেন না। প্রভাবশালী মন্ত্রী আপনি তা করলেন না কেন? প্রবীর শিকদার হয়তো আর একটি পা হারাতেন বা পঙ্গু হতেন কিন্তু এরকম ছবি হয়তো দেখতে হতো না যে ভাবে রাজাকারদের মাথায় ছাতা দিচ্ছে আর শহীদ সন্তান পঙ্গু প্রবীর শিকদারকে হ্যান্ডকাপ পরিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন পুলিশ।
বিশ্বাস করুন আমি এ ধরনের ঘটনায় একটু আশ্চ্যার্য হচ্ছি না। কারণ এটা বাংলাদেশে সম্ভব, প্রভাবশালী মন্ত্রীদের পক্ষে করানো সম্ভব। বিষ্মিত হয়েছি কোথায় জানেন, মন্ত্রী মোশাররফ সাহেব যখন প্রবীর শিকদারের বক্তব্যকে পাগলের পাগলামি বলেছেন।
জানতে পারলাম হিন্দু সম্পত্তি দখল নিয়ে এবং যুদ্ধাপরাধের বিচার নিয়ে ফেসবুকে লেখার কারণে তিনি এক ধরনের নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছিলেন। মন্ত্রী আর প্রবীর শিকদার দু‘জনেই ফরিদপুরের বাসিন্দা। একজন শহীদ পরিবারের সন্তান আর অন্যজন…।
মন্ত্রী মহোদয় বলেছেন, ‘ডাইরেক্ট সে লেখতেছে, সে মারা গেলে আমি তাকে খুন করছি, তাহলে আমি আইনের আশ্রয় নিব না? এটা কি আমি কোনো অন্যায় কাজ করছি?
মাননীয় মন্ত্রী আপনারা এমপি, আপনারা সংসদের আইন প্রনয়ন করেন। আপনার আইনের বাণী শুনান, কিন্তু কোন আইনে প্রবীর শিকদারের মতো পঙ্গু সাংবাদিকের হাতে হ্যান্ডকাপ পরানোর ব্যবস্থা করলেন? এটা কোন আইনে, জানার সে অধিকার কি আছে? আর মতিউর রহমান নিজামীর মাথায় ছাতা ধরেছে পুলিশ সেটি কোন আইনে তা কি স্পষ্ট করা যাবে?
মাননীয় মন্ত্রী বিশ্বাস করুন, সাংবাদিক প্রবীর শিকদার আমার স্বজন নন, আমি তার সঙ্গে কোন দিন কাজও করিনি, তার সঙ্গে আমার তেমন আলাপও নেই। কিন্তু বৈপরিত্ব হলো এই আমি বাংলাদেশ ছাড়ার আগ পর্যন্ত আপনার অনেক সংবাদ সম্মেলন কাভার করেছি, আপনার সঙ্গে আলাপ হয়েছে, অভূক্ত শ্রোতার মতো গল্প শুনেছি। সে মন্ত্রীর বক্তব্যে যে আজ সূদুর প্রবাস থেকে বিস্মিত হতে হবে সেটি ভাবিনি একবারও।
মাননীয় মন্ত্রী আমি একবারও বলছি না সাংবাদিক প্রবীর শিকদার ও আপনি কেউ আইনের উদ্ধেও নয়, কিন্তু শহীদ সন্তান প্রবীর শিকদার কি এমন অপরাধ করেছে যাকে পঙ্গু অবস্থায় হ্যান্ডকাপ পরানো হলো। জানি আপনার উত্তর হবে; এটি পুলিশ করেছে। আইন আইনের গতিতে চলবে। কিন্তু এখানে কথা থাকে, কারণ আপনি আইন প্রণয়ন করেন সংসদে। কি এমন হতো প্রবীর শিকদারকে হ্যান্ডকাপ পরানো থেকে বিরত থাকতে পুলিশকে বললে। আমিই বা আমরা সাংবাদিকরাই বা কিভাবে তা প্রত্যাশা করবো? কিন্তু আপনারাতো সাংবাদিকদের মানুষ বলেই ভাবেন না?
মাননীয় মন্ত্রী বিশ্বাস করুন; এ থেকে আপনার জনপ্রিয়তা একটু বাড়ছে না বরং আপনার সরকারের সাংবাদিক নির্যাতন ও নিপিডনের যে বিদ্যমান অভিযোগ আছে সেটিকে আরো জোরদার করেছে। প্রবীর শিকদার আইনী লড়াই করে প্রমান করবেন তিনি দোষি না নির্দোশ, কিন্তু আপনি বা আপনার সরকার কিভাবে প্রমাণ করবে পঙ্গু একজন সাংবাদিককে হাত কড়া পরায়নি? এখানে ক্ষমাপ্রার্থী প্রখ্যাত সাংবাদিক প্রবীর শিকদারের কাছে কারণ কয়েক জায়গায় আমি আপনাকে পঙ্গু বলে উল্লেখ করেছি। এটি নেহায়েত করেছি আপনার অবস্থা বুঝানোর জন্য। কিন্তু সরকারের বর্তমান অবস্থা কিভাবে বুঝাবো এবং তুলে ধরবো পশ্চিমা মুল্লকে এ ভাবনায় ভাবছি।
উল্লেখ্য; ২০০১ সালে দৈনিক জনকণ্ঠের ফরিদপুর প্রতিনিধি থাকাকালে সন্ত্রাসীদের হামলায় মারাত্মক আহত হন প্রবীর শিকদার। এ ঘটনায় চিকিৎসকেরা প্রবীর শিকদারের একটি পা কেটে ফেলেন। এরপর দেশে বিদেশে চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে তিনি দৈনিক সমকালে যোগ দেন। এরপর তিনি কালেরকন্ঠে যোগ দেন। বর্তমানে তিনি একটি অনলাইন পত্রিকা চালান। জনকণ্ঠে থাকাকালীন তিনি ‘ সেই রাজাকার’ শিরোনামে একটি ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেন। সেই প্রতিবেদেন তিনি বিশেষ কিছু ব্যাক্তির মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত থাকার বিষয়ে লেখেন। প্রবীর শিকদার তখন থেকে অভিযোগ করে আসছিলেন ওই ধারাবাহিক প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তাঁর ওপর হামলা হয়।
নিউ ইয়র্ক, ১৭ আগস্ট, ২০১৫ ।
শাহাব উদ্দিন সাগর: নিউ ইয়র্ক প্রবাসী সাংবাদিক।




Leave a Reply