বুধবার ৪ নভেম্বর ২০২৬

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রকে আরও পেশাদার হওয়া দরকার: পরমব্রত

Porombroto_Dhaka_Newsworldbdপ্রথমবারের মতো বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে অভিনয় করছেন কলকাতার জনপ্রিয় নায়ক পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়। অনিমেষ আইচের পরিচালনায় ‘ভয়ংকর সুন্দর’ সিনেমার শুটিং করতে এসেছিলেন ঢাকায়। বুধবার ১৯ আগস্ট সন্ধ্যায় ঢাকার একটি স্টুডিওতে সিনেমাটির ডাবিংয়ে অংশ নেন পরমব্রত। ডাবিংয়ের ফাঁকে তার সঙ্গে  আলাপ করেন সাংবাদিক মাসুম আওয়াল।

আলাপচারিতায় উঠে আসে ঢাকা-কলকাতার চলচ্চিত্র, ‘ভয়ংকর সুন্দর’ ও ব্যক্তি পরমব্রতর নানা বিষয়।

‘ভয়ংকর সুন্দর’র কাজ তো শেষ। এ উপলক্ষে বাংলাদেশে দীর্ঘ সময় অবস্থান করেছেন। সব মিলিয়ে কেমন লাগল?
খুব ভাল লেগেছে। বাংলাদেশে আগে কখনই এতটা সময় থাকিনি। অনেক লোকের সঙ্গে আলাপ হল, অনেক নতুন বন্ধু হল, অনেক সুন্দর সুন্দর অভিজ্ঞতা হল, অনেক সমৃদ্ধ হলাম। পুরো সময়টাই কাটল নানা রকম অভিজ্ঞতা অর্জন করে। যেমন, অনিমেষের সঙ্গে ভাল বন্ধুত্ব তৈরি হয়েছে। প্রধান, বাপ্পি, অরূপ— এরা আমার চেয়ে বয়সে অনেক ছোট হওয়ার পরেও বন্ধুত্ব তৈরি হয়েছে।

যে কোনো অভিজ্ঞতারই পজেটিভ ও নেগেটিভ দুটো দিক থাকে…
এক্ষেত্রে বাংলাদেশে আমার পজেটিভ অভিজ্ঞতাই বেশি, নেগেটিভ কম। সাধারণত তাই হয়। সবচেয়ে বড় দিক হল মানুষের উষ্ণতা, মানুষের আন্তরিকতা। এখানকার মানুষ অকৃপণভাবে ভালবাসা দিতে পারে। আর নেগেটিভটা হল আরেকটু পেশাদার হওয়া দরকার। আরেকটা বড় সমস্যা হল ট্রাফিক জ্যাম। এটার একটা কিছু সমাধান দরকার। হেলিকপ্টার সার্ভিস হতে পারে!

কলকাতা ও ঢাকার কাজের মধ্যে কী পার্থক্য চোখে পড়েছে?
আগের কথায় বলব, একটু পেশাদার হওয়া দরকার। কাজের প্রতি আরও সিরিয়াস হওয়া দরকার। প্রতিটি ইন্ডাস্ট্রির মেথড থাকে। এখানে এই মেথডের এখনও অভাব আছে। আমি সিওর সেটা চলে আসবে। আমাদের ওখানেও ৮-৯ বছর আগে ওটা ছিল না। এখানেও হয়ে যাবে।

অনিমেষ আইচের ‘জিরো ডিগ্রি’ নিশ্চয়ই দেখেছেন?
না, এখনও দেখা হয়নি।

আপনি একজন নির্মাতাও। সে হিসেবে নির্মাতা ও অভিনয়শিল্পীর চোখে অনিমেষকে নিয়ে কিছু বলুন।
আমার যেটা মনে হয়েছে অনিমেষ ট্যালেন্টেড। অসম্ভব ট্যালেন্টড। খুবই ভাল লেখে। আসলে সে কী চাইছে?— এই ভাবনাটা ওর একদম পরিষ্কার থাকে। আমার যেটা মনে হয়েছে ও অসম্ভব চটপটে আর অধৈর্য। এই দুটো জিনিস যদি কমাতে পারে, ধৈর্য যদি একটু বাড়াতে পারে— কাজে আরও গোছালো হবে। ওর প্রতিভা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। প্রথম যেদিন ওর কাছে ‘ভয়ংকর সুন্দর’র স্ক্রিপ্ট শুনি সেদিন থেকেই কোনো সন্দেহ ছিল না। এক মাস কাজ করলাম। ওকে সেটে দেখে মনে হয়েছে ফিল্মের যে ক্রাফট, শৈলী– সে সম্পর্কে অসম্ভব সুন্দর ও স্বচ্ছ জ্ঞান আছে। কী বানাতে চায় সেটা নিয়ে কোনো দ্বিধা নেই।

এই সিনেমার নায়িকা ভাবনা। এটা তার প্রথম সিনেমা। বিদ্যা বালান থেকে শুরু করে পাওলি দাম, রাইমা সেন অনেকেই আপনার বিপরীতে অভিনয় করেছেন। নায়িকা হিসেবে ভাবনা কেমন?
সে তো খুব ছোট। সবেমাত্র যাত্রা শুরু করল। এখনও অনেক পথ যাওয়া বাকি। আর প্রতিভা তো নিশ্চয়ই আছে। তা না হলে এই জায়গায় আজ থাকত না।

যৌথ প্রযোজনার সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। এ প্রসঙ্গে আপনার অভিমত কী?
আসলে দুই বাংলায় আমরা যে ধরনের ছবি পছন্দ করছি সে ধরনের ছবি যৌথ প্রযোজনায় হওয়া বেশি দরকার। আমি নাম ধরে বলছি, ‘অগ্নি ২’ যৌথ প্রযোজনা করে কোনো লাভ নেই। কারণ ‘অগ্নি ২’র সঙ্গে কলকাতার কিংবা ঢাকার সংস্কৃতির কোনো মিল নেই। আমি বা আমরা যে ধরনের ছবি ওখানে করি, একজন অনিমেষ, একজন অমিতাভ রেজা বা একজন ফারুকী বাংলাদেশে যে ধরনের ছবি বানাচ্ছে ওই ধরনের ছবি যৌথ প্রযোজনার হওয়া দরকার। তাহলে বোঝা যাবে আমাদের সংস্কৃতি এক, সাহিত্য এক, ইতিহাস এক। ‘অগ্নি ২’ যৌথ প্রযোজনা করে কোনো লাভ হবে না।

এর মধ্যে বাংলাদেশের অন্য কোনো চলচ্চিত্রে কাজের কথা হয়েছে কি?
কথাবার্তা চলছে। হয়তো সামনের বছর করব। এক্ষুণি নাম বলতে চাই না। যথাসময়ে জানবে সবাই।

বর্তমানে মুক্তির অপেক্ষায় আছে কোন কোন চলচ্চিত্র
মুক্তির অপেক্ষায় আছে শিশুতোষ চলচ্চিত্র ‘বাবার নাম গান্ধিজী’, কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘সিনেমাওয়ালা’, ‘বাস্তুসাপ’ ও ‘চকলেট’। শুটিং শুরু করতে যাচ্ছি অঞ্জন দত্তের ‘হ্যামলেট’, ‘ক্যাফে কিনারা’ এবং সৃজিতের নাম ঠিক না হওয়া পরের ছবির।

এবার একটু অন্য প্রসঙ্গে আসি। আপনাকে দেখা গেছে সত্যজিৎ রায়ের ফেলুদা অবলম্বনে নির্মিত চলচ্চিত্রে ‘তোপসে’ চরিত্রে। এর পর ‘কালবেলা’ ও ‘ভয়ংকর সুন্দর’সহ সাহিত্যনির্ভর কিছু চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন। তাহলে কি বলা যায় সাহিত্যনির্ভর চলচ্চিত্রের প্রতি আপনি বেশি আগ্রহী?
না, সে রকম নয়। আমি যতগুলো চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছি, তার সবই কিন্তু সাহিত্যনির্ভর নয়। তবে দুই বাংলার সাহিত্য অনেক সমৃদ্ধ। সাহিত্যনির্ভর গল্প হলেও আমার কোনো অসুবিধা নেই। আবার কেউ যদি মৌলিক গল্প ভাবতে পারে তাতেও আমার কোনো অসুবিধা নেই।

অভিনয়ের জন্য সাধারণত কোন ধরনের গল্পকে প্রাধান্য দেন?
পরিচালক বা চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট যিনি গল্পটা শোনাবেন গল্পের এ টু জেড যদি ১০ থেকে ২০ লাইনে শোনাতে পারেন। পুরো গল্পটা যদি বুঝতে পারি কুড়ি লাইনের মধ্যে। তাহলে গল্পটাকে প্রাধান্য দেই।

পুলিশ অফিসার, করপোরেট অফিসার, নির্মাতা— এমন নানা চরিত্রে দেখা গেছে আপনাকে। এবার ক্লিনারের চরিত্রে অভিনয় করলেন—
স্বপ্নের চরিত্র বলে আসলে কিছু নেই। তবে প্রিয় চরিত্র অনেক আছে। ছোটবেলা থেকেই অনেক সিনেমা দেখি আমি। বেশ কিছুদিন ধরেই অভিনয় করছি। যে ধরনের চরিত্রের সঙ্গে ব্যক্তি পরমব্রতর কোনো মিল নেই সে ধরনের চরিত্রই আসলে ভাল লাগে। কারণ ব্যক্তি পরমব্রতর মতো চরিত্রের কয়েকটি চলচ্চিত্রে এরই মধ্যে অভিনয় করে ফেলেছি। সেদিক থেকে ‘ভয়ংকর সুন্দর’ চলচ্চিত্রে ক্লিনার, ‘সিনেমাওয়ালা’য় মফস্বলের ডিভিডি বিক্রেতা কিংবা ‘হ্যামলেটে’ বিদেশ থেকে আসা হাফ-পাগল মতো ছেলের চরিত্র একটু আলাদা।

এবার পরিচালনা প্রসঙ্গে আসি। ‘জিও কাকা’র মধ্য দিয়ে পরিচালনা শুরু। পরে বানিয়েছেন ‘হাওয়া বদল’ ও ‘লড়াই’। সামনে কী বানাবেন?
সামনের বছরের শুরুর দিকে একটা ছবি শুরু করব। সেটা নিয়ে ভাবছি।

এতক্ষণ সিনেমার পরমব্রতর সঙ্গে কথা বলেছি। ব্যক্তি পরম আসলে কেমন? নিজের কয়েকটা দোষ-গুণের কথা বলুন।
আমাকে দেখে মনে হয় না, কিন্তু আমার মধ্যেই একটা অধৈর্য ভাব আছে। কিছু মাথায় এলে আজ-কালের মধ্যে করে ফেলতে ইচ্ছা করে। তাড়াহুড়ো না করে কাজের আগে আসলে নিজেকে সময় দেওয়া উচিৎ। আমার না বলার ক্ষমতা একটু কম। সেটা একটু বাড়লে ভাল হয়। কোনো বন্ধু এসে বলল, ‘প্রথমবার ছবি বানাচ্ছি। প্লিজ অভিনয় কর।’ তখন রাজি হয়ে যাই। আমার হয়তো গল্পটা তেমন পছন্দ হয়নি।

আর ভাল দিক?
সকলের সঙ্গে মেশার ক্ষমতা আছে। বুদ্ধিশুদ্ধি রাখি। ভেতরটা অস্থির হলেও বাইরেই একটা শান্তভাব বজায় রাখতে পারি। এগুলো সবগুলোই অর্জিত ক্ষমতা। এই হল গুণ।

দাদু ঋত্বিক ঘটক তো বাংলা চলচ্চিত্রের মাইলফলক নাম। অভিনয়জীবনে তিনি কতটা অনুপ্রেরণা হয়েছেন?
ছোটবেলায় মনে হতো না। ইদানীং মনে হয়। তার ছবির মধ্যে বৃহত্তর সামাজিক, ভৌগলিক ও ঐতিহাসিক অবস্থান, যেমন- ‘মেঘে ঢাকা তারা’। বেশিরভাগ সময় দেখা গেছে দেশভাগ পরবর্তী সময়কে ধারণ করেছেন। এখান থেকে বোঝা যায় ইতহাসের সঙ্গে তার যে সম্পৃক্ততা, দায়বদ্ধতা সেটা এখন আমাকে উৎসাহিত করে।

বাবা-মার অনুপ্রেরণা কেমন ছিল?
বাবা-মা তৈরি করেছেন আমাকে। আমার বাবা সত্যেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় ও মা সুনেত্রা চট্টোপাধ্যায় যেমন ছিলেন, তেমন না হলে আমি এমন হতাম না। আর আমি এখন যেমন হয়েছি সেটা বোধহয় খুব একটা খারাপ না!

পারিবারে কে কে আছেন?
কেউ নেই। বাবা-মা দু’জনই গত হয়েছেন। আমি একা থাকি।

আর বিয়ে?
(হাসতে হাসতে) করিনি। আশা করি হবে।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা?
(হাসতে হাসতে) বিয়ে করব, বাচ্চা হবে কি-না!

না। চলচ্চিত্র নিয়ে ভবিষ্যৎ ভাবনা
চলচ্চিত্রে কাজ করছি। যতদিন পারি কাজ করব।

সময় দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ।

আরও পড়ুন