“যখন আমি চারপাশে তাকালাম, দেখতে পেলাম, বহু শিশু প্রকাশ্যে পর্নো ওয়েবসাইটে নিমগ্ন। পর্নোগ্রাফি আসলে ‘হিটলারের চেয়ে খারাপ, এইডস, ক্যানসার বা যেকোন মহামারির চেয়েও ভয়াবহ। পারমাণবিক বিস্ফোরণের চেয়েও এটি বেশি ধ্বংসাত্মক। পর্নোগ্রাফি মানুষকে স্বার্থপর ও অসার করে তোলে। তাই একে অবশ্যই থামাতে হবে।” এভাবেই বলছিলেন ইন্দোরের আইনজীবী কমলেশ ভাসওয়ানি। দাপ্তরিক কাজে ইন্টারনেট ব্যবহার করতে ব্যস্ত শহর ইন্দোরের বেশ কয়েকটি ইন্টারনেট ক্যাফেতে গিয়ে এভাবেই বলছিলেন তিনি। সেখানে তিনি যা পেয়েছেন, তাকে তিনি বর্ণনা করেছেন ‘পর্নোগ্রাফির মহামারি’ হিসেবে।
৮৫৭ পর্নো ওয়েবসাইট বন্ধের জন্য যে রিট, সেই রিটকারী পর্নোর বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরেই লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। বিবিসি’র একটি প্রতিবেদনে উঠে এসেছে ভারতের নীল ছবির জগতের বিরুদ্ধে লড়াই চালানো আইনজীবী কমলেশ ভাসওয়ানির গল্প।
তিনি বলেন, আমি হয়তো সুপ্রিম কোর্টের গুরুত্বপূর্ণ কোন রায় ডাউনলোড করতে গেলাম। কিন্তু দেখলাম তার পরিবর্তে পর্নোগ্রাফিক বিজ্ঞাপন ভেসে উঠলো! যখন আমি চারপাশে তাকালাম, দেখতে পেলাম, বহু শিশু প্রকাশ্যে পর্নো ওয়েবসাইটে নিমগ্ন।
কমলেশ ভাসওয়ানি জানান, তিনি স্থানীয় আদালতে গিয়ে নিজের সহকর্মীদের সঙ্গে বিষয়টি আলোচনা করেছিলেন। তারাও বলছিলেন, আমাদের চারপাশ দখল করে আছে পর্নোগ্রাফি। এব্যাপারে কিছু একটা করা উচিত।
কিন্তু তিনি চমকে উঠলেন ২০১২ সালের ডিসেম্বরে, যেদিন ২৩ বছর বয়সী এক ছাত্রীকে দিল্লিতে প্রকাশ্যে গণধর্ষণ করা হলো। ওই ঘটনার পর আন্তর্জাতিকভাবে বিষয়টি বেশ আলোচিত হয়ে উঠে। এরপর ভারতে ধর্ষণবিরোধী আইন বেশ কঠোর করা হয়।
ঘটনার দিন ভাসওয়ানি দিল্লিতে একটি কাজে ছিলেন। তিনি বলেন, সেদিন তার নিজেকে বেশ অপরাধী মনে হয়েছিল। কারণ, এ জঘন্য অপরাধের বিরুদ্ধে তিনি কিছুই করতে পারছেন না। তার বিশ্বাস, এ হামলাকারীরা নিশ্চয়ই পর্নো দেখে। এরপর শুরু হয় তার লড়াই।
ভাসওয়ানির প্রশ্ন, যুব সমাজ কেন ভারতকে ব্যর্থ করে তুলছে? কারণ, তারা পর্নোতে ডুবে আছে। তার বিশ্বাস, ভারতের জিডিপি আরও বাড়তে পারতো, যদি মানুষকে পর্নো দেখা থেকে বিরত রাখা যেত। এসব দেখে তারা স্বার্থপর হয়ে যায়। তারা জাতিকে কিছু দিতে চায় না।
তিন বছর আগে সুপ্রিম কোর্টে জনস্বার্থে একটি পিটিশনের বিষয়বস্তু লিখছিলেন ভাসওয়ানি।
এরপর ভারতে পর্নো নিষিদ্ধের জন্য একটি বিতর্কিত আবেদন দাখিল করেন তিনি। অসুস্থ বাবাকে দেখাশুনা করতে তখন তিনি রীতিমতো ঘরে নিজেকে আবদ্ধ করে রাখেন। এ অবসর সময়েই তিনি লিখে ফেলেন ২০০ পৃষ্ঠার রিট পিটিশনটি। সময় লেগেছিল প্রায় ১ মাস। তাকে আশ্চর্য করে দিয়ে সুপ্রিম কোর্ট পিটিশনটির শুনানি করতে রাজি হলেন ২০১৩ সালের এপ্রিলে। এরপর থেকে ওই পিটিশন নিজেই জ্যান্ত হয়ে উঠে। এ মাসের শুরুর দিকে এ পিটিশনের কারণেই সরকার ৮৫৭টি পর্নো ওয়েবসাইট নিষিদ্ধ করে।
এ সিদ্ধান্তে ভারতজুড়ে ব্যাপক ক্ষোভের জন্ম নেয়। বহু বলিউড তারকা এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ক্ষোভ জানান। অনেকে পর্নো ওয়েবসাইট নিষিদ্ধে নিজেদের অসন্তুষ্টির কথা প্রকাশ করতে বেছে নেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে।
গত ২ বছরে এ পিটিশনবিষয়ক প্রায় ২০টি শুনানিতে হাজির ছিলেন আইনজীবী কমলেশ ভাসওয়ানি। তার পিটিশনে সব ওয়েবসাইটে পর্নো প্রদর্শন নিষিদ্ধের আবেদন ছিল। এছাড়া নতুন, স্বয়ংসমপূর্ণ পর্নোগ্রাফি-বিরোধী আইন প্রণয়নের আহ্বানও ছিল।
সে পিটিশনে বলা হয়েছে, পর্নোগ্রাফি ‘হিটলারের চেয়ে খারাপ, এইডস, ক্যানসার বা যেকোন মহামারির চেয়েও ভয়াবহ। পারমাণবিক বিস্ফোরণের চেয়েও এটি বেশি ধ্বংসাত্মক। তাই একে অবশ্যই থামাতে হবে।
অনেকেই পিটিশনের কথাগুলোকে চরম বা আতঙ্ক থেকে সৃষ্ট বলছেন। ভারতের অনেকেই পর্নোগ্রাফি বন্ধের বিরুদ্ধে যুক্তি দিয়েছেন। তাদের যুক্তি, পর্নো বন্ধ হলে নাগরিক অধিকার সীমাবদ্ধ হয়ে যাবে। কিন্তু এসবে নমনীয় হননি ভাসওয়ানি। তার মতে, পর্নোগ্রাফি মানুষকে স্বার্থপর ও অসার করে তোলে।
পিটিশনে তিনি এ-ও লিখেছেন, পর্নোগ্রাফির ফলে দেশের নিরাপত্তাও বিপদে পড়ে। কেননা, পর্নোগ্রাফি সহিংস কর্মকাণ্ড, সমাজে অগ্রহণযোগ্য ব্যবহার, শিশুদের শোষণকে উৎসাহিত এবং নারীদের মর্যাদাহানি করে।
ভাসওয়ানি একজন সরকারি চাকরিজীবীর সন্তান। তার মা একজন গৃহবধূ। একটি মধ্যবিত্ত যৌথ পরিবারে তার বেড়ে ওঠা। চেয়েছিলেন ডাক্তার হতে। ৫ বার তিনি ব্যর্থ হয়েছেন দেশটির তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক মেডিক্যাল ভর্তি পরীক্ষায়। এরপর তিনি বিজ্ঞানে ডিগ্রি নিয়েছেন। পরে অবশ্য আইনজীবী হয়েছেন। প্রায় এক দশক ধরে তিনি এ পেশায় নিয়োজিত। তার স্ত্রী একজন শিক্ষিকা। ঘরে রয়েছে স্কুলগামী এক ছেলে।
নিজস্ব প্রতিবেদক, নয়াদিল্লি
নিউজওয়ার্ল্ডবিডি ডট কম।


