বুধবার ৪ নভেম্বর ২০২৬

শুদ্ধি অভিযানের নামে বন্দুকযুদ্ধে মৃত্যুর তালিকা লম্বা হবে!

Crossfire_হঠাৎ করে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের কথিত ক্রসফায়ার বা বন্দুকযুদ্ধে নিহতের ঘটনাকে বর্ননা করছেন ‘শুদ্ধি অভিযান’ বলে। পদ্ধতিটি বিতর্ক তুলেছে। শাসক দলের হয়ে বেআইনি ও সন্ত্রাসী কাজে জড়িতদের বিশেষ পদ্ধতিতে দমন করা হচ্ছে বলে এর সমালোচনা হচ্ছে। মাগুরায় যুবলীগ ও ঢাকার হাজারীবাগে ছাত্রলীগ নেতা ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হওয়ার পর শাসক দলের অন্যতম নীতিনির্ধারক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের গত ১৮ আগস্ট মন্তব্য করেন ‘অ্যাকশন শুরু’ বলে। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের এই প্রেসিডিয়াম সদস্যের বক্তব্য ব্যাখ্যা করে কথিত বন্দুকযুদ্ধের ঘটনাকে শুদ্ধি অভিযান হিসেবেই মনে করছেন দলের অনেক নেতা। এর আগে গত ১৭ আগস্ট মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে অনির্ধারিত আলোচনায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সন্ত্রাসীদের প্রতি হুশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, সন্ত্রাসীরা দলের হলেও তাদের প্রতি ন্যূনতম সহানুভূতি দেখানো হবে না।

আওয়ামী লীগের একটি সূত্র থেকে জানা যায়, দল ও সরকারের ভাবমূর্তি রক্ষায় দলীয় শুদ্ধি অভিযানের অংশ হিসেবেই দলীয় সন্ত্রাসীদের লাগাম টেনে ধরার কাজটি শুরু করেছে আইন-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাগুলো।

গত ১৮ আগস্ট র্যাবের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়েছে মাগুরায় মাতৃগর্ভে শিশু গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনার আসামি যুবলীগ নেতা আজিবর রহমান। একই দিনে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়েছে মোবাইল চুরির অভিযোগে পুরান ঢাকায় এক কিশোরকে পিটিয়ে হত্যায় অভিযুক্ত ছাত্রলীগ নেতা আরজু মিয়া। গত ২০ আগস্ট ‘বন্দুকযুদ্ধে’ গাজীপুরে নিহত হয়েছে বাড্ডায় জোড়াখুনের ঘটনায় জড়িত সন্ত্রাসী সাইদুল ইসলাম।

একাধিক সূত্রে জানা গেছে, ‘বন্দুকযুদ্ধে’ দলীয় সন্ত্রাসী নিহত হওয়ার ঘটনায় বিভিন্ন পর্যায়ের দলের  নেতা-কর্মীরা ক্ষুব্ধ, আতঙ্কিত ও হতাশ। হাজারীবাগে আরজু মিয়া নিহত হওয়ার পর বাংলাদেশ ছাত্রলীগ ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেছে, ‘এটা মেনে নেওয়া যায় না।’ সংশ্লিষ্ট আসনের সংসদ সদস্য ফজলে নূর তাপস মিডিয়াকে বলেছেন, বন্দুকযুদ্ধ বিশ্বাসযোগ্য নয়, ধরে নিয়ে হত্যা করেছে র্যাব।

‘বন্দুকযুদ্ধের’ ঘটনায় বিচলিত দলীয় সন্ত্রাসীরা ধরনা দিচ্ছে তাদের লালনকারী নেতাদের কাছে। ইতোমধ্যেই অনেকে আত্মগোপনে গেছে বলে জানিয়েছে গোয়েন্দা সূত্রগুলো। শাসক দল ও গোয়েন্দা সূত্রগুলো থেকে জানা গেছে, সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্নকারী দলীয় লোকদের লাগাম টেনে ধরার কাজটি এই মুহূর্তেই থামছে না বরং তালিকা দীর্ঘতর হচ্ছে। আরও কিছুদিন চলতে পারে ‘বন্দুকযুদ্ধ’।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগ উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য অ্যাডভোকেট ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন বলেন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের কাজ করছে। এর সঙ্গে দলের শুদ্ধি অভিযানের সম্পর্ক নেই। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিরপেক্ষভাবে তাদের কাজ করে যাচ্ছে। তিনি বলেন, এটা ঠিক যে, দলীয় কতিপয় লোকের কারণে সরকারের ভাবমূর্তি বিনষ্ট হচ্ছে। দলের লোকেরাই তাদের শাস্তি চায়, তাদের শাস্তি হলে দেশের মানুষের সঙ্গে দলের ব্যাপক সংখ্যক কর্মীও খুশি।

‘বন্দুকযুদ্ধ’ বলে ঘটনার যে বিবরণ পৌনঃপুনিক পুলিশ-র্যাব দিয়ে থাকে, আগে ‘ক্রসফায়ার’ বলে দেওয়া হতো, তা এখন জনসাধারণের কাছে আর বিশ্বাসযোগ্য নেই। পুলিশ হেফাজতে সাজানো ঘটনায় মৃত্যু বলেই তা মানুষ গ্রহণ করে।

‘বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড’ বলে অভিহিত এই পদ্ধতিতে দলীয় কোন্দলজাত সমস্যার সমাধান হবে না বলে ইতোমধ্যেই মত দিয়েছে আইন সালিশ কেন্দ্র (আসক)। আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বলেছেন-ক্রসফায়ার সমাধান নয়। কর্মীদের নীতি-আদর্শের ভিত্তিতে গড়ে তুলে সমাধান করতে হবে।

আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা বলেছেন, বড় অবকাঠামো উন্নয়ন থেকে শুরু করে দেশের আর্থিক খাতে সরকারের উল্লেখযোগ্য সফলতা, সমুদ্রসীমা নির্ধারণ, স্থলসীমান্ত চুক্তির মতো আন্তর্জাতিক সাফল্য প্রভৃতি সরকারের ইতিবাচক অর্জন জনমনে ঢাকা পড়ে যাচ্ছে গুটিকতক দলীয় সন্ত্রাসীর অপকর্মের কারণে। প্রশংসা পাওয়ার বদলে সরকার দারুণভাবে সমালোচিত হচ্ছে, ভাবমূর্তি আঘাতপ্রাপ্ত হচ্ছে।

মাত্র কয়েক সপ্তাহে চারটি ঘটনা সরকারের ভাবমূর্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। মাগুরায় গর্ভের শিশু গুলিবিদ্ধ হওয়া, বাড্ডায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দলীয় সন্ত্রাসীদের হাতে প্রতিপক্ষ দুই দলীয় কর্মী খুন, জাতীয় শোক দিবসের অনুষ্ঠানে কুষ্টিয়ায় দলীয় দুই সন্ত্রাসী গ্রুপের মধ্যে গোলাগুলিতে একজন নিহত এবং হাজারীবাগে ছাত্রলীগ নেতার প্রহারে এক কিশোর খুনের ঘটনা।

এ ছাড়া স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়নমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেনের বিরাগভাজন হয়ে সাংবাদিক প্রবীর সিকদারের গ্রেফতারের ঘটনায় পুলিশের বাড়াবাড়িতে সরকার তীব্র সমালোচনায় পড়ে। ম্যাজিস্ট্রেট আদালত তিন দিনের রিমান্ডের আদেশ দিলেও সরকার দ্রুত জামিনে মুক্তির পথ প্রশস্ত করে পরিস্থিতি সামাল দেয়। সরকারকে ভাবমূর্তি রক্ষায় সচেষ্ট হতে হচ্ছে। অনুসন্ধানে দেখা যায়, মাগুরায় সংঘর্ষ হয়েছে দুটি সন্ত্রাসী গ্রুপের মধ্যে-এরা দীর্ঘদিন ধরেই সন্ত্রাসী। তবে আওয়ামী লীগের সমর্থক হয়ে দল ক্ষমতায় গেলে এই সন্ত্রাসীরা মাথাচড়া দিয়ে ওঠে।

২০০৯ সাল থেকে একটানা আওয়ামী লীগের ক্ষমতাসীন থাকার মধ্যে বাড্ডায় শাসকদল-আশ্রিত সন্ত্রাসীরা গত সাত বছর ধরেই ঢাকার মতিঝিল থেকে শুরু করে গাজীপুর পর্যন্ত এলাকায় সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে রেখেছে। বাড্ডা এলাকায় এক সময় আস্তানা ছিল মতিঝিলের নিহত যুবলীগ নেতা মিল্কি এবং তার হত্যার সঙ্গে জড়িত যুবলীগ নেতা চঞ্চলের।

জাতীয় শোক দিবসের র্যালিতে কুষ্টিয়া শহরে গুলিতে নিহত হয়েছে সবুজ নামের এক যুবলীগ কর্মী। এখানে গোলাগুলি হয়েছে জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা সাজ্জাদ হোসেন সবুজ ও শহর আওয়ামী লীগের নেতা মোমরেজ বাহিনীর মধ্যে। সাজ্জাদ ও মোমরেজ দু’জনই আওয়ামী লীগে ‘হাইব্রিড’ তথা রাজনৈতিক প্রক্রিয়া ছাড়া হঠাত্ আগত। সাজ্জাদ ওই এলাকার চরমপন্থীদের সঙ্গে ছিল এবং কুষ্টিয়া পুলিশের তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী। মোমরেজ চরমপন্থী সমর্থনপুষ্ট ঠিকাদার হিসেবে পরিচিত। এই দুুই হাইব্রিড দলের নাম ভাঙিয়ে শত কোটি টাকার মালিক হয়। তাদের কর্মকাণ্ডে বিতর্কিত আওয়ামী লীগ।

আওয়ামী লীগের ভেতরের সূত্রে জানা গেছে, দলের ভেতরে সন্ত্রাসীদের উত্পাত নিয়ে ১৫ আগস্টের আগে দলের নীতিনির্ধারক পর্যায়ে আলোচনা হয়। দলীয় নেতারা একমত হয়েছেন যে, গুটিকতক দলীয় সন্ত্রাসী-চাঁদাবাজ-টেন্ডারবাজের কর্মকাণ্ডে সরকারের অর্জনকে বিসর্জন যেতে দেওয়া হবে না। শাসক দলের উচ্চমহল একমত হওয়ার পরই দলীয় সন্ত্রাসীদের লাগাম টেনে ধরার কাজটি শুরু করা হয়েছে।

সূত্রমতে, চরমপন্থায় ‘শুদ্ধি’ চালাতে প্রশাসনিক পর্যায়েই সিদ্ধান্ত নিতে বলা হয়েছে তবে সতর্ক করা হয়েছে যেন প্রকৃত সন্ত্রাসীই চিহ্নিত হয়; যাদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, ভূমি দখলসহ বিতর্কিত কাজে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে তাদের বিরুদ্ধেই অভিযানটি কেবল পরিচালিত হয়। সূত্রমতে, এ ক্ষেত্রে ছাত্রলীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগসহ অন্য ভুঁইফোঁড় সংগঠনগুলোর কাউকেই রেহাই দেওয়া হবে না। স্থানীয় এমনকি কেন্দ্রীয় কোনো আওয়ামী লীগ নেতার সুপারিশও গ্রহণ করা হবে না।

আরও পড়ুন