নীতি নির্ধারণী বিষয়ে বিএনপি’র অন্যতম ’থিঙ্ক ট্যাঙ্ক’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদের সঙ্গে বিএনপি’র একটি অংশের নেতাদের দূরত্ব বাড়ছে। বিশেষ করে দলের নীতি নির্ধারণী গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের বিষয়ে তার দেওয়া বক্তব্যে এই দূরত্ব তৈরি হয়। সর্বশেষ গত ১৫ আগস্ট বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে তার জন্মদিনের কেক না কাটার আহ্বান জানিয়েছিলেন এমাজউদ্দীন আহমদ। এতে বিএনপির কট্টরপন্থী নেতারা ক্ষুব্ধ হন। ক্ষুব্ধ হলেও এই বিষয়ে দলটির নেতারা কেউ প্রকাশ্যে মুখ খুলছেন না। তার এমন বক্তব্যে ক্ষুব্ধ জোটের শীর্ষ নেতারাও।
ক্ষুব্ধ জোটের নেতারা গত ১২ আগস্ট অনুষ্ঠিত জোটের বৈঠকে অধ্যাপক এমাজউদ্দীনের বক্তব্যের বিষয়ে জোট নেত্রীর মতামত জানতে চান। জবাবে জোট নেত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া তাদের বলেন, এমাজউদ্দীন আহমদকে দলের কোনো দায়িত্ব দেওয়া হয়নি। তিনি বিএনপির কেউ নন। জোটেরও কেউ নন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে জোটের শরিক জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা) সভাপতি শফিউল আলম প্রধান সকালের খবরকে বলেন, জোটের বৈঠকে তার বক্তব্য নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তার বক্তব্য প্রসঙ্গে জোট নেত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া বলেছেন, এটা তার ব্যক্তিগত মতামত হতে পারে। এটি বিএনপি কিংবা জোটের মতামত না। জোট তার আগের সিদ্ধান্তে অটল আছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অধীনে নয়, নির্দলীয় সরকারের অধীনেই নির্বাচনে অংশ নেবে ২০ দলীয় জোট।
তিনি বলেন, জামায়াতে ইসলামীকে জোট থেকে সরিয়ে দেওয়ার বিষয়ে জোটের বৈঠকে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া বলেছেন, ২০ দলীয় জোট অতীতে ছিল, আছে ও থাকবে।
অন্যদিকে গুলশান কার্যালয়ের একটি ঘনিষ্ঠ সূত্র জানায়, জোটের বৈঠকের পর অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আর বিএনপি চেয়ারপারসনের গুলশানের রাজনৈতিক কার্যালয়ে যাননি।
অধ্যাপক এমাজউদ্দীনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, দল ও জোটের নেতারা ক্ষুব্ধ হলে তার কিছু করার নেই। তিনি বিএনপির ভালোর জন্যই যা বলার বলেছেন। যারা তার সমালোচনা করেন তারা গত আন্দোলনে কোথায় ছিলেন? তাদেরকে কেউ মাঠে দেখেছেন? এখন তারা এত কথা বলছেন কেন? শুধু তাই নয়, সিটি নির্বাচনে জোটের কোন নেতা কোথায় দায়িত্ব পালন করেছেন? জোটের বৈঠকের পর বিষয়টি অধ্যাপক এমাজউদ্দীনের নজরে এলে তিনি নিজেকে কিছুটা গুঁটিয়ে নেন। এরপর তিনি আর চেয়ারপারসনের সঙ্গে বৈঠক করেননি।
গত ১৫ আগস্ট চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া তার জন্মদিনের কেক কাটলেও তাতে যোগ দেননি এমাজউদ্দীন। যদিও এর আগে জন্মদিনের অনুষ্ঠানে তিনি একাধিকবার গেছেন।
যোগাযোগ করা হলে তিনি ওই দিন সকালের খবরকে বলেন, তিনি অসুস্থ। তাই কেক কাটার অনুষ্ঠানে তিনি যেতে পারছেন না।
এমাজউদ্দীন আহমদ যা বলেছিলেন:
মধ্যবর্তী নির্বাচন হলে বিএনপি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচনে অংশ নিতে পারে। সর্বশেষ ১৫ আগস্ট তিনি বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে তার জন্মদিনের কেক না কাটার জন্য অনুরোধ জানিয়েছিলেন। এতেও দলের নেতা-কর্মীরা ক্ষুব্ধ হন। পরে দলের নেতা-কর্মীদের চাপে কেক কাটেন খালেদা জিয়া।
‘অধ্যাপক এমাজউদ্দীন বিএনপির কেউ নন। এমনকি জোটেরও কেউ নন।’-বিএনপি চেয়ারপারসনের এমন বক্তব্যের পর গত ১৮ আগস্ট ঢাকা সিটি নির্বাচনে অনিয়মের তথ্যচিত্র তুলে ধরতে পান্থপথের সামারাই কনভেনশন সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে ঢাকা আদর্শ আন্দোলন। পুলিশ এ সংবাদ সম্মেলন পণ্ড করে দেয়।
পরে কনভেনশন সেন্টারের প্রধান ফটকের সামনে দাঁড়িয়ে উপস্থিত সাংবাদিকদের এমাজউদ্দীন আহমদ বলেন, তিনি বিএনপির কেউ নন। বিএনপিকে তিনি চাঁদাও দেন না। তিনি সিটি নির্বাচনের অনিয়মের চিত্র তুলে ধরতে এসেছিলেন। এগুলো প্রকাশ পেলে সরকার নির্বাচনে অনিয়মের পথ বন্ধ করতে পারত।
গত সরকারবিরোধী আন্দোলনের সময়ে দলের পক্ষে যখন কথা বলার কেউ ছিল না তখন দলের পক্ষে সংবাদ মাধ্যমে কথা বলেছেন আদর্শ ঢাকা আন্দোলনের আহ্বায়ক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ। সিটি নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিষয়ে যখন বিএনপি দ্বিধান্বিত ছিল তখন দলটিকে নির্বাচনে নিয়ে আসেন এমাজউদ্দীন আহমদ। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার গুলশানের রাজনৈতিক কার্যালয়ে সাক্ষাত্ করে তার সঙ্গে পরামর্শ করে সিটি নির্বাচনে প্রার্থী চূড়ান্ত করাসহ নানা বিষয়ে দলের হয়ে কাজ করেন এমাজউদ্দীন। তখন তার নেতৃত্বে গড়ে ওঠা আদর্শ ঢাকা আন্দোলনের ব্যানারে সব কাজ করতে চাইলে ক্ষুব্ধ হন দলের নেতারা।
বিষয়টি বুঝতে পেরে চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া উত্তর সিটি করপোরেশন নির্বাচন দেখভালের দায়িত্ব দেন স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদকে। আর দক্ষিণের দায়িত্ব দেন ব্রি. জে. (অব.) আ স ম হান্নান শাহকে।


