পে-স্কেল আগামী মাসে মন্ত্রিসভায় উত্থাপন করা হবে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। মুহিত আরও বলেন, প্রস্তাবিত পে-স্কেলে টাইম স্কেল ও সিলেকশন গ্রেডে কমিশনের প্রস্তাব থেকে কিছু পরিবর্তন আনা হচ্ছে।
রোববার ২৩ আগস্ট সন্ধ্যায় অর্থ মন্ত্রণালয়ে আইএমএফ’র নির্বাহী পরিচালক রাকেশ মোহনের সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে মন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, টাইম স্কেল ও সিলেকশন গ্রেড সংস্কার করার পর আগামী মাসে মন্ত্রিসভায় পে-স্কেল উত্থাপন করা হবে।
বেতন কাঠামো মন্ত্রিসভায় অনুমোদন সেপ্টেম্বরে
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রস্তাবিত অষ্টম বেতন কাঠামো প্রধানমন্ত্রীর যুক্তরাষ্ট্র যাওয়ার আগেই মন্ত্রিসভার বৈঠকে অনুমোদন দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী মুহিত।
নতুন বেতন-কাঠামো কবে মন্ত্রিসভার বৈঠকে অনুমোদন পাবে- এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, “প্রস্তাবিত অষ্টম বেতন-কাঠামো এখন প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে আছে। কিছু সংশোধন করে তা মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের জন্য উঠানো হবে। আমরা (আমি এবং প্রধানমন্ত্রী) সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্র যাওয়ার আগে হবেই হবে।”
বাংলাদেশ বেতন ও চাকরি কমিশন সর্বোচ্চ ৮০ হাজার ও সর্বনিম্ন ৮ হাজার ২০০ টাকা মূল বেতন ধরে নতুন বেতন কাঠামো সুপারিশ করেছিল। এরপর সচিব কমিটি তাদের প্রতিবেদনে সর্বোচ্চ ৭৫ হাজার এবং সর্বনিম্ন ৮ হাজার ২৫০ টাকা সুপারিশ করেছে।
সচিব কমিটির প্রধান মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ মোশাররাফ হোসাইন ভূইঞা গত ১৩ মে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের দপ্তরে প্রতিবেদনটি জমা দেন।
অর্থ মন্ত্রণালয় এ প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন করবে। যখনই বিষয়টি চূড়ান্ত হোক, গত ১ জুলাই থেকে অষ্টম বেতন কাঠামো কার্যকর বলে ধরা হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিনের নেতৃত্বে গঠিত বেতন কমিশন গত ২১ ডিসেম্বর যে প্রতিবেদন দিয়েছিল তাতে ১৬টি গ্রেডে বেতন কাঠামো প্রস্তাব করা হয়েছিল। তবে পাঁচ সদস্যের সচিব কমিটির সুপারিশে আগের মতো ২০টি গ্রেড রাখার পক্ষে মত দেওয়া হয়েছে।
এদিকে পাঁচ শতাংশ হারে প্রতিবছর বেতন বাড়ানোর নতুন প্রস্তাবটি বাদ দিয়ে নতুন অষ্টম জাতীয় বেতন কাঠামোয় টাইম স্কেল ও সিলেকশন গ্রেড বহাল রাখার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এ সংক্রান্ত সারসংক্ষেপ তৈরির কাজ শুরু করেছেন অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্টরা। পে-কমিশন ও সচিব কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী টাইম স্কেল ও সিলেকশন গ্রেড বাদ দিয়েই নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের বিষয়টি চূড়ান্ত করেছিল সরকার। কিন্তু কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের চাপের মুখে সরকার নিজের অবস্থান থেকে সরে এসেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে এসব তথ্য।
এ প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত মঙ্গলবার বলেছিলেন, প্রস্তাবিত পে-স্কেলে টাইম স্কেল ও সিলেকশন গ্রেডের বিষয়টি নতুন করে ভেবে দেখা হবে। তিনি আরও বলেছেন, টাইম স্কেল ও সিলেকশন গ্রেড একসঙ্গে রাখার পক্ষে নই। এর মধ্যে যে কোনো একটি বাদ দেব। বিষয়টি নিয়ে আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখা হবে।
উল্লেখ্য, অষ্টম জাতীয় পে-কমিশন সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের টাইম স্কেল ও সিলেকশন গ্রেড বাতিলের সুপারিশ করে সরকারের কাছে প্রতিবেদন দাখিল করে। নতুন বেতন পে-স্কেল পর্যালোচনা সংক্রান্ত সচিব কমিটিও তাদের প্রতিবেদনে কমিশনের সুপারিশ বহাল রাখে। ১৪ মে অর্থমন্ত্রীর কাছে এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন জমা দেয়া হয়।
নতুন পে-স্কেলে টাইম স্কেল ও সিলেকশন গ্রেড বাতিল হচ্ছে এ খবর ছড়িয়ে পড়লে সচিবালয়সহ সারা দেশের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে সৃষ্টি হয় তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ। গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দফতরের কর্মকর্তা-কর্মচারী সংগঠনগুলোর (নন-ক্যাডার) পক্ষ থেকে এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানো হয়। একই সঙ্গে বেশ কয়েকজন সিনিয়র মন্ত্রী ও বেতন পর্যালোচনা কমিটির সভাপতির সঙ্গে দেখা করে তারা তাদের ক্ষোভ ও অসন্তোষের কথা জানায়। আন্দোলনকারী সংগঠনের নেতারা অর্থমন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের কাছে এ সুবিধা দুটি বহাল রাখার অনুরোধ জানান।
সরকারের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এদিকে টাইম স্কেল ও সিলেকশন গ্রেড বাদ দিলে প্রশাসনে অস্থিরতা সৃষ্টি হবে এমন আশংকার কথা জানিয়ে একটি গোয়েন্দা সংস্থা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে রিপোর্ট দিয়েছে। এরপরও সরকার টাইম স্কেল ও সিলেকশন গ্রেড বাদ দিয়ে নতুন পে-স্কেল অনুমোদনের জন্য মন্ত্রিপরিষদ বৈঠকে তোলার সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছিল। কিন্তু আন্দোলনের চাপের মুখে সরকার কিছুটা নমনীয় হয়ে ওঠে। সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে এ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। উল্লেখ্য, ৩ আগস্ট জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে ২৪তম বিসিএস অ্যাডমিন ক্যাডারের ৩০৫ কর্মকর্তার সিলেকশন গ্রেড প্রদান করা হয়। শেষ সময়ে এ ধরনের সিদ্ধান্ত অন্যান্য কর্মকর্তা ও কর্মচারীর ব্যাপারে ইতিবাচক ইঙ্গিত বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বাংলাদেশ সচিবালয় কর্মকর্তা ও কর্মচারী এক্য পরিষদের সাংগঠনিক সম্পাদক মো. জাকারিয়া হাসান শুক্রবার ২১ আগস্ট বলেছেন, অর্থমন্ত্রী টাইম স্কেল ও সিলেকশন গ্রেড নিয়ে ভাববেন এ কথা বলেছেন। আমরা এ বিষয়টি ইতিবাচক বলে মনে করছি। কিন্তু এ দুই সুবিধার মধ্যে একটি বাদ দেয়া হলেও অনেকে বঞ্চিত হবেন এ সুবিধা থেকে। এটি মোটেও কাম্য হবে না।
টাইম স্কেল : সাধারণত কোনো চাকরিজীবী ১৫ বছরেও কোনো কারণে পদোন্নতি না পেলে সে ক্ষেত্রে ৮ বছর পর ১টি, ১২ বছর পর ১টি এবং ১৫ বছর পর আরও ১টি করে মোট ৩টি টাইম স্কেল পেয়ে থাকেন। প্রতিটি টাইম স্কেল পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট চাকরিজীবীর বেতন স্কেল এক ধাপ ওপরে উন্নীত হয়। এটি টাইম স্কেল নামে পরিচিত। এতে করে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারী পদোন্নতি না পেলেও আর্থিক সুবিধা পেয়ে থাকেন। বিশেষ করে সরকারি চাকরির ৬৫ শতাংশই ব্লকপোস্ট রয়েছে। যাদের পদোন্নতি পাওয়ার সুযোগ নেই। তারাই মূলত এর সুবিধাভোগী। ১৯৮১ সালে ক্যাডার সার্ভিসে টাইম স্কেল চালু হলেও ১৯৮৩ সালে তা নন-ক্যাডার পদেও চালু হয়।
সিলেকশন গ্রেড : পদ না থাকা বা ভিন্ন কোনো কারণে একই স্কেলে সন্তোষজনকভাবে দীর্ঘদিন চাকরির পর অনেকে পদোন্নতি পান না। এ ধরনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে নির্বাচিত কিছু ব্যক্তিকে কিছু শর্তসাপেক্ষে উচ্চতর স্কেল প্রদান করা হয়। এ পদ্ধতিকে সিলেকশন গ্রেড বলা হয়। সত্তরের দশকে এ পদ্ধতি চালু হয়।
নতুন কাঠামোতে সর্বোচ্চ বেতন থাকছে ৭৫ হাজার টাকা ও সর্বনিম্ন আট হাজার ২৫০ টাকা। তবে মন্ত্রিপরিষদ ও মুখ্য সচিবের বেতন ৯০ হাজার টাকা (নির্ধারিত) এবং সিনিয়র সচিবের বেতন ৮৪ হাজার টাকা (নির্ধারিত)। অর্থমন্ত্রী বাজেট ঘোষণার আগেই জানিয়ে রেখেছেন যখনই ঘোষণা আসুক না কেন এ বছরের ১ জুলাই থেকে নতুন কাঠামোতে বেতন পাবেন সরকারি চাকরিজীবীরা।


