বুধবার ৪ নভেম্বর ২০২৬

ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে ট্রেন

Train_Accidentএক সময় বলা হতো ট্রেন জার্নি একেবারে নিরাপদ। বাস এড়িয়ে মানুষ ট্রেনেই চলাচলকে ঝুঁকিমুক্ত মনে করতেন। কিন্তু সেই দিন আর নেই। একের পর এক দুর্ঘটনা ঘটছে। প্রতিদিন কমপক্ষে দু-চারটি যাত্রীবাহী কিংবা মালবাহী ট্রেনের লাইনচ্যুতির ঘটনা ঘটছেই। সেই সঙ্গে বাড়ছে দুই ট্রেনের মুখোমুখি সংঘর্ষ ও রেলক্রসিংয়ে দুর্ঘটনাও। এর ফলে সাধারণ যাত্রীদের প্রাণহানিসহ সরকারের লোকসান গুনতে হচ্ছে কোটি কোটি টাকা। এসব দুর্ঘটনার কারণে ৫-৭ ঘণ্টা ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকায় সিডিউল বিপর্যয়ে যাত্রী দুর্ভোগ চরমে উঠছে। এক একটি লাইনচ্যুত ও দুর্ঘটনাকবলিত ট্রেন উদ্ধারে ২ লাখ থেকে ১ কোটি টাকার ওপরে খরচ হচ্ছে। সিডিউল বিপর্যয়ের কারণে ট্রেন বাতিলের জন্যও লোকসান গুনতে হচ্ছে লাখ লাখ টাকা। লাইনচ্যুতের ঘটনা কমিয়ে আনতে ক্রুটিগুলো চিহ্নিত করে উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নেয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন রেলওয়ের মহাপরিচাল।

মঙ্গলবার ঢাকা-চট্টগ্রাম লাইনের সীতাকুণ্ডে ট্রেন দুর্ঘটনায় তিনটি আন্তঃনগর ট্রেনের সিডিউল বাতিল করায় টিকিট ফেরতসহ লোকসান গুনতে হয়েছে প্রায় ১৬ লাখ টাকা। দুর্ঘটনা ও লাইনচ্যুতের পর পরিস্থিতি সামাল দিতে তাৎক্ষণিকভাবে সংশ্লিষ্টদের সাময়িক বরখাস্ত ও তদন্ত কমিটি গঠন করেই দায় সারছেন কর্তৃপক্ষ। রেল কর্তৃপক্ষ অধিকাংশ ক্ষেত্রে লোক দেখানো তদন্ত কমিটি গঠন করলেও এগুলো যেমন আলোর মুখ দেখে না, তেমনি সুপারিশও বাস্তবায়ন হয় না।

রেলপথ মন্ত্রণালয় ও রেলওয়ে বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, প্রতি মাসে ট্রেন লাইনচ্যুতিসহ রেলক্রসিংয়ে দুর্ঘটনা ঘটে কমপক্ষে ১০০ থেকে ১১০টি। এর মধ্যে ৭৫ শতাংশ লাইনচ্যুতের ঘটনা ঘটছে শুধু লাইনে পর্যাপ্ত পাথর না থাকার কারণে। তাছাড়া ৪০ থেকে ৬০ বছরের পুরনো মেয়াদ উত্তীর্ণ ইঞ্জিন ও বগি, অদক্ষ চালক এবং রেলক্রসিংয়ের গার্ডদের অনুপস্থিতির কারণে ঘটে বাকি ২৫ শতাংশ দুর্ঘটনা। ২ হাজার ৮৭৮ কিলোমিটার রেলপথে মোট ২৫৪১টি রেলক্রসিংয়ের মধ্যে প্রায় ১৩০০ রেলক্রসিংই অবৈধ। আইন না মানা, অবৈধ ক্রসিংগুলোতে গেটম্যান না থাকা, বৈধগুলোতে পর্যাপ্ত লোকবল না থাকা ও ক্রসিং ঘেঁষে অবৈধ বাজার দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ বলে মনে করেন খোদ রেলওয়ে কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞরা। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে এসব কারণে ট্রেন দুর্ঘটনা ঘটলেও সমস্যা সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ নেই।

লাইনচ্যুতির বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, স্লিপার ও ক্লিপ না থাকায়ও লাইনচ্যুতির ঘটনা ঘটছে। পুরো রেললাইনে প্রতি বছর ২২ লাখ ঘনফুট পাথর প্রয়োজন হলেও দেয়া হচ্ছে ৭ থেকে ৮ লাখ ঘনফুট পাথর। পুরো রেলপথে পূর্ণ মাত্রায় পাথর দিতে এক বছরে খরচ হয় ৩৩ কোটি টাকা। অথচ রেলের লাইনচ্যুতে বগি ও ইঞ্জিন উদ্ধার এবং লাইন মেরামতে প্রতি বছর কমপক্ষে ৬০ থেকে ৬৫ কোটি টাকা খরচ হচ্ছে। ১৯ জুন চট্টগ্রামের দোহাজারীতে মালবাহী ট্রেন ব্রিজ ভেঙে নিচে পড়ে যাওয়ার ঘটনায় এটির উদ্ধার প্রক্রিয়ায় প্রায় ৭৫ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। পূর্বাঞ্চল রেলওয়ে প্রধান বাণিজ্যিক কর্মকর্তা সরদার সাহাদাত আলী জানান, ওই দুর্ঘটনায় একটানা প্রায় ১৭ দিনব্যাপী উদ্ধার তৎপরতা চলে। ১৭-১৮ দিন একাধিক উদ্ধারকারী ট্রেন ও জনবল কাজ করেছেন। উদ্ধারে প্রায় ৭০-৭৫ লাখ টাকা খরচ হলেও ব্রিজ ভেঙে তেলভর্তি ওয়াগন পানিতে পড়ায় ক্ষতিপূরণ গুনতে হয়েছে প্রায় ১ কোটি টাকা।

বাণিজ্যিক কর্মকর্তা সরদার সাহাদাত আলী বলেন, ট্রেন লাইনচ্যুত ও দুর্ঘটনায় সিডিউল বিপর্যয় হয়ে পড়ে।রেলওয়ে সংশ্লিষ্ট বিভাগ দ্রুততার সঙ্গে উদ্ধার প্রক্রিয়া চালালেও কোনো কোনো ক্ষেত্রে ২ ঘণ্টা থেকে ১১-১২ ঘণ্টা দুর্ঘটনায় কবলিত লাইন দিয়ে ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকে। যাত্রীদের দুর্ভোগ পোহাতে হয়। অনেক সময়ই ট্রেন বাতিল করে দিতে হয়।

রেলওয়ের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেন, রেলপথে ছোট-বড় যে কোনো দুর্ঘটনা কিংবা লাইনচ্যুতের ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। এসব গঠিত তদন্ত কমিটির কোনো সুপারিশই কাজে আসছে না। তিনি বলেন, রেলওয়েতে এখনও প্রায় ৪০ শতাংশ ট্রেন চালক ও গার্ডের স্বল্পতা রয়েছে। সরকার বাধ্য হয়েই অবসরে যাওয়া ট্রেন ড্রাইভার ও গার্ডদের চুক্তি ভিত্তিতে নিয়োগ দিয়েছে। যাদের সংখ্যা প্রায় ৭২ জন। এসব চালক ও গার্ডের ট্রেন দুর্ঘটনা কিংবা লাইনচ্যুতের ঘটনায় অবহেলা ও ক্রুটি থাকলেও কেবল চুক্তি ভিত্তিতে নিয়োগ থাকায় তাদের বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায় না।

রেলওয়ে কেন্দ্রীয় অপারেশন ও যান্ত্রিক বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, লাইনচ্যুত ও দুর্ঘটনায় রেলওয়ের যাত্রীসেবা তথা উন্নয়ন ম্লান হয়ে যাচ্ছে। চলতি বছরের শুরু থেকে আগস্ট মাসের ২৬ তারিখ পর্যন্ত সারা দেশে ছোট-বড় ৭শ’রও বেশি লাইনচ্যুতের ঘটনা ঘটেছে। রেলওয়ে ব্রিজ ভেঙে ও বৈধ-অবৈধ রেলক্রসিংগুলোতে কমপক্ষে ৩২টি দুর্ঘটনার ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় প্রাণহানিসহ কোটি টাকা লোকসান হচ্ছে। ২৩ জুলাই গাজীপুরে রেলক্রসিংয়ে ট্রেনের সঙ্গে লেগুনা সংঘর্ষে ৯ জন, ১৫ আগস্ট সৈয়দপুর এলাকায় ৪ পুলিশসহ ৫ জন, মঙ্গলবার সীতাকুণ্ডে ১ জন মারা গেছেন। রেলওয়ে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের শুরু থেকে আগস্ট মাস পর্যন্ত শুধু ট্রেন-বিভিন্ন যানবাহন সংঘর্ষে সাধারণ যাত্রীসহ ট্রেন যাত্রী নিহত হয়েছে ২৭ জন।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, প্রতিটি লাইনচ্যুতির ঘটনায় ট্রেনের ইঞ্জিন কিংবা বগি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কখনও কখনও উল্টে গিয়ে দুমড়ে-মুচড়ে যায় একাধিক বগিসহ ইঞ্জিনও। এসব দুর্ঘটনায় বগি, ইঞ্জিন ও রেললাইনের ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে হরহামেশা। সিগন্যাল ব্যবস্থাতেও ত্রুটি রয়েছে যথেষ্ট- এমনটা জানিয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক গার্ড জানান, শত চেষ্টায়ও ট্রেনের ইচ্ছাকৃতভাবে দুর্ঘটনা কিংবা লাইনচ্যুত বন্ধ করা যায় না। ট্রেন তার আপন গতিতেই চলে। ট্রেন চলাচলে লাইন ও সিগন্যাল সঠিক থাকা খুবই জরুরি জানিয়ে গার্ডরা জানান, লাইনে নেই পাথর, সি­পার নষ্ট, লোহার হুক নেই শত শত মিটারে। ফলে ট্রেন ঘনঘন লাইনচ্যুত হচ্ছে। বর্তমানে রেলওয়েতে থাকা ইঞ্জিন ও বগির প্রায় ৮০ শতাংশই মেয়াদ উত্তীর্ণ। ফলে উনিশ থেকে বিশ হলেই ট্রেনের লাইনচ্যুতি হচ্ছে।

জানা যায়, ১৯৭৭-৮৭ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের সিলেট জেলার ভোলাগঞ্জ ও পার্বতীপুরের মধ্যপাড়ায় থাকা দুটি পাথর কোয়ারিই রেলওয়ের পাথর সংগ্রহের প্রধান উৎস ছিল। বর্তমানে এ দুটি পাথর কোয়ারি থেকে যে পরিমাণ পাথর উত্তোলন করা হয়, তা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। ১৯৮০ সালের পর থেকেই শুধু ভারত থেকে আনা পাথরের ওপরই নির্ভরশীল হয়ে পড়ে বাংলাদেশ রেলওয়ে।

রেলের অপারেশন (পরিচালন) বিভাগ সূত্রে জানা যায়, পাথরবিহীন লাইনে ট্রেন লাইনচ্যুতি ও দুর্ঘটনার ফলে রেলওয়ে যে পরিমাণ অর্থ প্রতি বছর ব্যয় করে, তার ৩ ভাগের এক ভাগ অর্থ দিয়ে লাইনে যথাযথ পাথও দেয়া হলে ট্রেন লাইনচ্যুত বা দুর্ঘটনা অধিকাংশ কমে আসত।

এ ব্যাপারে রেলওয়ে মহাপরিচালক মো. আমজাদ হোসেন জানান, ট্রেন লাইনচ্যুতের ঘটনা দিন দিন কমে আসছে। তবে রেলক্রসিংয়ে যেসব ট্রেন দুর্ঘটনা ঘটছে তার জন্য দায়-দায়িত্ব যানবাহন চালকদেরই। অবৈধ রেলক্রসিংগুলো বন্ধ কিংবা স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট সিটি কর্পোরেশন এবং পৌরসভা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে লোকবল ও যথাযথ প্রক্রিয়া অবলম্বনের জন্য আলোচনা চলছে। তিনি বলেন, বৈধ ক্রসিংগুলোতেও বেপরোয়া যানচালকরা আইন অমান্য করে লোহার গেট পড়া থাকা অবস্থায়ই লাইন পারাপার করতে গিয়ে দুর্ঘটনা ঘটছে।

দুই ট্রেনের মুখোমুখি সংঘর্ষের ঘটনা সম্পর্কে মহাপরিচালক বলেন, এক্ষেত্রে ট্রেনচালক ও স্টেশন মাস্টারই মূলত দায়ী। দায়ীদের কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, ড্রাইভার, গার্ড ও স্টেশন মাস্টারের স্বল্পতা রয়েছে।

আরও পড়ুন