প্রতারিত ক্রেতাদের অভিযোগের কারণে মাঝেমধ্যেই ভ্রাম্যমান আদালতের অভিযানে শাস্তি পেলেও সুপার শপ ‘স্বপ্ন’র প্রতারণা কখনোই থামে না। চেইন সুপার শপ স্বপ্ন’তে বাজার করতে গিয়ে হরদম পকেট কাটা যাচ্ছে ক্রেতাদের। বেশিরভাগ ক্রেতা স্বপ্ন’র বাহারি বিজ্ঞাপনে প্রলুব্ধ হয়ে কেনাকাটা করতে গিয়ে নিয়মিত ঠকছেন। অথচ কম দামে ভালো পণ্য বিক্রির বিজ্ঞাপন দেয় স্বপ্ন। কিন্তু বাস্তবে স্বপ্ন বেশিরভাগ পণ্যে ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত মুনাফা করছে। স্বপ্নতে বিক্রি হওয়া প্রায় ২ হাজার ভোগ্যপণ্যের একটি গোপন মূল্য তালিকা থেকে এ তথ্য পাওয়া গেছে। আর নিম্নমানের পণ্য বিক্রির অভিযোগ তো পুরনো। এসব নিয়ে লেখালেখি না করতে স্বপ্নের পক্ষ থেকে গণমাধ্যমগুলোতে নিয়মিত নানাভাবে তদবির করা হয়।
জানা গেছে, স্বপ্ন’র বড় বড় বিজ্ঞাপনে হাতেগোনা কয়েকটি পণ্যের ছবি দিয়ে বলা হয়, এগুলো বাজার মূল্যের চেয়েও কম দামে পাওয়া যাবে স্বপ্নতে। এখানেই শুভংকরের ফাঁকি। আসলে এর বাইরে রয়ে গেছে স্বপ্নের শত শত পণ্য। এ সুবাদে কয়েকটিতে কম মূল্যে বিক্রির লোভ দেখিয়ে অন্য পণ্যে গলা কাটা দাম রাখে। যারা সময় বাঁচাতে এক ছাদের নিচে সব কিছু কেনাকাটা করতে নিয়মিত স্বপ্নে যান তারা খুব সহজেই এই ফাঁদ সম্পর্কে আঁচ করতে পারেন।
এদিকে শুধু দাম নিয়েই লুকোচুরি নয়, স্বপ্ন’র অনেক পণ্য এখনও নিুমানের। চটকদার বিজ্ঞাপন আর অভিনব বিক্রয় কৌশলে এই নিুমানের পণ্যই কিনতে বাধ্য করা হচ্ছে ক্রেতাদের। আর নকল এবং মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য বিক্রির অভিযোগে স্বপ্নকে বহুবার জরিমানা করেছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। এমনকি স্বপ্ন’র কর্মচারীদের জেলেও পাঠানো হয়েছে। কিন্তু অনিয়ম বন্ধ হয়নি। এছাড়া দোকানে সাজিয়ে রাখা মাংস পচে যাওয়ার রেকর্ডও রয়েছে তাদের। যা পরবর্তীতে বিক্রি করা নিয়ে এক সময় কেলেঙ্কারিও করেছে তারা। এর বাইরে কারওয়ান বাজার থেকে হাইব্রিড মাছ কিনে তা দেশী বলে চালানোরও রেকর্ড তাদের দখলে।
স্বপ্নের প্রতারণা নিয়ে শুক্রবার ২৮ আগস্ট সমকালের বিশেষ প্রতিনিধি রাশেদ মেহেদী তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছেন। তিনি বলেন, “আজ স্বপ্ন থেকে সকালে টক দই নিয়ে এলাম….বাসায় এসে আবিস্কার করা হল, এর মুখটা খোলা, খুব কায়দা করে খোলা মুখটা রাখা হয়েছে, প্রথম দেখায় বোঝার উপায় নেই, মনে হয় স্বপ্নের কারও খুব খেতে ইচ্ছে করছিল, মুখ খুলে চুরি করে এক চামচ খেয়ে আবার রেখে দিয়েছে…অতএব কি আর করা!”
রাশেদ মেহেদী আরও জানান, সুপার শপগুলো এখন বেশ জনপ্রিয়। তবে জনপ্রিয়তার সুযোগ নিয়ে নানা রকম দু’নম্বরিও চলছে সুপারশপওয়ালাদের। আমাদের এখানে খিলক্ষেতে ‘স্বপ্ন’ সুপার শপ আছে। কিছুদিন আগে এখান থেকে ‘নিউটেলা’ কিনলাম যেটা আমাদের পরিচিত ‘নসিলা’র মতই খাদ্যপণ্য। ৩৫০ গ্রামের দাম স্বপ্ন সুপার শপে ৪৯০ টাকা। কয়েকদিন পর আমার স্ত্রী আলমাস নামে একটি সুপার শপ থেকে নিউটেলা নিয়ে এলেন, একই ওজনের দাম ৩৫০ টাকা। এরপর একদিন স্বপ্নতে কিছু কেনা-কাটার ফাকে স্বপ্নের ম্যানেজারের কাছে জানতে চাইলাম, দামের এত পার্থক্য কেন? হাসিমুখে তার জবাব, আলমাস নিজেরা ইমপোর্ট করে, ওরা বড় চেইন, আমরা তো ইমপোর্টারের কাছ থেকে কিনে বিক্রি করি, তাই দামটা একটু বেশী। যাচাই করে দেখলাম আরও কয়েকটি পণ্যের ক্ষেত্রে স্বপ্ন আর অন্য দোকানে দামের পার্থক্যটা চোখে পড়ার মত।
স্বপ্নের প্রতারণার প্রমাণ পাওয়া যায় গত জুনেও। সে সময় স্বপ্নের দুইটি শোরুমে অভিযান চালায় ভ্রাম্যমাণ আদালত। গাজীপুর ও সিলেটের মতো শোরুমে পাওয়া যায় প্রতারণার প্রমাণ।
এর কিছুদিন আগে র্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালতের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আনোয়ার পাশা বলেছিলেন, “এক অভিযানে স্বপ্ন’র অন্তত দুই ট্রাক মেয়াদোত্তীর্ণ বিভিন্ন পণ্যসামগ্রী জব্ধ করা হয়েছিল। এসব পণ্য গোপন জায়গায় জমা করেছিল তারা। সেখানে রাসায়নিক ব্যবহার করে পুরনো মেয়াদের লেবেল তুলে নতুন মেয়াদ বসানো হচ্ছিল। এ ঘটনায় যাদের গ্রেফতার করা হয়েছিল তারা অকপটে নিজেদের দোষ স্বীকারও করেন।”
স্বপ্ন’র এক গোপন মূল্য তালিকায় দেখা গেছে, মাত্র ১১ টাকার টুথব্রাশ স্বপ্ন বিক্রি করছে ২৪ টাকায়। ব্রাশ বিক্রি থেকে স্বপ্ন’র নিট লাভ ৫৪ শতাংশ অর্থাৎ এক ব্রাশ থেকেই স্বপ্ন লাভ করছে দ্বিগুণেরও বেশি। তালিকায় দেখা যায়, লর্ড কোম্পানির একটি টুথব্রাশ ১৪ টাকায় কিনে ৪০ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। এখানে তারা নিট লাভ করছে ৬৬ শতাংশ। দেখা যায় প্রায় সব ধরনের টুথব্রাশ বিক্রি করা হচ্ছে দ্বিগুণেরও বেশি দামে। একইভাবে প্রায় গৃহস্থালি পণ্যতেও স্বপ্ন লাভ করছে প্রচুর। যেমন একটি ৯ ইঞ্চি ডেজার্ট প্লেটের ক্রয়মূল্য ১৬০ টাকা। কিন্তু সেটি বিক্রি করা হচ্ছে ২৯৫ টাকায়। এক সেট মাইক্রোওয়েভ হ্যান্ড গ্লাভস ও ম্যাট সেট স্বপ্ন ৪৫ টাকায় কিনে বিক্রি করছে ৭৩ টাকায়। তালিকায় দেখা যায়, একটি ফটো অ্যালবামের ক্রয়মূল্য ২৬০ টাকা। কিন্তু সেটি বিক্রি হচ্ছে ৪২০ টাকায়। ট্রিসিমি ব্র্যান্ডের ৪০০ এমএল শ্যাম্পুর বোতলের ক্রয়মূল্য ৪৮০ টাকা। স্বপ্নতে এটি বিক্রি করা হচ্ছে ৬৫৫ টাকায়। তবে সবকিছু ছাড়িয়ে স্বপ্ন সবচেয়ে বেশি লাভ করছে নানা ধরনের কসমেটিকস পণ্যে। তালিকায় দেখা গেছে ১০০ গ্রাম ফেসওয়াশের ক্রয়মূল্য ১৩৫ টাকা। কিন্তু এটি বিক্রি হচ্ছে ২২০ টাকায়। ৫০ গ্রামের একটি ক্রিমের ক্রয়মূল্য ১৫০ টাকা। কিন্তু এটি বিক্রি করা হচ্ছে ২৫০ টাকায়।
চাকচিক্যের আড়ালে স্বপ্ন নামের এই সুপার শপের প্রতিটি পরতে পরতে রয়েছে নানা ধরনের শুভংকরের ফাঁকি। তাদের বিজ্ঞাপনের ফাঁদে আটকে ক্রেতাদের পকেট কাটা গেলেও ফুলেফেঁপে উঠেছে স্বপ্ন’র ব্যবসা। ২০০৮ সালে মাত্র একটি শাখা নিয়ে যাত্রা শুরু করলেও ৬ বছরের ব্যবধানে স্বপ্ন’র শাখা এখন অর্ধশতাধিক। রাজধানী ছাড়িয়ে দেশের অন্তত ২০টি জেলায় বিস্তৃত হয়েছে স্বপ্ন সুপার শপের ব্যবসা। অথচ ‘স্বপ্ন’র স্লোগান ‘কষ্টের টাকায় শ্রেষ্ঠ বাজার’, যা প্রতারণা ছাড়া আর কিছু নয়।
ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন-২০০৯ এর ৪৪ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি কোনো পণ্য বা সেবা বিক্রির উদ্দেশ্যে অসত্য বা মিথ্যা বিজ্ঞাপন দ্বারা ক্রেতা সাধারণকে প্রতারিত করলে তিনি অনূর্ধ্ব এক বছরের কারাদণ্ড বা অনধিক দুই লাখ টাকা অর্থ দণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।
ভোক্তার অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের এক কর্মকর্তা বলেন, স্বপ্ন’র সুপার শপে গিয়ে নানা ধরনের প্রতারণার শিকার হয়েছেন বা ঠকেছেন এমন অনেক ক্রেতা অধিদফতরে অভিযোগ করেছেন। এসব অভিযোগ আমলে নিয়ে তদন্ত করতে গিয়ে অনেক ঘটনার সত্যতাও পাওয়া গেছে।
নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা
নিউজওয়ার্ল্ডবিডি ডট কম।


