বুধবার ৪ নভেম্বর ২০২৬

যেভাবে বিপথে যায় উচ্চবিত্ত পরিবারের মেয়েরা

ঢাকার বারিধারায় বাড়ি। শিল্পপতি বাবার মেয়ে তাজরিনা। স্বনামধন্য প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে ল’তে পড়াশুনা করে। ছোট বেলা থেকে মা-বাবা দু’জনের মধ্যে মিল দেখেনি। বুঝতে শেখার পর থেকেই মা-বাবার আলাদা জীবন তাজরিনাকে নাড়া দিয়েছে। তার বন্ধু বান্ধবীদের মা-বাবার মতো করে নিজের মা-বাবাকে চাইলেও সেটা ছিল কল্পনা। একপর্যায় মা-বাবার সম্পর্কের টানাপড়েনে নিজেকে অনেক দূরে রাখতে হয়েছে। কারও সঙ্গে কোন কাজেই ভাল লাগতো না। নিজেকে অনেক অসহায় মনে হতো সব সময়। মনে হতো সব কিছু থেকেও কিছু নেই তার। খুঁজতো এখান থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার পথ। নিজেকে একা রাখতে চাইলেও সব সময় তাড়া করতো মা-বাবার সম্পর্কের দূরত্বের কথা।

একপর্যায় ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়ার সময় বন্ধুদের আড্ডায় ইয়াবা সেবন করে। ইয়াবা খাওয়ার পর নিজেকে অনেকটা হালকা মনে হয়। পৃথিবীর সকল কিছু থেকে কিছুক্ষণের জন্য দূরে থাকতে পারে। মরণঘাতী ইয়াবা তার নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে ওঠে। নিয়মিত ইয়াবা সেবনের একপর্যায়ে মা-বাবা জানতে পারে মেয়ে নেশাগ্রস্ত। পরে দুজনের মধ্যে রেশারেশি আরও বাড়তে থাকে।

ইতিমধ্যে সে ও লেভেল এ লেভেল শেষ করে ল’তে ভর্তি হয়েছে। নেশাগ্রস্ত জীবনও তাকে পুরোপুরি আষ্টেপৃষ্ঠে ধরেছে। ইয়াবা ছাড়া তার জীবন অচল হয়ে পড়েছে। সারাদিনে খাবার না খেয়ে থাকতে পারলেও ইয়াবা ছাড়া একদিন কাটানো তার জন্য নরকের যন্ত্রণায় পরিণত হয়ে ওঠে। এখন আর ইচ্ছা করলেই ছেড়ে দিতে পারে না। পরে সিদ্ধান্ত নেয় রিহ্যাব সেন্টারের শরণাপন্ন হবে। এখানে সম্মান নষ্ট হওয়ার ভয়ে বাদ সাধে মা-বাবা। তাদের ইচ্ছা রিহ্যাবে দিতে হলে বিদেশের কোনও হাসপাতালে পাঠাবে। কারণ সেখানে তাদের কেউ চেনেন না। মেয়ে যেন কোনভাবেই বাংলাদেশের কোনও রিহ্যাবে ভর্তি না হয় সেই জন্য চাপ প্রয়োগ করে।

তবে তাদের নিষেধাজ্ঞাকে অমান্য করে নিজেই যোগাযোগ করে বারিধারার প্রমিসেস নিরাময় কেন্দ্রে। দীর্ঘদিন থেরাপি নেয়ার পর এখন সুস্থ। বাড়িতেই থাকে। পড়াশুনা আগের মতো চালিয়ে যাচ্ছে। ইয়াবা না খেলে এখন আর কোনও সমস্যা হয় না। প্রমিসেস সেন্টারের পরিচালক সোহেল এইচ খান বলেন, আমরা সাধারণত রোগীদের ইতিহাস জানার চেষ্টা করি। কারণ জেনে প্রথমে তাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে তুলি। এর পর কোন কাজ করলে তারা এটাকে খুব শিগগিরই ছেড়ে দেবে সেই অনুযায়ী থেরাপি দিয়ে থাকি। এভাবেই তাজরিনা সুস্থ হয়ে ওঠে।

অন্যদিকে বাবা-মায়ের একমাত্র মেয়ে বৃষ্টি। পড়ালেখা করতো রাজধানীর স্বনামধন্য একটি স্কুলে। মা-বাবা দুই জনই সরকারি চাকরিজীবী হওয়ায় স্কুল থেকে বাসায় ফিরে প্রায় সারা দিনই একা থাকতে হতো তাকে। এটা ছিল তার নিত্যদিনের রুটিন। বাবা-মায়ের অভাব কতটুকু সেটা বলতে না পারলেও মানসিকভাবে বিষণ্নতায় ভুগতো। ৯ম শেণীতে পড়াকালীন বন্ধুদের আড্ডায় প্রথম মাদক সেবন করে। সেদিন খুব কষ্টই পেয়েছিল বৃষ্টি। নিজেকে মাদকের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারেনি। বন্ধুরা সবাই মাদক সেবন করে, কোন সমস্যা হয় না। অথচ সে চেষ্টা করেও পারে না বলে অনেকেই টিটকারি করতো।

অন্যদিকে বাসায় গিয়ে সময় কাটানোর লোকের অভাবে বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানোকেই বেশি ভাল মনে করতো। একপর্যায় অন্যরা পারে আমি কেন পারবো না। জিদ করেই মাদক সেবনের চেষ্টা করে। প্রতিজ্ঞা করে যে ভাবেই হোক এটা আমাকে পারতেই হবে। পরামর্শ চায় বন্ধুদের কাছে। বন্ধুরা বলে প্রথম প্রথম এমন একটু হয়। কিছুদিন নিয়মিত খেলে সব সয়ে যাবে। পারতে হবে মানসিকতা থেকে ইচ্ছার বাইরে সেবন করতে থাকে। কয়েকদিনের মধ্যেই পুরোদস্তুর নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে বৃষ্টি।

ফেনসিডিল, ইয়াবা, হেরোইনসহ গ্রহণ করেছে প্যাথেডিনও। একপর্যায় বেশি বেশি টাকা চাওয়ায় বাবা-মায়ের সন্দেহ হয়। কয়েকদিন নজদারিতে রাখার পর বুঝতে পারে মেয়ে মাদকাসক্ত। শরীর স্বাস্থ্যের অবনতি ও সাধারণ মেয়েদের চয়ে একটু অন্যরকম জীবনযাপন করা দেখে ভর্তি করে মোহাম্মদপুরের ক্রিয়া মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে। ২ মাস ধরে চিকিৎসা নিচ্ছে সে। কেন্দ্রের পরিচালক নাসরিন আক্তার বলেন, বৃষ্টি সুস্থ হয়ে গেছে। এখন যে কোন দিন বাড়ি ফিরে যাবে।

লুবনার বাবাও ব্যবসায়ী। লুবনা একটু মোটা। এটা নিয়ে প্রায়ই ক্লাসে অন্যদের কথা শুনতে হয়। অনেকেই মুটকি বলে ডাকে। স্বাস্থ্য কমানোর জন্য খাওয়া কমিয়ে দিলেও তাতে কোন কাজ হয়নি। একদিন এক বান্ধবী জানায় ইয়াবা খেলে স্লিম ফিগার গড়া যায়। পর্দায় যেসব নায়িকাদের দেখা যায়। তাদের অনেকেই ইয়াবা খেয়ে নিজের স্লিম ফিগার ধরে রাখে। কিন্তু কোথায় পাবে এই ইয়াবা সেটা জানা ছিল না। এমনকি কিভাবে খেতে হয় এই ইয়াবা তাও জানতো না। যে বান্ধবী বলেছিল সেই একদিন যোগাড় করে দেয়।

কলেজের যেসব ছেলে-মেয়ে ইয়াবা খেতো তাদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। সেই থেকে খাওয়া শুরু। তবে কিছুদিন যেতে না যেতেই এটা নেশায় পরিণত হয়ে যায়। এটা না খেলে আর ভাল লাগতো না। এমনকি কোনদিন ইয়াবা না খেতে পারলে তার কিছুই ভাল লাগতো না। শরীরে যন্ত্রণা শুরু হয়ে যেত। একপর্যায় পুরো নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়লে মা-বাবার নজরে আসে। চোখের নিচে কালো ডার্ক সার্কেল পড়ে যায়। অস্বাভাবিকভাবে শরীরের স্বাস্থ্যগত পরিবর্তন হয়। মেয়ে নেশা করে নিশ্চিত হয়ে বাবা-মা জোর করে মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে ভর্তি করায়।

সমাজবিজ্ঞানী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপিকা এম মাসুদা রশীদ চৌধুরী বলেন, আগের দিনে মায়েরা ছেলে-মেয়েদের নিয়ে ব্যস্ত থাকতো। বর্তমান সময়ে অনেক মা-বাবা দুজনই নিজেদের নিয়ে এতো বেশি সময় দেয়, ছেলে-মেয়েদের খেয়াল রাখে না। দেখা যায় দুজনই চাকরি বা ব্যবসা করে। এমন মা-বাবার ছেলে-মেয়েরা বেশি মাদকাসক্ত হয়। আবার অনেক সময় স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ঝগড়া বা মিল না থাকার কারণে ছেলে-মেয়েরা হতাশায় ভোগে। এখান থেকেও মাদকে জড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে টিন এজের বাচ্চাদের উপর মা-বাবার খুব বেশি খেয়াল রাখা উচিত। কারণ এই সময় তারা নতুন কিছু করতে চায়। অনেক কিছুই স্বাভাবিক ভাবে মেনে নিতে চায় না। মাদক এমন একটা জিনিস মিষ্টির মতো। একবার খেলে আবার খেতে মন চায়। অনেকেই মনে করে আরেকবার একটু মুখে দিয়ে দেখি না। এভাবেই নেশায় জড়িয়ে পড়ে। পরে আর ফিরতে পারে না।

আরও পড়ুন