দলের ওপর চেপে বসা জঙ্গি ও সন্ত্রাসীর তকমা মুছতে তৎপর বিএনপি। এ লক্ষ্যে তারা আন্দোলনের নতুন কৌশল নিয়েছে। একই সঙ্গে প্রতিবেশীসহ বিভিন্ন দেশের কাছে নিজেদের বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়াতে অন্য ধর্মের নেতাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানোর চিন্তা করছে। এ লক্ষ্যে পশ্চিমা বিশ্বসহ গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলোতে লবিস্ট নিয়োগের নীতিগত সিদ্ধান্তও নিয়েছে দলের হাইকমান্ড। ক্ষমতাসীনরা অনেকটা সাফল্যের সঙ্গে বিএনপির ওপর জঙ্গি ও সন্ত্রাসের তকমা লাগিয়ে দেয়ায় বিএনপি গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয়ে নতুন সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে বিএনপিপন্থী বুদ্ধিজীবী ড. এমাজউদ্দীন আহমদ বলেন, সরকার বিএনপির বিরুদ্ধে জঙ্গি-সন্ত্রাসী বলে যেসব প্রচারণা চালাচ্ছে, তা কঠোরভাবে মোকাবেলা করা হবে। এ জন্য প্রস্তুতিও নেয়া হচ্ছে। আমরা কয়েকজন মিলে কাজও করছি। খুব শিগগির সরকারের এসব অপপ্রচারের বিরুদ্ধে দেশ-বিদেশে অভিজ্ঞতা ও যোগ্যতাসম্পন্ন বেশ কিছু লোককে দায়িত্ব দেয়া হবে। বিশেষ করে, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলোতে এসব লোক নিয়োগ করা হবে। প্রতিবেশী দেশ ভারতের সঙ্গে আরও নিবিড় সম্পর্ক তৈরির জন্য কাজ চলছে। তার দাবি, ভারতের সঙ্গে বিএনপির সম্পর্কের বেশ উন্নয়ন হয়েছে।
জানা গেছে, সম্প্রতি দলের একাধিক নেতা ও দল সমর্থিত বুদ্ধিজীবীরাও বিএনপির হাইকমান্ডকে গুরুত্বপূর্ণ কিছু পরামর্শ দিয়েছেন। তারা বলছেন, বিশ্ব রাজনীতির সঙ্গে তাল মিলাতে হলে আস্থার সম্পর্কের বিকল্প নেই। তাই সামনে দলের প্রতিটি পদক্ষেপ এমনভাবে নিতে হবে যাতে করে দেশী-বিদেশী সব মহলই বুঝতে পারে বিএনপি কোনো প্রতিক্রিয়াশীল বা সন্ত্রাসী দল নয়। তারা বলেন, জামায়াতের সঙ্গে বিএনপির কেমন সম্পর্ক সে বিষয়টিও পরিষ্কার করতে হবে।
জানা গেছে, আগামী মঙ্গলবার লন্ডন যাচ্ছেন খালেদা জিয়া। এই সফরে চিকিৎসার বাইরেও ইউরোপের কয়েকটি দেশে যেতে পারেন। সেখানে বিএনপির প্রকৃত অবস্থান ওইসব দেশের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সামনে তুলে ধরার কথা রয়েছে। সম্প্রতি গুলশানে নিজের রাজনৈতিক কার্যালয়ে জন্মাষ্টমী উপলক্ষে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় অনুষ্ঠানে দলটির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া বলেছেন বিএনপি একটি অসাম্প্রদায়িক দল। আমরা সব ধর্মের সমান অধিকারে বিশ্বাস করি। সরকারের অপপ্রচারের জবাব দিতে এবং বিশ্ববাসীকে দলের অবস্থান জানান দিতেই দলটির চেয়ারপারসন এমন বক্তব্য দিয়েছেন বলে দলটির একজন ভাইস চেয়ারম্যান জানান।
জানা গেছে, বর্তমানে বিএনপির মহাসচিব নির্বাচনই বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে দলীয় চেয়ারপারসনের ওপর। মির্জা আলমগীরের গুরুতর অসুস্থতা দলকে ভাবিয়ে তুলেছে। তার অসুস্থ শরীর নিয়ে মহাসচিবের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে দায়িত্ব ৎলন করা সম্ভব হবে না। সামনে রাজনীতির মাঠও সহজ হবে না। দলের এই ক্রান্তিকালে বিকল্প কাউকে মহাসচিব হিসেবে ভাবা উচিত বলে মনে করেন দলের একটি অংশ।
এ বিষয়ে এমাজউদ্দীন আহমদ বলেন, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে খালেদা জিয়া কথা বলবেন। শারীরিক অসুস্থতার কারণে মির্জা ফখরুল যদি নিজেকে মহাসচিবের পদ থেকে সরিয়ে নেন, তাহলে সেটা এক কথা। তবে আমি যতদূর জানি, ডাক্তার তার চলাফেরার বিষয়ে যে সব আদেশ নিষেধ দিয়েছেন তা বিবেচনায় নিয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ নেবেন খালেদা জিয়া।
জানা গেছে, কয়েক মাস কারাবন্দি থাকার পরে চিকিৎসা উপলক্ষে জামিনে মুক্ত হন মির্জা ফখরুল। প্রথমে চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুর। সেখান থেকে যুক্তরাষ্ট্রে যান তিনি। বর্তমানে সেখানেই অবস্থান করছেন। এ অবস্থায় নতুন মহাসচিব নির্বাচনে দলের ভেতরে নানা কথাবার্তা হচ্ছে। বিকল্প মহাসচিব নিয়ে প্রস্তাবও এসেছে চেয়ারপারসনের কাছে।
দলের একটি অংশ বিকল্প মহাসচিব হিসেবে স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বরচন্দ্র রায়ের নাম প্রস্তাব করেছে। এছাড়া লন্ডনে চিকিৎসাধীন তারেক রহমানের কাছে দলের বিদেশী শাখার নেতাদের পক্ষ থেকে গয়েশ্বরকে মহাসচিব করার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। দলের এই অংশটি মনে করে, জঙ্গি তকমা ঘোচাতে ইসলাম ধর্মের বাইরের কোনো নেতাকে মহাসচিব করা হলে দলের জন্য মঙ্গল হবে। সেক্ষেত্রে বিএনপির বিরুদ্ধে ব্যবহার করা ক্ষমতাসীনদের জঙ্গি অস্ত্রটি ভোতা হয়ে যাবে।
তবে অপর অংশ, মির্জা ফখরুলকে মহাসচিব করার পক্ষে। তাদের যুক্তি হচ্ছে, ক্লিনম্যান হিসেবে মির্জা ফখরুলকে মহাসচিব করা হলে দলের ভাবমূর্তি আরও বাড়বে। তবে মির্জা ফখরুল শারীরিক কারণে না পারলে দলের স্থায়ী কমিটির অপর সদস্য নজরুল ইসলাম খানকে মহাসচিব করা যেতে পারে। এই আলোচনার মধ্যেই জাতীয় কাউন্সিলকে সামনে রেখে দলের মহাসচিব হিসেবে দলের কারাবন্দি যুগ্ম-মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর নাম বেশ ভালোভাবেই উচ্চারণ করছে। তবে কেউ কেউ ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমান, যুগ্ম-মহাসচিব মো. শাহজাহান, সালাহ উদ্দিন আহমেদের নামও উচ্চারণ করছেন। বিএনপির মতো একটি দলের মহাসচিব পদে অন্য ধর্মের কাউকে বসালে ভোটের রাজনীতিতে বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করে দলের একটি অংশ। এদিক থেকেও বিষয়টি বিবেচনায় নেয়ার অনুরোধ জানান তারা।
জানা গেছে, তবে এ বিষয়ে দলের শীর্ষ পর্যায় থেকে কোনো সংকেত দেয়া না হলেও বিএনপির ৩৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী, খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের কারমুক্তি দিবসের কর্মসূচি আয়োজনের পুরো দায়িত্ব দেয়া হয়েছে গয়েশ্বরচন্দ্র রায়কে। সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে বিএনপি চেয়ারপারসন বলেন, যেদিন থেকে আমি রাজনীতিতে এসেছি, গয়েশ্বরকে আমি দেখেছি, চিনি। আমি তাকে বিশ্বাস করি। এই অবস্থায় খালেদা জিয়ার এই বক্তব্য গয়েশ্বরের অবস্থান বেশ শক্ত বলে মনে হচ্ছে। এ বিষয়ে দলের চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ বিষয়ে মন্তব্য করা ঠিক হবে না।-যুগান্তর।


