বুধবার ৪ নভেম্বর ২০২৬

‎চৌকাঠ: সততা, না সত্যতা কার গুরুত্ব বেশি

Choukath_Newsworldbdএকটা নিটোল ছোট্ট পরিবার… একজন আপাত সুখী দম্পতি… কিছু ঘনিষ্ঠ সুহৃদ… একটা সামাজিক অনুষ্ঠান… কিছু বেপরোয়া মূহুর্ত… একটা অ্যাক্সিডেন্ট… এবং… এই ‘এবং পরবর্তী’ ঘটনাসমূহই হল পরিচালক রাজা দাশগুপ্ত পরিচালিত ‘চৌকাঠ’ ছবির মূল উপজীব্য।

আমি নিশ্চিত,যারা আমার এই সমালোচনাটি পড়বেন তাদের অধিকাংশই ইতিমধ্যে ছবিটি দেখে ফেলেছেন,এবং নিজ নিজ দৃষ্টিভঙ্গী দ্বারা সমালোচনাও করে ফেলেছেন।কিন্তু তাও ছবিটি দেখার পর নিজের মত করে একটু কাটাছেঁড়া করার লোভ সামলাতে পারলাম না।
শুরুতে গল্পটা সংক্ষেপে বলে নেওয়া দরকার।এই ছবিতে আদ্যান্ত নায়ক,নায়িকার পরিবর্তে যারা রয়েছেন তারা হলেন এক জোড়া দম্পতি- (বাবুয়া,দেবী) এবং (দিব্যেন্দু, শ্রেয়সী)। দিব্যেন্দুদের বিবাহবার্ষিকী থেকে সস্ত্রীক মদ্যপ অবস্থায় গাড়ী চালিয়ে ফেরার সময় এক মারাত্মক দূর্ঘটনার সম্মুখীন হয় বাবুয়া,দেবী। অ্যাক্সিডেন্টের ফলে দেবী গাড়ী থেকে বাইরে ছিটকে পড়ে এবং বাবুয়াকে অচৈতন্য অবস্থায় উদ্ধার করে টিভি জার্নালিস্ট কনিকা মিত্র।কিন্তু দেবী নিরুদ্দেশ। প্রাক্তন সরকারী আমলার পূত্রবধূর রহস্যজনক নিরুদ্দেশের সংবাদকে মিডিয়ার মুচমুচে করে উপস্থাপন করার মূহুর্তেই প্রত্যাবর্তন করে দেবী। কিন্তু ঘটনাচক্রে দূর্ঘটনার পর থেকে সুস্থ হওয়ার মূহুর্ত পর্যন্তের মাঝের সময়কার কথা সে কিছুতেই মনে করতে পারেনা। ফলে দেবীর তথাকথিত প্রগতিশীল স্বামীর মনে দানা বাঁধতে থাকে সংশয়। দেবী কি তবে ধর্ষিতা হয়েছে?তাই লজ্জায় সে সেকথা বলতে পারছে না?

এখান থেকেই শুরু হয় সত্যতা ও সততার লড়াই। দেবীর স্মৃতিবিভ্রমের সততা বারবার হার মেনে যায় তার দূর্ঘটনা-পরবর্তী সত্যতার কাছে। এই সংসার,সমাজ তাকে দাঁড় করিয়ে দেয় সততা ও সত্যতার মাঝের জটিল য-ফলাটায়।হার মানতে মানতে এক সময় দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ায় সততা বসে পড়ার পরিবর্তে ঘুরে দাঁড়ায়,পেরিয়ে যায় সত্যতার নিয়মতান্ত্রিক গন্ডী।আর এখানেই নিহিত এই ছবির নামকরনের সার্থকতা।‘দেবী’ চরিত্রটি প্রকৃতপক্ষে সততারই ধারক,বাহক,এবং আমার কাছে এই ছবিটি সততার দেবীর মাধ্যমে সত্যের চেনাছকের গন্ডী পেরিয়ে যাওয়ার গল্প।

অভিনয় প্রসঙ্গে প্রথমেই বলতে হয় টোটা রায়চৌধুরীর কথা।বিষন্ন,দ্বিধাগ্রস্থ বাবুয়ার চরিত্রে তিনি যথাযথ।চশমার ওপারের তার গভীর চোখজোড়া নির্বাক ভাবেই যেন অনেক কিছু বলে যায়।তাই বাবুয়ার উপর পরিপূর্ন বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠতে পারা যায় না।আর এই ছবিতে টোটাকে দেখতেও বেশ সুন্দর লেগেছে আমার।

বিদীপ্তা চক্রবর্তী,অনির্বান গুহ পোড় খাওয়া অভিনেতা।শ্রেয়সী এবং দিব্যেন্দুর চরিত্র চমৎকার ফুটিয়ে তুলছেন তাঁরা। তবে তাদের দাম্পত্ত্ব জীবন আরেকটু দেখালে ভাল লাগত।ছবিতে চরিত্র দুটি যেন শুধুই বাবুয়া,দেবীকে ঘিরেই আবর্তিত হল।তবে দেবীর প্রতি শ্রেয়সীর আন্তরিকতা সত্যি মন ছুঁয়ে যায়।অনেক দিন পর এমন নিখাদ বন্ধুত্ব দেখলাম।

কনিকা মিত্রের চরিত্রে সায়নী ঘোষকে দেখে মনে হচ্ছিল,চরিত্রটা যেন তার জন্যই তৈরী।অনেক দিন পর,অন স্ক্রীনে এত স্মার্ট ঝকঝকে একজন টিভি জার্নালিস্টকে দেখলাম।কনিকা মিত্রের ভূমিকায় সায়নীকে বাছাই করার জন্য পরিচালককে কুর্নিশ।

বাকিদের সম্বন্ধে আলাদা করে কিছু বলার নেই।শ্বশুর মশাই শরদিন্দুর চরিত্রে অর্ধেন্দু ব্যানার্জীর মত তুখোর অভিনেতার থেকে অমন সংবেদনশীল অভিনয়ই কাম্য।বৌমাকে শাল দেওয়ার দৃশ্যটি আলাদা ভাবে মন ছুঁয়ে যায়।সত্যিই তো,ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় করে কী লাভ,যেখানে বর্তমানটাই অনিশ্চিত? এছাড়া বাবুয়াদের মেয়ে তিতিল,কাজের মেয়ে এবং অন্যান্যরাও যে যার জায়গায় ঠিকঠাক।তবে অনুসূয়া মজুমদারের অভিনয় খানিক চড়া লেগেছে আমার।

এবার আসি এই গল্পের কেন্দ্রবিন্দু ‘দেবী’ বা দেবলীনা মিত্রের ভূমিকায় শ্রীলেখা মিত্রের প্রসঙ্গে।অনেকেই হয়ত ভাববেন,যাকে দিয়ে শুরু করা উচিৎ ছিল,তাকে দিয়ে শেষ করছি কেন?আসলে,এতক্ষন যাদের নিয়ে আলোচনা করলাম,তারা নিজ নিজ চরিত্রের প্রতি অভিনয় দক্ষতা দিয়ে সর্বোচ্চ সুবিচার করেছেন।কিন্তু শ্রীলেখা মিত্র দেবীকে নিজের মধ্যে ধারন করে দেবীতে যাপন করেছেন মাত্র।দেবীর প্রক্ষোভগুলির সাথে একাত্ম হয়ে ওঠার পরিবর্তে,তিনি স্বয়ং হয়ে উঠেছেন দেবী।তাই অত্যন্ত সপ্রতীভ ভাবে নিজেকে নিংরে বের করে এনেছেন দেবীর রাগ,দুঃখ,অভিমান,দ্বিধা,অনমনীয়তা।অ্যাবর্শানের পর শ্রেয়সীকে জড়িয়ে ধরে দেবীকে কান্নায় ভেঙ্গে পড়তে দেখে বুক মুচরে উঠতে বাধ্য।এক কথায়, দুই যুযুধান মিত্র পারষ্পরিক মিত্রতা স্থাপন মারফৎ তাই হয়ে উঠেছেন একমেবাদ্বিতীয়ম।

‘চৌকাঠ’ শ্রীলেখা মিত্রের ফিল্মি কেরিয়ারের একটা মাইল ফলক কিনা বলতে পারবো না।তবে ‘চৌকাঠ’ ছবিতে শ্রীলেখা মিত্রের অভিনয় বাংলা চলচ্চিত্র জগতের একটা মাইল ফলক হয়ে থাকবে।চরিত্রাভিনেত্রী হয়ে ওঠা দক্ষ অভিনেত্রীদের পক্ষে খুব সহজ।কিন্তু চরিত্র হয়ে উঠতে পারেন কজন?

এই ছবিতে গানের ব্যবহার খুবই কম।তবে স্বল্প পরিসরেই যুগোত্তীর্ন দেবব্রত বিশ্বাসের মেঘমন্দ্র কন্ঠনিঃসৃত রবীন্দ্রসঙ্গীত ব্যবহার করে বাজীমাৎ করেছেন পরিচালক।

তবে এই ছবি থেকে আমার একটাই অপ্রাপ্তি রয়ে গেল। প্রতিটি ফ্রেম যেন বড্ড তাড়াতাড়ি বদলানো হল।চিত্রনাট্যর বুনোট আরেকটু টানটান হলে ভাল হত। এ যেন চেটেপুটে খাওয়ার বদলে,ঠোঁটের গোঁড়ায় চামচটুকু ছুঁয়েই সরিয়ে নেওয়া।বাবুয়া,দেবীর সুখের মূহুর্ত আর একটু বেশী দেখালে পরবর্তী কন্ট্রাস্টগুলোর সাথে রিলেট করতে আরো বেশী সুবিধা হত।তবে শেষ দৃশ্যে বাবুয়ার দেবীর হাত ছুঁয়ে যাওয়ার মাধ্যমে নির্বাকভাবে আন্তরিক যোগ পুনর্স্থাপনের মূহুর্তটি নিঃসন্দেহে চৌকাঠের সফল পরিসমাপ্তি।

‘চৌকাঠ’ ছবিটি দিনের শেষে একটাই প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায় আমাদের শিক্ষিত, প্রগতিশীল সমাজকে।সততা, না সত্যতা-কার গুরুত্ব জীবনে বেশি? কে হয়ে উঠতে পারে জীবনের নিয়ন্ত্রক? নাকী, উভয়ের পরষ্পরবিরোধীতা জীবনকে কখনও পরিনত করে নৈমিত্তিক যাপনে, আবার কখনও পেরিয়ে যায় সম্পর্কের এক্সপায়ারি ডেট?এর জবাব দিতে পারে একমাত্র সময় আর জীবন।পরিচালক যে একটা সাধারন ঘটনার মধ্যে দিয়ে জীবনের এই গুঢ় দর্শনটা তুলে ধরেছেন,তার জন্য তাঁর নিঃসন্দেহে সাধুবাদ প্রাপ্য।

পরিশেষে একটা কথাই লিখব,পরিচালকের প্রথম ছবি দর্শকদের প্রত্যাশার পারদ অনেকটাই চড়িয়ে দিয়েছে।আশা রাখবো,পরিচালকও ভবিষ্যতে এর মান রেখে, সব বাধা,বিপত্তি পেছনে ফেলে ক্রমাম্বয়ে পেরিয়ে যাবেন একের পর এক সীমাবদ্ধতার চৌকাঠ এবং স্বচ্ছন্দে পদার্পন করবেন নতুন নতুন সাফল্যের চৌকাঠে।

 

আরও পড়ুন