গল্প তিনটি নারী-পুরুষের বিবাহ-বহির্ভূত সম্পর্ক নিয়ে। আরও ভাল ভাবে, পুরুষের প্রেম ও প্যাশন নিয়ে। তিনটি কাহনের প্রথমটি ‘রাণুর প্রথম ভাগ’-এর লেখক বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়ের গল্প। সারা গায়ে সত্যজিৎ রায়ের আবেশ। দ্বিতীয়টি সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ, ছবির শেষে বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের সাররিয়ালিজম্-এর গন্ধ। তৃতীয়টি পরিচালক বৌদ্ধায়ন মুখোপাধ্যায়ের নিজের গল্প। অহেতুক চমকসর্বস্ব!
প্রথম গল্প ‘নাবালক’ পঞ্চাশের দশকের গন্ধমাখা সাদাকালো ছবি। রেডিওতে বন্যার খবর, কাগজে ‘অগ্নিপরীক্ষা’ রিলিজের বিজ্ঞাপন। বৃষ্টিতে খরাজ মুখোপাধ্যায়ের বাড়িতে তেলেভাজার আড্ডা, তাঁর বন্ধু সুমন মুখোপাধ্যায় মাঝে মাঝে লংফেলোর কবিতা আওড়ান, ছেলেবেলার প্রেমের গল্প বলেন। গ্রামের বাড়িতে আট বছরের ছেলে তখন কিছু না বুঝে পাড়ার ষোলো বছরের বউদি নয়নতারার প্রেমে পড়েছিল। শরীর তখনও জাগেনি, মনও কিছু বুঝত না। তবু ভাল লাগত নয়নতারাকে। সেই কালো মেয়ে পাড়ার বউমহলে আড্ডা দিত, বালকের নিস্পাপ নয়ন তাকে দেখে যেত। অভীক মুখোপাধ্যায়ের সিনেমাটোগ্রাফি এবং অর্ণব চক্রবর্তীর সঙ্গীত ছবিটাকে অন্য মাত্রায় নিয়ে গিয়েছে। মাটির নিকোনো বাড়ি, তালগাছে সোঁ সোঁ হাওয়া, গ্রামের কাদামাখা রাস্তা… সবেতেই কোথায় যেন মায়া রহিয়া গেল।
সুমন মুখোপাধ্যায়ের মেক আপ চমৎকার। বাবরি চুল, সরু গোঁফ, মিহি কণ্ঠ, সব কিছু নিয়ে তিনি সেই সময়ের প্রেমিক চরিত্রে মানিয়ে গিয়েছেন। আরও ভাল আট বছরের বালক চরিত্রে বর্ষণ ও ষোলো বছরের মেয়ের চরিত্রে অনন্যা। সম্ভবত, এরাই ছবির সেরা দুই কাহন। বাকিটা সত্যজিৎ জানেন! পথের পাঁচালীর তুলসী চক্রবর্তীর মতো এখানে আছেন গুরুমশাই মনু মুখোপাধ্যায়। ‘সমাপ্তি’র অপূর্বর জলকাদায় আছড়ে পড়ার মতো গ্রামের কাদা রাস্তায় জুতো, বাক্সপ্যাঁটরা নিয়ে হাঁটে নয়নতারার স্বামী অক্ষয় (বিশ্বনাথ)। ‘আমি তোমার প্রেমে হব সবার কলঙ্কভাগী’ রবীন্দ্রসঙ্গীতটি চমৎকার ব্যবহার করা হয়েছে, কিন্তু বাড়াবাড়ি অন্যত্র।
সাবটাইটেলে ব্র্যাকেট দিয়ে লেখা, ‘রবীন্দ্রনাথের গান’!
দ্বিতীয় গল্প ‘পোস্ট মর্টেম’-এ বর্ষার সকালে জয় সেনগুপ্তের বাড়িতে ভিজে ঝুপ্পুস হয়ে হাজির মোটা ফ্রেমের চশমা পরা সব্যসাচী চক্রবর্তী। সব্যসাচীর স্ত্রী জয় সেনগুপ্তের সঙ্গে প্রেম করতেন। দিঘা, গোপালপুরেও বেড়াতে গিয়েছেন। গত রাত্রে তিনি হঠাৎ আত্মহত্যা করেছেন। সব্যসাচী কারণ বুঝতে এসেছেন। আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দিল কে? প্রেমিক না স্বামী? মোটা চশমার কাচের আড়াল থেকে সব্যসাচী যখন মৃত স্ত্রীর প্রেমিককে বলেন, ‘আপনার চিঠির কথাগুলি আমারই কথা, যেগুলি আমি ওকে বলতে পারতাম না’, চমৎকার! জয় প্রেমিকার চিঠি কলের তলায় ধোয়ামোছা করে ছিঁড়ে ফেলছেন, সেই দৃশ্যটিও ভাল। গোলমাল অন্যত্র। মর্গে থইথই জল, এগজস্ট ফ্যান, জয় সেনগুপ্ত মৃতদেহের সাদা কাপড় উঠিয়ে দেখছেন। আচমকা বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের প্রভাব। পরকীয়া প্রেম সাররিয়ালিস্ট স্বপ্ন হতে যাবে কোন দুঃখে? অবৈধ প্রেমে পরনারীরা নিজেদের পতিদেবতাটিকে উদার, মহানুভব ইত্যাদি বলে থাকেন, ঘোর বাস্তব। সিনেমাটিক পরাবাস্তবের ছিদ্র সেখানে নেই!
বৌদ্ধায়নের কাহিনি অবলম্বনে তৃতীয় গল্প ‘টেলিফোন’ আরও সাঙ্ঘাতিক। হোয়াট্সঅ্যাপে পরকীয়া, ইন ভিট্রো ফার্টিলিটি অনেক কিছুই আছড়ে পড়েছে। নো মেক আপ লুক, ভেজা চোখে ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত সেখানে চমৎকার। তাঁর স্বামী আশিস বিদ্যার্থী পুলিশের সহকারী কমিশনার। খুনের তদন্তে গিয়ে এক নর্তকীর সঙ্গে আলাপ। অতঃপর বউ ঘুমিয়ে পড়লে হোয়াটস অ্যাপে মধ্যরাতের প্রেম। শেষে বাবার ফেলে যাওয়া লোডেড রিভলভার নিয়ে খেলতে খেলতে শিশুপুত্র মায়ের বুকে গুলি চালায়, রক্তে ভেজা ঋতুপর্ণার মৃত্যু। এমনই নাকি ছিল পুলিশ স্বামীর পরিকল্পনা! রোয়াল্ড ডালের গল্পের মতো চমক, শেষ দৃশ্যে অপরাধী-পুলিশ সব উল্টে যায়। কিন্তু প্রেমিকা হোয়াটস অ্যাপে উত্তর না দিলে আশিস বিদ্যার্থী ভিক্টোরিয়ার সামনে জিপ রেখে কেন যাত্রাপালার মতো চিৎকার করবেন, বোঝা যায় না।
সবচেয়ে বড় কথা, প্রথম ও শেষ গল্পে এত আকাশপাতাল তফাত কারও ছবিতে ছিল না। বাঙালির ইতিহাস নাই, সিনেমাও নাই!
তিনটি গল্পই তাই পুরুষের প্রেম-প্যাশন-পাপ নিয়ে। অহেতুক ‘তিন কন্যা’ টেনে লাভ নেই। সন্দীপ রায় একদা তৈরি করেছিলেন ‘চার’। রূপা গঙ্গোপাধ্যায়, অরিন্দম শীলেরা ছটি রিপুকেন্দ্রিক ছোট গল্প নিয়ে ‘ছয়’ নামে এক ছবি করেছিলেন। শরদিন্দু ও পরশুরামের তিনটি গল্প নিয়ে জয়দীপ ঘোষ তৈরি করেছিলেন ‘মায়াবাজার’। সুমন মুখোপাধ্যায়ের ‘মহানগর@কলকাতা’ তিনটি গল্পের সমাহার। সকলেই চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু এঁদের কারও ইমতিয়াজ আলি ছিলেন না।
পরিচালক কি বলছেন?
ছবির পোস্টারে একটা বড়সড় আওয়ার গ্লাস বা বালুঘড়ির ছবি। সেখানেই কায়দা করে লেখা হয়েছে ছবির নাম। আর ছবির পরিচালক বৌদ্ধায়ন মুখোপাধ্যায়ের দাবি বাঙালির ১০০ বছরের চালচিত্রের সঙ্গে জড়িয়ে আছে তাঁর এই ছবির বিষয়। কাজেই এই ছবি যে সময়ের কথা বলবে তাতে আর আশ্চর্য কী। ছবির নাম ‘তিনকাহন’। চিত্রপরিচালক ইমতিয়াজ আলি এই ছবির নিবেদক। প্রায় ৩০০–র ওপর বিজ্ঞাপন ছবির নির্মাতা বৌদ্ধায়নের এটিই প্রথম কাহিনীচিত্র। যা ৩৫টি দেশি–বিদেশি চলচ্চিত্র উৎসব থেকে নিয়ে এসেছে ১৭ পুরস্কার।
তিনটি পৃথক সময়ের তিনটি গল্প নিয়ে এই ছবি। বৌদ্ধায়নের মতে, এই তিনটি গল্পে ধরা হয়েছে বয় মিটস গার্ল, বয় লুজেস দ্য গার্ল এবং কামব্যাক অফ দ্য গার্ল-এর সূত্র। প্রথম গল্পটি বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়ের ‘বর্ষায় ছোটগল্প’ অবলম্বণে ‘নাবালক’। গল্প বলা শুরু হচ্ছে ১৯৫৪–তে কিন্তু গল্পে উঠে আসছে ১৯২০। ১৯৫৪–তে শৈলেন এক তাসের আড্ডায় তার ছেলেবেলার গল্প শুরু করে। তখন তার কাজ ছিল গ্রামের নতুন বৌদের কাছে স্বামীর আসা চিঠি পৌঁছে দেওয়া। তখন শৈলেনের বয়স ৮। একদিন গ্রামে এসে হাজির হল এক কমবয়সী নতুন বউ। আর সেই বউয়ের প্রেমে পড়ে গেল শৈলেন। কীভাবে তাই নিয়েই এই ছবি। ছবিতে কমবয়সী শৈলেনের ভূমিকায় অভিনয় করেছে হাবড়া হাই স্কুলের ক্লাস ফাইভের ছাত্র বর্ষণ শীল। এটাই তার প্রথম ছবি। কিন্তু প্রথম ছবিতেই পেয়েছে নর্থ ক্যারোলিনা চলচ্চিত্র উৎসবের পুরস্কার। আর সেই নতুন বউ নয়নতারার ভূমিকায় অভিনয় করেছে ক্লাস টুয়েলভের ছাত্রী অনন্যা সেন। আর বড় শৈলেনের ভূমিকায় আছেন সুমন মুখোপাধ্যায়। একেবারে অন্যরকম লুকে। এতটাই অন্যরকম যে চেনা দায়। ‘এমনিতেই আমার অভিনয়ে অনীহা। প্রথমে তাই ডিসকারেজই করেছিলাম বৌদ্ধায়নকে। ও অনেক ঘুরেফিরে এসে আবার বলল তোমাকেই করতে হবে। একেবারে মেকআপম্যান আনিয়ে চুলটুল তেল মাখিয়ে আঁচড়ে, গোঁফ টোঁফ লাগিয়ে একটা কাণ্ড ঘটাল। আয়নায় নিজেকে দেখে মনে হল, বেশ অন্যরকম লাগছে তো! তা হলে করি’, বললেন সুমন। তাঁর সঙ্গে যোগ করলেন, ‘তবে শুটিং করতে করতেই তার সেট, ক্রুদের কাজকর্ম, ডিসিপ্লিন ইত্যাদি দেখে বুঝতে পারছিলাম বেশ ভাল এবং অন্যরকম ছবি হতে চলেছে এটি।’ আর বৌদ্ধায়ন বললেন, ‘সত্যজিৎ রায় না থাকলে আমার এই জগতে আসাই হত না। তাই এই ছবিতে ‘পথের পাঁচালী’–র একটা ফ্লেভার আছে। প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত আমি ওঁকেই অনুসরণ করে গেছি।’ ছবিতে নয়নতারার স্বামীর চরিত্রে অভিনয় করেছেন বিশ্বনাথ বসু।
দ্বিতীয় গল্প সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের ‘স্বামী ও প্রেমিক’ অবলম্বনে ‘পোস্টমর্টেম’। ১৯৭৮–এর ভয়াল বন্যার প্রেক্ষিতে এই ছবির গল্প। এক মহিলার স্বামী ও প্রেমিক এই গল্পে মুখোমুখি। আর তার আগেরদিনই মারা গেছে সেই মহিলা। পুরোটাই চেম্বার ড্রামা। ছবিতে এই প্রেমিকের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন জয় সেনগুপ্ত। আর স্বামী জ্ঞানেশ মিত্তিরের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন সব্যসাচী চক্রবর্তী। সব্যসাচীর মন্তব্য, ‘আলাদা করে সেভাবে কিছু বলার নেই। শুধু এইটুকুই বলব যে বৌদ্ধায়নের সঙ্গে কাজ করে খুব ভাল লেগেছে। যখন প্রথম আমায় চরিত্রটি দেওয়া হয়, আমি বলি আমি করব না। কারণ, চরিত্রটা দেখেই মনে হয়, প্রচণ্ড ভাল একজন অভিনেতার কাজ। যেটা আমি নই। আমি এই চরিত্রটা করতে পারব না এমন ভয় হয়। আসলে এই ধরনের নর্মাল মানুষের চরিত্রে অভিনয় করা খুব কঠিন। গম্ভীর গলায় হাত দুটো বুকের কাছে জড়ো করে বললাম, তারপর আপনি কী করলেন আর ‘ফেলুদা’ হয়ে গেলাম— এই ব্যাপারটা অত সহজ নয়। সো আই ডিসাইডেড টু কুইট। কিন্তু বৌদ্ধায়ন আমায় ছাড়ল না। বললাম, বেশ তোমার ছবির যদি বারোটা তুমিই বাজাতে চাও, আমার আপত্তি নেই।’ সঙ্গে যোগ করলেন, ‘এতদিন বিভিন্ন চরিত্রের মধ্যে দিয়ে আমিই সবাইকে ভেঙে এসেছি। এই প্রথম সত্যি সত্যি একজন ভেঙে পড়া মানুষের ভূমিকায় অভিনয় করলাম।’ আর বৌদ্ধায়ন জানালেন, কাশ্মীরে বেড়াতে গিয়ে হোটেলের ঘরে বসে ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’ দেখতে দেখতে সব্যসাচী অভিনীত ‘বিপ্লব’ চরিত্রের মধ্যেই তাঁর জ্ঞানেশ মিত্তিরের সন্ধান পান তিনি।
তৃতীয় গল্প বৌদ্ধায়নেরই লেখা। নাম টেলিফোন। এই গল্পে অভিনয় করেছেন ধৃতিমান চট্টোপাধ্যায়, ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত, আশিস বিদ্যার্থী, সুমন্ত মুখোপাধ্যায় প্রমুখ। এই গল্পের মুখ্য ভূমিকাভিনেত্রী ঋতুপর্ণা বললেন, ‘গল্পটা সত্যি খুব সুন্দর। খুব থ্রিল আছে গল্পটার মধ্যে। সাসপেন্স আছে। বৌদ্ধায়ন দেখিয়েছে কীভাবে খুব অল্প সময়ের মধ্যে একটা সম্পর্ককে বিশ্লেষণ করা যায়। কিছু বেশ সুন্দর মূহূর্ত তৈরি হয়েছে ছবিতে। সঙ্গে আছে ছোট ছোট কবিতা, ছোট ছোট লেখা আর ছোট ছোট অনুভূতি।’ লিটল ল্যাম্ব ফিল্ম প্রযোজিত এই ছবি মুক্তি পায় ১১ সেপ্টেম্বর।


