দেশের বিভিন্ন স্থানে এক ও দুই টাকার কয়েক নিয়ে ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে ব্যবসায়ীরা। স্থানীয় ব্যাংকগুলো বলছে, আমরা শুধু টাকা জমা নিই, কয়েন নেওয়ার নিয়ম নেই। এর আগে দিনাজপুর ও টাঙাইলে এই ধরনের ভোগান্তির পর এবার যশোরেও একই অভিযোগ পাওয়া গেছে।
সেখানে এক ও দুই টাকার ধাতব কয়েন নিচ্ছেন না দোকানিরা। ব্যাংকের স্থানীয় শাখাগুলোতেও কয়েন গ্রহণে দেখা গেছে অনীহা। দুইয়ে মিলে বিপাকে পড়েছেন ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে পয়সা জমিয়ে অভ্যস্ত শিশুরাও।
সম্প্রতি কয়েক নিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা জারি হওয়ার পরও স্থানীয় ব্যাংক কর্মকর্তারা বলছেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশ শুধু কয়েনগুলো বিতরণ করার; নেওয়া বা না নেওয়ার বিষয়ে কোনো নির্দেশনা তারা পাননি।
পাশাপাশি ব্যাংকের ভল্টে কয়েন রাখার ব্যবস্থা না থাকার অজুহাতও দিয়েছেন কেউ কেউ।
সম্প্রতি সরেজমিনে শার্শা উপজেলার পল্লীর বাজারগুলো ঘুরে দেখা যায়, কোনো বাজারেই দোকানিরা এক টাকা ও দুই টাকার কয়েন নিচ্ছেন না।
তাদের অভিযোগ, কোনো ব্যাংক কিংবা কোম্পানির বিক্রয় প্রতিনিধিরা কয়েন না নেওয়ায় লোকসান গুণতে হচ্ছে তাদের। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের কাছে থাকা কয়েন দীর্ঘ সময় ধরে পড়ে থাকায় তাদের মূলধনেও টান পড়ছে।
নাভারন বাজারের ব্যবসায়ী নাজির হোসেন বলেন, “আমার কাছে অনেক টাকার কয়েন রয়েছে। কোনো ব্যাংক এগুলো না নেওয়ায় ব্যবসা করে যা লাভ হচ্ছে, পড়ে থাকা কয়েনের কারণে ব্যবসার সুফল পাচ্ছি না।”
একই অবস্থা জামতলা বাজারের মুদি দোকানি আনোয়ার হোসেনের।
খুচরা ব্যবসায়ীদের কাছে মালামাল বেচতে লেনদেনে তাকে কয়েন নিতে হয়। কিন্তু সেগুলো ব্যাংক বা কোম্পানির বিক্রয় প্রতিনিধিরা না নেওয়ায় বিপাকে পড়েছেন তিনি।
আনোয়ার বলেন, “ছোট ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ১০০ বা ২০০ টাকার সমপরিমাণ কয়েন না নিলে কেউ মালামাল নিতে চায় না। এজন্য বাধ্য হয়েই আমরা কয়েনগুলো নিই; কিন্তু এভাবে নিতে নিতে কয়েক হাজার টাকার কয়েন জমা হয়েছে।”
হাজার হাজার টাকা এসব কয়েন বড় কোনো কোম্পানির বিক্রয় প্রতিনিধি ও কোনো ব্যাংক না নেওয়ায় বিপাকে পড়েছেন জানিয়ে তিনি বলেন, “এসব কয়েন নিয়ে কি করব তা বুঝতে পারছি না।”
স্থানীয় বেকারি মালিক মনিরুল ইসলাম বলেন, বিভিন্ন মুদি ও চায়ের দোকানে রুটি বিস্কুট বিক্রির ক্ষেত্রে লেনদেনে তারা ২০০ থেকে ৩০০ টাকার সমপরিমাণ কয়েন দেয়।
“না নিলে পণ্য রাখবে না বলে জানিয়ে দেওয়া হয়। এজন্য বাধ্য হয়ে তাদের কাছ থেকে কয়েন নিতে হয়।”
এভাবে তার কাছে অনেক টাকার কয়েন পড়ে আছে জানিয়ে এই বেকারি মালিক বলেন, “ব্যাংক এগুলো না নেওয়ায় তা এখন বলতে গেলে অচল।”
অপরদিকে কয়েন চলছে না গুজবে কয়েন জমানো ‘মাটির ঘট’ ভেঙে বিপাকে পড়েছেন ছাত্রছাত্রী ও গৃহবধূরা।
উপজেলার সামটা এলাকার গৃহবধূ লেছি ইয়াছমিন বলেন, “আমার দুই মেয়ের টিফিনের টাকা থেকে জমানো দুই হাজার টাকার সমপরিমাণ কয়েন বাড়িতে ফেলে রাখতে হচ্ছে। দুই টাকার নিচের কোনো কয়েন এখন ফকিরও নিতে চায় না।”
গুজবের বিষয়ে বুধবার সরেজমিন পরিদর্শনের সময় উপজেলার বিভিন্ন বাজারের ব্যবসায়ীরা জানান, বাজারের প্রায় সব ব্যবসায়ীর কাছেই হাজার হাজার টাকার কয়েন জমা রয়েছে। স্থানীয় ব্যাংক এ কয়েন না নেওয়ায় তারা চরমভাবে হতাশ।
ব্যাংক লেনদেনের ক্ষেত্রে কয়েন গ্রহণ করলে এ সমস্যার সমাধান হতো বলে মনে করেন ব্যবসায়ীসহ স্থানীয়রা।
এ ব্যাপারে সোনালী ব্যাংক শার্শা উপজেলা সদর শাখার ব্যবস্থাপক মশিয়ার রহমান বলেন, “বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা মোতাবেক প্রতিটি লেনদেনের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ খুচরা টাকা অথবা মুদ্রা কিংবা কয়েন বিতরণ করার ঘোষণা রয়েছে।
“কিন্তু কয়েন গ্রহণের কোনো নির্দেশনা না থাকায় তা নিতে পারছি না। বিশেষ করে কয়েন রাখার কোন ব্যবস্থা ব্যাংকের ভল্টে নেই।”
একই কথা বললেন সোনালী ব্যাংক বাগআচড়া শাখার ব্যবস্থাপক ফারুকুজ্জামান। বাংলাদেশ ব্যাংক কয়েন নিতে কোনো নির্দেশনা দিলে অবশ্যই তারা কয়েন নেবেন বলে মন্তব্য করেন এই ব্যাংক কর্মকর্তা।
শার্শার ব্যাংক কর্মকর্তারা এ ধরনের নির্দেশনা পাননি বললেও গত ৭ সেপ্টেম্বর ছেড়া নোট ও ধাতব মুদ্রার পাশাপাশি ছোটবড় সব ধরনের নোট নিতে ব্যাংকলোকে নির্দেশ দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
ওই দিন বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রা ব্যবস্থাপনা বিভাগ থেকে জারি করা এক সার্কুলারে বলা হয়, কোনো ব্যাংকের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের নোট ও মুদ্রা গ্রহণে অনীহার অভিযোগ পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এরই মধ্যে ওই নির্দেশনা সব ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের কাছে পাঠানো হয়েছে বলেও ওই সার্কুলারে বলা হয়।
এ ব্যাপারে শার্শা উপজেলার ইউএনও আব্দুস সালাম বলেন, সরকারি কোনো ঘোষণা ছাড়া সরকার প্রবর্তিত টাকা বা মুদ্রা অচল ঘোষণা করা বা অচল হওয়ায় গুজব ছড়ানো কিংবা লেনদেনে বাধা সৃষ্টি করা সম্পূর্ণ বে-আইনি ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
তিনি বলেন, “সরকারি ঘোষণা ছাড়াই কিছু কিছু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন মানের মুদ্রা ও কয়েন অচল হওয়ার গুজব ছড়িয়ে লেনদেন করার ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করছেন। এ ব্যাপারে দুই এক দিনের ভিতরে মাইকিং করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”


