বুধবার ৪ নভেম্বর ২০২৬

শিক্ষার নামে হরিলুটের ব্যবসা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়

public _university_bd‘সমাজ সেবা’র মতো নিজেদের অলাভজনক আর সেবামূলক প্রতিষ্ঠান দাবি করে দেশের প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। ‘অলাভজনক’ বলে দাবি করলেও প্রায় সব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ই দেদার অর্থ কামাচ্ছে। টিউশনসহ বিভিন্ন খাতে, নানা অজুহাতে আদায় করা হচ্ছে মোটা অংকের ফি। এটিকে তারা লাগামহীন মুনাফার এক ব্যবসায় পরিণত করেছে।

শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আদায় করা এ অর্থ আয়-ব্যয়ের ক্ষেত্রে কোনো স্বচ্ছতাও নেই। নানা বৈঠকের নামে অহরহ হাতিয়ে নেয়া হচ্ছে টাকা। গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালনের নামেও ট্রাস্টি বোর্ডের একশ্রেণীর সদস্য বা তাদের নিকটাত্মীয়দের কোটি কোটি টাকা লুটে নেয়ার অভিযোগ রয়েছে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) হিসাবে দেখা গেছে, গত অর্থবছর পর্যন্ত বিগত ১৬ বছরে ৬৫ বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর ১২৩ কোটি টাকা আয়কর ধার্য করা হয়েছিল। কিন্তু এর ৮৫ কোটি টাকাই এনবিআর আদায় করতে পারেনি।

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মোহাব্বত খান বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অলাভজনক বলা হলেও বাস্তবে তারা লাভ করছে। এদের আয়-ব্যয়ে স্বচ্ছতা নিয়েও অভিযোগ আছে। এ জন্যই আমরা সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বার্ষিক হিসাব বিবরণীর নিরীক্ষা চেয়েছি।

ইউজিসির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দুটি দৃষ্টান্তের দিকে তাকালে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অর্থের নেশা বোঝা যাবে। একটি হচ্ছে, সেমিস্টার। বুয়েট ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ অধিকাংশ সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় যেখানে ৮ সেমিস্টারে অনার্স প্রোগ্রাম শেষ করে, সেখানে প্রায় সব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ১২ সেমিস্টারে অনার্স করেছে। এটা মূলত ঘন ঘন ভর্তি, টিউশন ও সেমিস্টারসহ অন্যান্য ফি নেয়ার জন্য। অপরটি হচ্ছে, ভ্যাট। সরকার কেবল টিউশন ফির ওপর সাড়ে ৭ ভাগ ভ্যাট আরোপ করেছিল। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ভর্তি, সেমিস্টার, ল্যাব এমনকি পরিচয় পত্রের ফি থেকেও ভ্যাট নিয়েছে বলে এনবিআরের কাছে তথ্য প্রমাণ আছে।
বুয়েটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মেহেদী আহমদ আনসারী বলেন, আমরা ৮ সেমিস্টারে স্নাতক প্রোগ্রাম শেষ করি। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ১২ সেমিস্টারে এটা সম্পন্ন করে। এজন্য মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় সম্প্রতি তার অ্যাক্রেডিটেশন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

একই প্রোগ্রামে একেক বিশ্ববিদ্যালয় একেক পরিমাণ অর্থ নিচ্ছে। ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে ৪ বছর মেয়াদি (১২ সেমিস্টারে) বিবিএ প্রোগ্রামের জন্য মোট ব্যয় করতে হয় পৌনে ৭ লাখ টাকা। একই ডিগ্রির জন্য নর্দার্ন ইউনিভার্সিটি নিয়ে থাকে পৌনে ৫ লাখ টাকা। এ দুই বিশ্ববিদ্যালয়ে ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে অনার্স প্রোগ্রামের জন্য যথাক্রমে প্রায় ৮ লাখ এবং সাড়ে চার লাখ টাকা ব্যয় করতে হয়। অথচ মানের বিচারে দুটি বিশ্ববিদ্যালয় কাছাকাছি অবস্থান করছে।

এমন চরিত্রের কারণেই সম্প্রতি আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত এমপি বলেন, অলাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে অনুমোদন নিয়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মালিকরা মুনাফা করছেন। এ জন্য তিনি তাদের ভ্যাট দেয়ার আহ্বান জানান।

তবে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় মালিক সমিতির সভাপতি শেখ কবির হোসেন বলে আসছেন, তাদের প্রতিষ্ঠান আইনত ট্রাস্টভুক্ত। এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের ওপর ভ্যাট-ট্যাক্স আরোপ হতে পারে না।

সম্প্রতি দেশের প্রথম বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নর্থসাউথ পরিদর্শন করে ইউজিসি। ওই পরিদর্শন টিমের এক সদস্য জানান, কিছুদিন আগে এ বিশ্ববিদ্যালয় অস্ট্রেলিয়ার ম্যাকারাই বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে একটি সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষর করে। এ উপলক্ষে নর্থসাউথের ট্রাস্ট্রি বোর্ডের সদস্যসহ কর্মকর্তাদের বিশাল বহর অস্ট্রেলিয়ায় যান। কিন্তু এ কাজে অত লোকের প্রয়োজন ছিল না। এটা আনন্দভ্রমণ ছিল। বিশেষ করে ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্যদের এভাবে যাওয়ার এখতিয়ার নেই।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়, ইউজিসি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তা ব্যক্তিরা জানান, বেশিরভাগ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রেই নানা প্রক্রিয়ায় অর্থ ভোগ-বিলাস আর লুটপাটের অভিযোগ রয়েছে।

জানতে চাইলে অধ্যাপক মোহাব্বত খান জানান, ট্রাস্টিরা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সরাসরি অর্থ নিতে পারেন না। এ জন্য নানা বৈঠকের সম্মানীর নামে ৫০ হাজার টাকা করে নেয়ার অভিযোগ আছে। কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে মাসে এভাবে অসংখ্য বৈঠক করে অর্থ নেয়ার ঘটনা আমরা শুনে থাকি। তার প্রশ্ন, সম্মানী কী কখনো একজনের বেতনের চেয়ে বেশি হতে পারে?

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সমিতির সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান আবুল কাশেম হায়দার বলেন, বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ের মালিক অর্থ বানানোর জন্য বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করেছেন। আইনে অলাভজনক থাকায় তারা সরাসরি টাকা নিতে পারেন না। তাই দায়িত্ব পালনের নামে ঘুরিয়ে নিচ্ছেন। উত্তরা ইউনিভার্সিটিতে স্বামী ভিসি, স্ত্রী প্রোভিসি। এমন আরও অনেক বিশ্ববিদ্যালয় পাবেন যারা পারিবারিক সদস্য নিয়ে ট্রাস্টি বোর্ড গঠন করেছেন। মূলত তারাই বেশি পরিমাণে ফি আদায় করছে। কারণ এটাই তাদের অন্যতম আয়ের উৎস। এটা তাদের কাছে চ্যারিটি নয়।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং ইউজিসি সূত্রগুলো জানিয়েছে, ব্যবসায়িক মানসিকতার কারণেই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ২০১০ সালের আইন প্রণয়নকালে মাত্রাতিরিক্ত সক্রিয় ছিল। আইনটি যাতে কঠোরভাবে প্রণীত হতে না পারে, সেজন্য তারা পদে পদে তদবির এমনকি বিঘ্ন ঘটিয়েছে। মন্ত্রণালয় পর্যায়ে সফল হতে না পেরে তখন সংসদীয় স্থায়ী কমিটির কয়েকজন সদস্যকে ম্যানেজ করে আইনের খসড়ায় কাটছাঁট করিয়েছিল।

এদিকে ইঙ্গিত করেই শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ ১৩ আগস্ট ইউজিসিতে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি এবং ভিসি-প্রোভিসিদের বৈঠকে বলেন, আমি দুটি ক্ষেত্রে আপস করে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন করেছি। একটি হচ্ছে, ছাত্রছাত্রীদের ফি কাঠামো, অপরটি অর্থ কমিটির চেয়ারম্যান পদ।

ইউজিসি কর্মকর্তারা জানান, আইনের খসড়ায় টিউশন ফি ইউজিসি থেকে অনুমোদন করানোর বিধান রাখা হয়েছিল। আর অর্থ কমিটির সভাপতি করার প্রস্তাব ছিল ভিসি বা কোষাধ্যক্ষকে। কিন্তু চূড়ান্ত আইনে দেশের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় ফি নির্ধারণের কথা রাখা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে ইউজিসিকে কেবল অবহিত করলেই চলে। আর অর্থ কমিটির চেয়ারম্যান করা হয়েছে ট্রাস্টি বোর্ডের (বিওটি) সভাপতিকে।

এ বিষয়ে এখন করণীয় কী? জবাবে ইউজিসির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বলেন, টিউশন ফি নীতিমালা করে দিতে হবে। এজন্য প্রয়োজনে আইন সংশোধন করতে হবে।

আরও পড়ুন