অন্যান্য ঈদ মৌসুমের চেয়ে এবার যানজট একটু ভিন্ন প্রকৃতির। প্রতিবার সাধারণত মহাসড়কে বড় ধরনের যানজট হয়। তবে এবার যানজট শুরু হয়েছে রাজধানীর ভেতর থেকেই। ঢাকা থেকে বের হওয়ার তিনটি পথেই গাড়ির দীর্ঘ সারি। এতে গাবতলী, টঙ্গী আর কাঁচপুর সেতু দিয়ে ঈদে ঘরমুখো মানুষের বের হতেই ৩-৪ ঘণ্টা সময় লেগে যায়। তবে দূরপাল্লার যানবাহন ঢাকা পেরিয়ে কিছু দূর গেলে যানজটের প্রকোপও কমতে শুরু করে।
ঈদের ছুটি কম হওয়া, একসঙ্গে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও গার্মেন্ট কারখানাগুলো ছুটি হওয়ায় গতকাল রাজধানীর প্রতিটি বাস টার্মিনালে ছিল ঘরমুখো মানুষের ভিড়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় বৃষ্টি আর ভাঙাচোরা সড়ক-মহাসড়ক। সব মিলিয়ে ঢাকা থেকে বের হতেই যাত্রীদের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছে।
বিভিন্ন রুটের যাত্রীরা জানান, মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকে যাত্রা করে গাজীপুর চৌরাস্তা পার হতেই সময় লেগেছে ৪ ঘণ্টা। একই অবস্থা ছিল কাঁচপুর সেতু পয়েন্টে। সায়েদাবাদ থেকে বেরিয়ে কাঁচপুর পর্যন্ত যেতে ৩ ঘণ্টার বেশি সময় লেগেছে। আর আসাদগেট থেকে গাবতলী যেতে সময় লেগেছে আড়াই-তিন ঘণ্টা।
মহাখালী থেকে টঙ্গী-গাজীপুর হয়ে চলাচলকারী দেশের উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলের বেশ কয়েকজন গাড়িচালক ও যাত্রীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রাজধানী থেকে বেরোনোর সময় মহাখালী থেকে গাজীপুর পর্যন্ত কমপক্ষে ছয়টি স্থানে এবং রাজধানীতে ঢোকার পথে আটটি স্থানে যানজটে আটকে থাকতে হয়। কোথাও সড়কের দুরবস্থা, কোথাও চালকদের অনিয়ম, আবার কখনো কখনো ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা যানজটের অন্যতম কারণ বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ রুটের একাধিক বাসচালক বলেন, টার্মিনাল থেকে বের হওয়ার পর বিমানবন্দর পর্যন্ত মোটামুটি স্বাভাবিক সময়েই যাওয়া যায়। কিন্তু এর পর আর গাড়ি চলতে চায় না। যানজটের কারণে লোকাল বাসগুলো বেশির ভাগই বিমানবন্দর পর্যন্ত গিয়ে আবার মুখ ঘুরিয়ে ফিরে আসছে। এসব বাস উত্তরা বা আবদুল্লাহপুর পর্যন্ত যাচ্ছে না। আর টঙ্গী সেতু থেকে স্টেশন রোড হয়ে গাজীপুর চৌরাস্তা পর্যন্ত রয়েছে ভয়াবহ যানজট। এ অংশ পার হতে ৩ ঘণ্টার বেশি সময় লেগে যাচ্ছে।
মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকে দেশের উত্তরাঞ্চলীয় জেলা বগুড়া, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, বৃহত্তর ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল ও সিলেট এলাকার বাস চলাচল করে। এ পথের যাত্রী ও বাসচালকরা গতকাল জানান, টঙ্গীর স্টেশন রোড থেকে চেরাগআলী, গাজীপুরা, জয়দেবপুর চৌরাস্তা, জয়দেবপুর থেকে কোনাবাড়ী, সফিপুর, চান্দুরা, টাঙ্গাইল রুটে সাভারের জামগড়া, ফ্যান্টাসি কিংডম ও আশুলিয়া সড়কের বাইপাইল এবং সিলেট রুটে টঙ্গীর স্টেশন রোড থেকে মীরেরবাগ ও নরসিংদীর পাঁচদোনায় তীব্র যানজট লেগে আছে।
এর কারণ কী জানতে চাইলে ঢাকা-সিলেট রুটে এনা পরিবহনের চালক মুজিবুর রহমান বলেন, ‘কারণ গাড়ি বেশি, রাস্তা চিকন। আবার বিভিন্ন স্থানে ভাঙাচোরা। এ কারণে ধীরে গাড়ি চালাতে হয়। আর বৃষ্টিতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি তো আছেই।’
একই অবস্থা সায়েদাবাদ থেকে কাঁচপুর সেতু পর্যন্ত। মাত্র ১২ কিলোমিটার অংশ পাড়ি দিতে কয়েক স্থানে যানজটে আটকে থাকতে হয় বলে জানান বাসচালকরা। চট্টগ্রাম, সিলেট, কুমিল্লা, ফেনী, নোয়াখালীসহ কয়েকটি জেলার জন্য একমাত্র রুট এটি। ফলে সায়েদাবাদ থেকে বেরিয়ে বাসগুলোর যাত্রাবাড়ী মোড় পার হতেই ১ ঘণ্টার বেশি লেগে যাচ্ছে। এর পর থেমে থেমে পুরো এলাকাতেই যানজট।
কুতুবখালী থেকে কাঁচপুর সেতু পর্যন্ত রাস্তার বেশকিছু অংশ আট লেনে উন্নীত হলেও বৃষ্টিতে বিভিন্ন স্থানে খানাখন্দে ভরে গেছে। এতে ধীরে চলছে গাড়ি। আর কিছু অংশে আট লেনে উন্নীতকরণের কাজ সম্পন্ন হয়নি। ফলে আট লেন থেকে চার লেনে ফিরে এসে আটকে যাচ্ছে যানবাহন। এতেও যানজট বাড়ছে। এছাড়া কাঁচপুর সেতুর ওপরও বিশাল যানজট ছিল।
গাবতলী থেকে আশুলিয়া হয়ে নবীনগর বা আরিচা পর্যন্ত পুরো সড়কই গতকাল রাত পর্যন্ত যানজটে আটকে ছিল। রংপুরের যাত্রী ফাহিম আহমেদ গতকাল বিকাল ৫টার সময় জানান, বেলা ৩টায় কল্যাণপুর থেকে গাড়িতে উঠেছেন। তবে ২ ঘণ্টায় তিনি কেবল গাবতলী পর্যন্ত পৌঁছেছেন। কখন রংপুর গিয়ে পৌঁছতে পারবেন জানেন না।
এদিকে উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন রুটের অনেক যাত্রী গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত বাসের জন্য কাউন্টারেই বসে ছিল। বিকাল ৫টায় ঢাকা থেকে রওনা হওয়ার গাড়ি সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা পর্যন্ত ঢাকায়ই ফিরে আসেনি। ফলে কখন সে গাড়ি ছেড়ে যাবে, তার কোনো ভরসা যাত্রীদের ছিল না।
অন্যদিকে রাজধানী থেকে বেরোনোর পথে জুরাইন-পোস্তগোলা অংশে দীর্ঘ যানজট না থাকলেও গাড়িগুলো এগোচ্ছিল ধীরগতিতে। মাঝেমধ্যে থেমেও যাচ্ছিল গাড়ি। গতকাল দুপুর ১২টার দিকে জুরাইনে দেখা গেছে এ দৃশ্য। এটি রাজধানী থেকে বের হওয়ার অন্যতম পথ। পোস্তগোলার বুড়িগঙ্গা প্রথম সেতু দিয়ে চলাচলকারী যানগুলোকে এ পথ ব্যবহার করতে হয়।
রাস্তা ভালো হলেও এ পথে গতকাল যে ধীরগতি দেখা গেছে, তার কারণ ছিল বাড়তি যানবাহনের চাপ, রাস্তায় বাস ও অন্যান্য গাড়ি থামিয়ে যাত্রী ওঠানো-নামানো, রেলক্রসিং, সিএনজিচালিত অটোরিকশার অবৈধ স্ট্যান্ড, ফুটপাত ছাড়িয়ে রাস্তার একাংশ পর্যন্ত দোকান উঠে আসা, পথচারী ও যান পারাপারে নিয়মের তোয়াক্কা না করা ইত্যাদি।
এলাকাবাসী, পরিবহনকর্মী, যাত্রী ও ট্রাফিক পুলিশের কর্মকর্তারা জানান, এখনো পরিস্থিতি সহনীয়। তবে উল্লিখিত বিষয়গুলোয় নজর দিয়ে যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে ঈদে এ পথে ঘরমুখো যাত্রীদের চরম ভোগান্তিতে পড়তে হতে পারে।
এদিকে ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-টাঙ্গাইল ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কেও গতকাল যানবাহনের ব্যাপক চাপ ছিল। বিভিন্ন যাত্রী ও পণ্যবাহী যানবাহন মহাসড়কে অত্যন্ত ধীরে চলাচল করে। তবে দীর্ঘ কোনো যানজট সৃষ্টি হয়নি।
অন্যদিকে দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে গতকাল দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া ঘাটে ফেরি চলাচলে সাবধানতা অবলম্বন করা হয়। এ কারণে দুপুরের পর থেকেই ঘাটে অপেক্ষমাণ গাড়ির দীর্ঘ লাইন সৃষ্টি হয়। গতকাল রাতের দিকে অবস্থা আরো খারাপ হয়। আন্তঃজেলা বাসগুলোর ফেরি পার হতেই ক্ষেত্রবিশেষে ৩-৪ ঘণ্টা সময় লেগে যায়।
হানিফ পরিবহনের কাউন্টার মাস্টার মিন্টু জানান, দৌলতদিয়া-পাটুরিয়ায় মঙ্গলবার রাত থেকে গাড়ি আটকা পড়ে আছে। পশুবাহী গাড়ির কারণে ঢাকায় ঢুকতে যেমন যানজট, তেমনি পশুরহাটের কারণে পথে বিভিন্ন স্থানে তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়েছে। একটি গাড়িকে গাবতলী বাস টার্মিনালে ঢুকতে হলে মিরপুর পলিটেকনিক্যাল পর্যন্ত ঘুরে আসতে হয়। এক্ষেত্রেও ১ ঘণ্টা সময় লাগে। সকাল থেকে বেলা ২টা পর্যন্ত এভাবে মাত্র দুটি গাড়ি টার্মিনালে এসেছে বলে জানান তিনি।


