ঢাকার সবচেয়ে নিরাপদ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত উত্তর গুলশানে ইতালীয় নাগরিক সিজারি তাভেল্লা খুনের পেছনে বেশ কিছু প্রশ্ন উঠেছে। এসব নিয়েই এগিয়ে চলছে প্রাথমিক তদন্ত।
ইতালির নাগরিক সিজারি তাভেল্লা হত্যাকাণ্ডে অংশ নেয় পেশাদার পাঁচ কিলার। এর মধ্যে ২০ থেকে ২২ বছর বয়সী দুই যুবক ওই বিদেশী নাগরিককে লক্ষ্য করে খুব কাছ থেকে (পয়েন্ট ব্ল্যাংক রেঞ্জ) গুলি ছোড়ে। বাকি তিনজন তাদের ‘সেফগার্ড’ হিসেবে অংশ নেয়। মৃত্যু নিশ্চিত করার পর ঘাতকরা দুটি মোটরসাইকেলে চড়ে ৮৩ নম্বর রোড দিয়ে উত্তর দিকে পালিয়ে যায়। পুলিশ সন্দেহভাজন ওই দুটি মোটরসাইকেল শনাক্ত করেছে। তবে ঘটনার সময় ওই এলাকা অন্ধকারাচ্ছন্ন থাকায় সিসি ক্যামেরার ফুটেজে ঘাতকদের ছবি ও মোটরসাইকেল দুটির নম্বরপ্লেট অস্পষ্ট দেখা গেছে।
এদিকে ঘটনার প্রায় এক ঘণ্টা আগে থেকে ঘাতকরা ওই এলাকায় অবস্থান করছিল বলে গোয়েন্দা পুলিশ নিশ্চিত হয়েছে। কিলিং মিশনে অংশ নেয়ার আগে তারা ঘটনাস্থলটি কয়েক দফা রেকি (পরিদর্শন) করে। ঘটনার পারিপার্শ্বিকতা, প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য ও আনুষঙ্গিক আলামত পর্যালোচনা করে গোয়েন্দারা নিশ্চিত হয়েছে ইতালির নাগরিক সিজারি তাভেল্লা হত্যাকাণ্ডটি পরিকল্পিত। দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করতে একটি চক্র পরিকল্পিতভাবে এ হত্যাকাণ্ডটি ঘটিয়েছে। আর চক্রটি হত্যাকাণ্ডে ব্যবহার করেছে পেশাদার কিলারদের।
সরকারের একটি গোয়েন্দা সংস্থার ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেছেন, মাত্র ৫ মাস (মে মাস) আগে ইতালির নাগরিক সিজারি তাভেল্লা বাংলাদেশে আসেন। এ কয়েক মাসে তার ব্যক্তিগত শত্র“ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা কম। বিদেশে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করতে এ খুনের ঘটনা ঘটানো হয়েছে। তবে নিহত সিজারি তাভেল্লা যে প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন সেই প্রতিষ্ঠানে কারও সঙ্গে দ্বন্দ্ব ছিল কিনা- সে বিষয়টিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে ওই গোয়েন্দা কর্মকর্তা জানান। ইতিমধ্যেই গোয়েন্দারা ওই প্রতিষ্ঠানের তিন কর্মকর্তা ছাড়াও নিহতের দুই বান্ধবীকে (ডাচ ও ইতালীয় নাগরিক) জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। এছাড়া সন্দেহভাজন ১২ জনকে আটক করেছে পুলিশ। মঙ্গলবার রাতে এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছিল।
সিজারি তাভেল্লা হত্যাকাণ্ডে গুলশান থানায় মামলা হয়েছে। নিহতের সহকর্মী হেলেন ভেন্দার বিক মঙ্গলবার সকালে থানায় এসে এই মামলা দায়ের করেন। মামলা নম্বর-৬৮।
এদিকে ইতালির নাগরিক সিজারি তাভেল্লাকে খুনের দায় ইসলামিক স্টেট (আইএস) স্বীকার করেছে বলে জানিয়েছে জঙ্গি হুমকি পর্যবেক্ষণকারী ওয়েবসাইট ‘সাইট ইন্টিলিজেন্স গ্রুপ’। সোমবার রাতে ওই হত্যাকাণ্ডের কয়েক ঘণ্টা পর ওই ওয়েবসাইটে এমন খবর প্রকাশ করা হয়। ওই খবরের সঙ্গে আরবিতে লেখা একটি বার্তাও জুড়ে দেয়া হয়। তবে বাংলাদেশে আইএসের তৎপরতার খবর প্রত্যাখ্যান করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জমান খান কামাল।
মঙ্গলবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সিজারি তাভেল্লা হত্যাকাণ্ড একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে দাবি করেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশে আইএসের কোনো অস্তিত্ব নেই। বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশে ২২ জন আইএস সদস্য সন্দেহে গ্রেফতারের বিষয়ে সাংবাদিকরা মন্ত্রীর কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কাউকে আইএস সন্দেহ হলে তাকে গ্রেফতার করা হয়। তারা বাংলাদেশে আইএসের কার্যক্রম বিস্তার করতে পারেনি। বাংলাদেশে আইএসের কোনো কার্যক্রমও নেই।’
গুলশানে কূটনৈতিক জোনে কঠোর নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে বিদেশী নাগরিক খুন হওয়ার পর পুলিশি নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সোমবার রাতে ঘটনার পর যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া ও কানাডা বাংলাদেশে তাদের দেশের নাগরিকদের চলাফেরায় সতর্কতা জারি করে।
আমেরিকান ক্লাব পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক হোটেলসহ যে স্থানে বিদেশীরা সমবেত হন, এমন স্থানে যাওয়া সীমিত করতে মার্কিন নাগরিকদের পরামর্শ দেয়া হয়েছে।
ঢাকার মার্কিন দূতাবাস তাদের কর্মীদের জন্য ঐচ্ছিক ছুটি ঘোষণা করেছে। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া অন্যদের দূতাবাসে আসতে নিষেধ করা হয়েছে।
কানাডা সরকারের ভ্রমণ সতর্কতা বিষয়ক ওয়েবসাইটে বাংলাদেশে সন্ত্রাসবাদের হুমকি এবং ভঙ্গুর রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণ দেখিয়ে তাদের দেশের নাগরিকদের উচ্চমাত্রায় সতর্কতা অবলম্বন করতে বলা হয়েছে।
এদিকে সোমবারের ওই ঘটনার পর গুলশানের কূটনৈতিক এলাকার নিরাপত্তা আরও এক ধাপ বাড়ানো হয়েছে।
কূটনৈতিক জোনে নিরাপত্তার বিষয়ে কারও গাফিলতি ছিল কিনা তা খতিয়ে দেখতে পুলিশ সদর দফতর একটি উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। কমিটির প্রধান করা হয়েছে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের যুগ্ম কমিশনার মনিরুল ইসলামকে। এর আগে সকালে তাভেল্লা হত্যাকাণ্ড নিয়ে পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বৈঠকে বসেন। পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সকালে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পুলিশ সদর দফতর ও ডিএমপি সদর দফতরে একাধিক বৈঠক করেন। তবে খুনের তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে কেউ কোনো কথা বলতে রাজি হননি। তবে মামলার তদন্ত শিগগিরই ডিবির কাছে হস্তান্তর করা হবে বলে বৈঠকে অংশ নেয়া এক কর্মকর্তা যুগান্তরকে জানান।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে র্যাব ইন্টেলিজেন্স উইংয়ের এক কর্মকর্তা জানান, ঘটনাস্থলের আশপাশে (৯০ নম্বর সড়কে) অন্তত ৫টি প্রতিষ্ঠানে ক্লোজসার্কিট (সিসি) ক্যামেরা রয়েছে। তবে ঘটনার সময় ওই এলাকায় বিদ্যুৎ না থাকায় সেখানকার কোনো ভিডিও ফুটেজ পাওয়া সম্ভব হয়নি। তবে ৮৩ নম্বর সড়কের যে প্রান্ত দিয়ে কিলাররা প্রধান সড়কে উঠেছে, সেখানকার একটি সিসি ক্যামেরায় দুটি মোটরসাইকেলে ৫ জনকে দ্রুত পালিয়ে যেতে দেখা গেছে। এর মধ্যে ছাই রঙের পালসার মোটরসাইকেলে ছিল তিনজন। আর কালো রঙের একটি পালসার মোটরসাইকেলে ছিল দু’জন। তবে সিসি ক্যামেরায় প্রদর্শিত রাস্তার অংশটুকু বেশ দ্রুতগতিতে পার হয়ে যাওয়ায় মোটরসাইকেল দুটির রেজিস্ট্রেশন নম্বর স্পষ্ট দেখা যায়নি। গোয়েন্দা পুলিশ ইতিমধ্যেই ৮৩ নম্বর সড়ক ছাড়াও গুলশান এভিনিউয়ের মোট ১৮টি ক্লোজসার্কিট ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করেছে। এসব সিসি ফুটেজ থেকে সন্দেহভাজন ঘাতক ও মোটরসাইকেলের ছবি শনাক্ত করার চেষ্টা করছে।
এদিকে ঘটনার সময় পাশের দুটি লাইটপোস্টে আলো না থাকা এবং ঘটনার কিছুক্ষণ পর আলো জ্বলে উঠার বিষয়টিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে গোয়েন্দারা জানিয়েছেন। এ ব্যাপারে গোয়েন্দারা সিটি কর্পোরেশনের সংশ্লিষ্ট জোনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে এরই মধ্যে কয়েক দফা কথা বলেছেন। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) গুলশান জোনের উপকমিশনার মোস্তাক আহমেদ জানান, ঘটনার সময় ওই এলাকায় চলাচলরত লোকজনের ছবি ও ভিডিও সংগ্রহের চেষ্টা চলছে।
স্থানীয়রা পুলিশকে জানিয়েছে, ঘটনার সময় ওই এলাকায় বিদ্যুৎ ছিল না। এ বিষয়টিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, তাভেল্লা হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটন ও খুনিদের ধরতে সোমবার রাত থেকে তাদের চারটি টিম কাজ করছে। মঙ্গলবার তাদের সঙ্গে আরও দুটি টিম যুক্ত হয়েছে। এসব টিম ঘটনাস্থলের আশপাশ এবং কিলারদের পালিয়ে যাওয়ার পথসহ বেশকিছু এলাকার প্রতিটি সিসি ক্যামেরার ভিডিও ফুটেজ সংগ্রহ করে তা ধারাবাহিকভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।
এছাড়াও অপর একটি টিম তাভেল্লা খুনের আগে ও পরে কারা ঘটনাস্থলের আশপাশের মোবাইল টাওয়ারের নেটওয়ার্কের আওতায় ফোনে কথাবার্তা বলেছে সে তালিকাও প্রস্তুত করছে। ২২টি মোবাইল ফোন নম্বর চিহ্নিত করে পর্যালোচন করা হচ্ছে। এরমধ্যে ঘটনার পর থেকে দুই মোবাইল ফোন বন্ধ রয়েছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট অপর একটি গোয়েন্দা সূত্র জানায়, খুনিরা অত্যন্ত চতুর এবং দক্ষ। হত্যাকাণ্ডের সময় মোবাইল ফোন ব্যবহার করলে পরবর্তী সময়ে কল ট্র্যাকিং করে গোয়েন্দারা তাদের শনাক্ত করে ফেলে- এ বিষয়টি কিলারদের জানা। তাই ঘটনার সময় তারা ওই স্থানে কোনো মোবাইল ফোন ব্যবহার করেনি। তবে ফোনগুলো খোলা ছিল।
ঘটনাস্থল থেকে আলামত সংগ্রহকারী সিআইডির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, কিলাররা অত্যন্ত দক্ষ হাতে গুলি করে তাভেল্লাকে খুন করেছে। ওই কর্মকর্তা বলেন, তার শরীরের তিনটি গুলির ক্ষত দেখে বোঝা যায় পয়েন্ট ব্ল্যাংক রেঞ্জ থেকে (খুব কাছ থেকে) তাভেল্লাকে লক্ষ করে গুলি ছোড়া হয়। পেশাদার খুনি ছাড়া এমন স্পর্শকাতর স্থানে গুলি করতে পারা খুবই দুরূহ বলে ওই কর্মকর্তা মনে করেন।
সুরতহাল রিপোর্টে যা উল্লেখ করা হয়েছে : ইতালির নাগরিক সিজারি তাভেল্লার সুরতহাল রিপোর্ট করেন গুলশান থানার সাব-ইন্সপেক্টর মোহাম্মদ সাব্বির রহমান। এই রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়, সোমবার রাতে তিনি ইউনাইটেড হাসপাতালে গিয়ে সুরতহাল রিপোর্ট তৈরি করেন। তার বয়স আনুমানিক ৫০ বছর। উচ্চতা ৬ ফুট ৬ ইঞ্চি। মৃতের ডান চোখ বন্ধ এবং বাম চোখ অর্ধ খোলা অবস্থায় ছিল। তার পরনে ছিল সাদা ও ছাই রঙের চেক টি শার্ট ও চকলেট রঙের গ্যাবাডিংয়ের হাফ প্যান্ট।
লাশের ডান পায়ের হাঁটুর ওপর ও ডান হাতের কনুইয়ের ওপর থেঁতলানো জখম। বাম হাতের বাহুর পেছন দিকের শরীরে, বাম পাশের পেছনের বগলের নিচে, পিঠের বাম পাশে নিচের দিকে সামান্য দূরত্বে দুটি গুলির চিহ্ন রয়েছে। লাশের নাক, মুখ, গলা, পেট ও বুক স্বাভাবিক ছিল।
থানায় মামলা : গুলশানে ইতালির নাগরিক সিজারি তাভেল্লা হত্যার ঘটনায় মামলা করা হয়েছে। মঙ্গলবার সকালে গুলশান থানায় এ হত্যা মামলা দায়ের করা হয়। তাভেল্লার সহকর্মী ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান আইসিসিও কর্পোরেশন বাংলাদেশ অফিসের কন্ট্রি রিপ্রেজেনটেটিভ হেলেন ভ্যান ডার বিক বাদী হয়ে মামলাটি করেন। মামলা নম্বর ৬৮/১৫।
মামলার এজাহারে অজ্ঞাত পরিচয় তিনজনকে আসামি করা হয়েছে। এজাহারে ঘটনার ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য অনুরোধ জানানো হয়। এছাড়া এজাহারে তাভেল্লার বিস্তারিত পরিচয় দেয়া হয়েছে। ঘটনার কারণ বা কারা করতে পারে এ ব্যাপারে কোনো কিছুই উল্লেখ করা হয়নি।
ময়নাতদন্ত : মঙ্গলবার বেলা ১১টার দিকে গুলশান থানার কনস্টেবল কফিলউদ্দিন মৃত তাভেল্লার লাশ ঢাকা মেডিকেলের মর্গে নিয়ে যান। ঢাকা মেডিকেলের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান সহকারী অধ্যাপক ডা. কাজী মো. আবু সামার নেতৃত্বে দুপুর ২টার দিকে লাশের ময়নাতদন্ত শুরু হয়। ময়নাতদন্ত শেষে ডা. আবু সামা জানান, তাভেল্লার শরীরে তিনটি গুলি বিদ্ধ হয়েছে। এর মধ্যে বাম হাতে এবং বুকে একটি গুলি বিদ্ধ হয়ে শরীর ভেদ করে বের হয়ে গেছে। বাকি ১টি গুলি বুকের ভেতরে আটকে ছিল। ওই গুলিটি ময়নাতদন্তের সময় অপসারণ করা হয়েছে। গুলিবিদ্ধ হওয়ার ফলে তার শরীরে পাঁচটি ছিদ্র হয়েছে। সেভেন পয়েন্ট সিক্স ফাইভ বোরের পিস্তুল দিয়ে পেছন থেকে তাভেল্লাকে গুলি করা হয়েছে বলে তিনি ময়নাতদন্ত রিপোর্টে উল্লেখ করেছেন।


