বুধবার ৪ নভেম্বর ২০২৬

গোয়েন্দা নির্দেশে প্রথম আলো ডেইলি স্টারে বিজ্ঞাপন বন্ধ

p.-alo-and-daily-starএকটি গোয়েন্দা সংস্থার নির্দেশে বাংলাদেশের দুই শীর্ষ পত্রিকা প্রথমআলো ও ডেইলি স্টার থেকে বড় বড় কোম্পানিগুলো বিজ্ঞাপন প্রত্যাহার করে নিয়েছে বলে সংবাদ প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম আল জাজিরা। বুধবার মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক এ সংবাদ মাধ্যম ডেভিড বার্গম্যানের লেখা প্রতিবেদনটি তাদের অনলাইন সংস্করণে প্রকাশ করে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সূত্রের বরাত দিয়ে আল জাজিরা জানায়, ‘বিদেশি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান দাবি করেছে, গত ১৫ আগস্ট পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাবাহিনীর সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে ৫ সন্ত্রাসী নিহত হওয়ার ঘটনা পরের দিন (১৬ আগস্ট) প্রথমআলো ও ডেইলি স্টারে প্রকাশিত হয়। যেখানে সেনাবাহিনীর সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত উপজাতি সন্ত্রাসীদের ‘আদিবাসী’ বলে উল্লেখ করা হয়। এ সংবাদ প্রকাশের প্রেক্ষিতে ওই দিনই পত্রিকা দুটির সঙ্গে যোগাযোগ করে নিহত সন্ত্রাসীদের ‘আদিবাসী’ হিসেবে উল্লেখ করার জন্য কঠোর সমালোচনা করে।’ এ ঘটনার প্রেক্ষিতে একটি গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তা এ পত্রিকা দুটিতে বিজ্ঞাপন বন্ধের নির্দেশ দেন বলে সূত্র অভিযোগ করে।

সূত্র আল জাজিরাকে আরও জানায়, ‘১৬ আগস্ট এ সংবাদ প্রকাশের পরের দিন থেকেই এই কর্মকর্তার নির্দেশে ওই পত্রিকা দুটি থেকে বিজ্ঞাপন প্রত্যাহার করে নেয়। এতে দৈনিক ৫ লাখ কপি বিক্রি হওয়া বাংলাদেশের সর্বাধিক পঠিত এ পত্রিকা ৩৫ শতাংশ বিজ্ঞাপন আয় থেকে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং সহযোগী ইংরেজি পত্রিকা ডেইলি স্টারও ২৫ শতাংশ বিজ্ঞাপন আয় থেকে বঞ্চিত হয়।’

বিজ্ঞাপন প্রতিষ্ঠান ‘টপ অব মাইন্ড’-এর নির্বাহী কর্মকর্তা জিয়া উদ্দিন আদিল জানান, ‘এ নির্দেশনার পর থেকে বিগত মাসগুলোতে এ দুটি পত্রিকা কমপক্ষে ১.২ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমমান টাকার আয় থেকে বঞ্চিত হয়।

সূত্র আরও জানায়, ‘১৬ আগস্ট ওই সংবাদ প্রকাশের দিন বাংলাদেশের টেলিযোগাযোগ প্রতিষ্ঠান গ্রামীণ ফোনকে একটি গোয়েন্দা সংস্থায় কর্মরত এক কর্মকর্তা ফোন দিয়ে এ দুই সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপন বন্ধের জন্য নির্দেশ দেন।’

গ্রামীণ ফোনের বড় অংশীদার নরওয়ে কোম্পানি টেলিনর আল জাজিরাকে এক বিবৃতিতে নিশ্চিত করেছে, গ্রামীণফোনসহ অন্যান্য বড় কয়েকটি প্রষ্ঠানেও অনুরূপভাবে এ দুটি পত্রিকায় বিজ্ঞাপন বন্ধের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।’

আল জাজিরা দাবি করেছে, ‘তারা বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে নিশ্চিত হয়েছে যে, বিদেশি মালিকানাধীন বড় তিন মোবাইল কোম্পাানি রবি, বাংলালিংক এবং এয়ারটেলসহ বহুজাতিক কোম্পানি ইউনিলিভারকেও একইভাবে বিজ্ঞাপন বন্ধের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।’

ডেইলি স্টার-এর সম্পাদক মাহফুজ আনাম নিশ্চিত করে জানান, ‘অধিকাংশ বড় বড় কোম্পানি হঠাৎ করেই আমাদের পত্রিকায় বিজ্ঞাপন বন্ধ করে দেয়।’ কিন্তু কেন এ বিজ্ঞাপন প্রত্যাহার করা হয়েছে সে বিষয়ে কথা বলতে চাননি তিনি।

তিনি বলেন, ‘অস্বাভাবিকভাবেই আমাদের বিজ্ঞাপন প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে। বিজ্ঞাপন প্রতিষ্ঠানগুলোর নীতিমালার কোনো পরিবর্তন ছাড়াই সম্পূর্ণ নজীরবিহীনভাবে এটা করা হয়েছে। আমরা এর জন্য বিস্মিত হয়েছি এবং এর সম্ভাব্য কারণও খুঁজে বের করার চেষ্টা করছি।’ তবে প্রথমআলো এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।

ঐ গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তারা বলছেন, বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী বিজ্ঞাপন দেওয়ার ক্ষেত্রে কোম্পানিগুলোর পছন্দের উপর হস্তক্ষেপ করার অধিকার সরকার বা কারো নেই।

প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী মাহবুবুল হক শাকিল এসব বিষয় অস্বীকার করে বলেন, ‘এটা সম্পূর্ণ মিথ্যা। এটা ডাহা মিথ্যা। সরকার সংবাদপত্র ও বাকস্বাধীনতায় বিশ্বাস করে। তাদের এ ধরনের কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি।’

তিনি বলেন, সাধারণ মানুষ বা মিডিয়ার সঙ্গে কাজ করার মতো অন্য কোনো কাজ গোয়েন্দা সংস্থার নেই। আমি যতদূর জানি তাদের এ ব্যাপারে কোনো নির্দেশনাও দেওয়া হয়নি।

তিনি আরও উল্লেখ করেন, ‘১৬ আগস্টের পর প্রথম আলোতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছোট বোন শেখ রেহেনার একটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। যদি এটা সত্য হতো তাহলে কিভাবে এটা সম্ভব হতো?

গোয়েন্দা সংস্থার ঐ কর্মকর্তাও এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, ‘আমি যতদূর জানি এ বিষয়ে কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। জাতীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে আমরা কেবল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সহায়তা করে থাকি।’ এটা শুধুমাত্র একটা গুজব ছাড়া কিছুই না বলে জানান তিনি।

গ্রামীণ ফোনের সিনিয়র ম্যানেজার আল জাজিরাকে জানান, ‘এ অবস্থা সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানাতে পারব না। একটি গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তা আমাদের বলেছেন, আমরা প্রথম আলো এবং ডেইলি স্টারে আর কোনো বিজ্ঞাপন দেখতে চাই না। যদি এ আদেশ অমান্য করা হয় তাহলে আমাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি জানান, মৌখিকভাবে এ সতর্ক করা হয়েছে। গ্রামীণ ফোন এর কারণ বলতে পারবে না। আমরা এতটুকুই বলব, যে উপর থেকে নির্দেশ আছে।’

তিনি আরও জানান, গ্রামীণ ফোন নতুন একটি প্রচারণা শুরু করার জন্য সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তাই আমরা খুব তাড়াতাড়ি প্রথম আলোতে বিজ্ঞাপন দেওয়ার চিন্তাভাবনা করছি। সংবাদ মাধ্যমের বিজ্ঞাপন সংস্থা মাইন্ড শেয়ার-এর নির্বাহী কর্মকর্তা মোরশেদ আলম নিশ্চিত করে জানান, ‘১৬ আগস্ট রবি, এয়ারটেল এবং ইউনিলিভারের পক্ষ থেকে এ দুই পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিতে নিষেধ করা হয়েছে।

টপ অব মাইন্ড-এর নির্বাহী কর্মকর্তা আদিল বলেন, ‘দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তর মোবাইল ফোন কোম্পানি বাংলালিংক তাদের এ দুই পত্রিকায় বিজ্ঞাপন না দেওয়ার জন্য বলেছে। ১৬ আগস্টের সন্ধ্যা থেকে এ দুটি পত্রিকার কোনোটিতেই বিজ্ঞাপন দিতে নিষেধ করা হয়েছে।’

আরও পড়ুন